দুই বছর আগে যখন দায়িত্ব পান টিটে, তখন ব্রাজিল ফুটবলজুড়ে কেবল হাহাকার আর ‘৭-১’ গোলে হারা এক দুঃস্বপ্নের ম্যাচের চাপাকষ্ট। তখন বিশ্বকাপ বাছাই টেবিলে খাদে চলে গিয়েছিল পাঁচবারের বিশ্বজয়ী দলটি।
পরে রীতিমত বিস্ময় জাগিয়ে ব্রাজিলকে বাছাইপর্বের বৈতরণী পার করিয়েছেন কোচ টিটে। ধুঁকতে থাকা দলটি সাউথ আমেরিকায় থাকে সবার শীর্ষে, আর সবার আগে পায় বিশ্বকাপের টিকিট। শিষ্যদের শিখিয়েছেন বিশেষ কারও উপর নির্ভরশীল না থেকে একটি দল হয়ে খেলতে, স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে।
বিশ্বকাপের জন্য দলকে গুছিয়ে আনতে নেইমার-কৌতিনহোদের নিয়ে রিও ডি জেনিরোতে ট্রেনিং ক্যাম্পে ব্যস্ত এখন টিটে। তারই ফাঁকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়ে দিলেন, অন্তত তার আমলে আর ফিরবে না ‘৭-১’ গোলের দুঃস্বপ্ন। বিশ্বকাপ জিততে হলে কী করা দরকার সেটাও জানাতে ভোলেননি-
ব্রাজিল তো এবার সাউথ আমেরিকা থেকে সবার আগে মূলপর্ব নিশ্চিত করেছে। ১৯৫৮ সালে শেষবার ইউরোপ থেকে বিশ্বকাপ জেতার পর এবার সবচেয়ে ফেভারিট দলও আপনারা। এতে কী আলাদা চাপ অনুভব করছেন?
টিটে: সেলেসাওদের কোচ হওয়া মানেই চাপের সঙ্গে বসবাস করা। আমরা পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছি। এরপরও আপনি শিরোপা ছাড়া সমর্থকদের আর কোনভাবেই খুশি করতে পারবেন না। আমরা নিজেরাও এটা বিশ্বাস করে বড় হয়েছি। সুতরাং, প্রত্যাশার চাপ সবসময় থাকবেই।
আর আপনাকে চাপের চিন্তা বাদ দিয়েই কাজ করে যেতে হবে। যদি এটা করতে পারেন তাহলেই আপনি বিশ্বকাপ জয়ী এক ব্রাজিল দলের সদস্য হতে পারবেন।
২০১৪ সালের পর থেকে ব্রাজিল আর ৭-১ সমীকরণটা তো কোনভাবেই আলাদা করা যাচ্ছিল না। আপনি দায়িত্ব পাবার পর ১৯ ম্যাচে ১৫টিতে জয় দলের। ৪২ গোলের বিপরীতে হজম করতে হয়েছে মাত্র ৫টি। রহস্যটা কী?
টিটে: আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ছেলেরা আমাকে খুব ইতিবাচক ভাবে নিয়েছে। বিশ্বকে তাদের দেখানো দরকার ছিল যে তারা কী পারে, আর সেটা তারা করেও দেখিয়েছে। ড্রেসিংরুমে দারুণ এক পরিবেশ থাকে সবসময়। ফুটবলাররা চাইলে মনখুলে কথা বলতে পারে। মাঠে কিংবা বাইরে, সবজায়গায়।
দলের এই রূপান্তরের পেছনে আপনার অবদানটা কী ছিল?
টিটে: আমি মন থেকে বিশ্বাস করি যে ফলাফলের চেয়ে খেলার মানটাই আসল। আপনি কখনোই খেলার ফলাফলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। যেটা পারবেন সেটা হল খেলোয়াড়দের মান বাড়াতে। এ বিষয়টা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে যে খেলোয়াড়রা কোন কৌশলে খেলবে, তাদের কোন জায়গাটি নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদেরকে খেলোয়াড়দের জন্য একটি মানানসই পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হয়েছে।
আপনাদের প্রতিপক্ষরা নিশ্চয় চাইবে আপনাদের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক খেলতে। আপনি কী এই বিষয়ে কোনো গোপন কৌশল খুঁজে বের করে রেখেছেন?
টিটে: দেখুন, সুইজারল্যান্ড একদম গভীর থেকে খেলা বের করতে ভালোবাসে। তারা আপনাকে সেটপিস আর কাউন্টার অ্যাটাক দিয়ে আক্রমণ করতে চাইবে। সার্বিয়া হল যুগোস্লাভিয়ান পুরনো ধাঁচের খেলায় বিশ্বাসী। তারা সাধারণত, প্রতিপক্ষকে খেলার সুযোগ দেয় আর নিজেরা ছোট-ছোট পাসে খেলে। আর কোস্টারিকা গত ব্রাজিল বিশ্বকাপে একটা ম্যাচও হারেনি। নেদারল্যান্ডসের কাছে টাইব্রেকে হেরে বাদ পড়েছিল।
যেকোনো দলের পক্ষেই সুইজারল্যান্ড আর কোস্টারিকার রক্ষণ ভাঙ্গা খুব কঠিন একটা কাজ। আর সার্বিয়ার আক্রমণ ঠেকিয়ে পাল্টা আক্রমণ করা, সেটা তো আরও ভয়ঙ্কর। দারুণ কিন্তু ভিন্ন কিছু ম্যাচ অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য গ্রুপ পর্বে।
দানি আলভেজ তো আপনার পরিকল্পনায় খুব ভালো করেই ছিলেন। পরে এই রাইটব্যাক চোটে পড়ে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেলেন। এতে কী আপনাকে বিকল্প কৌশল সাজাতে হচ্ছে?
টিটে: আসলে চোট হল খেলার অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। এটা ঠিক দানি আমাদের কৌশলে দারুণভাবেই ছিল; মূল একাদশে থাকা নিশ্চিত একজন। কিন্তু আমাদের এখন যেটা করতে হচ্ছে সেটা হল তার যোগ্য বিকল্প খুঁজে বের করা। দানির মত খেলোয়াড় খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ। তবে আমাদের মতো কোচদের কাজ হল যোগ্য জায়গায় যোগ্য খেলোয়াড়টিকে খুঁজে বের করা।
দানি আলভেজ না থাকায় আপনারা কী তাহলে ৩-৪-১-২ ফরম্যাটে খেলবেন?
টিটে: আমাদের জন্য অনেক বিকল্প আছে। কিন্তু আমাদের পরিস্থিতি অনুযায়ী এক ফরম্যাট থেকে আরেক ফরম্যাটে দ্রুত পরিবর্তন করে খেলার অভ্যাস করতে হবে। তবে একটা বিষয়ে নিশ্চিত তা হল, আমরা কোনদিনও সেই ফরম্যাটে খেলতে যাবো না যেটা কোনদিনও খেলিনি। বিশ্বকাপের সময় এটা খুব ভয়ঙ্কর এক জুয়া।
কেন বিশ্বকাপে নতুন কিছু করা ভয়ঙ্কর?
টিটে: আসলে দলের সঙ্গে এটা যায় না। নতুন ফরম্যাটে খেলা যেমন অনিরাপদ আবার তেমনি সংশয়পূর্ণও। আমাকে সাবেক কয়েকজন ফুটবলার এ বিষয়ে বলেছিলেন আর আমিও বুঝেছি তারা কী বলতে চেয়েছেন। অতীতে আপনি যে কৌশলে খেলে সাফল্য পেয়েছেন তাতে আপনাকে ভরসা রাখতে হবে। হঠাত করেতো আপনি কোনকিছু পরিবর্তন করতে পারবেনও না।
আপনি জার্মানির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে দলকে খেলিয়েছেন। আর সেই ম্যাচের পর সংবাদমাধ্যমকে ‘৭-১’ নিয়ে খুব একটা লিখতেও হয়নি। ম্যাচের আগে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
টিটে: আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন, আমাদের অনুভূতি কেমন ছিল? আমরা এক বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম যে বিশ্বকাপে ৭-১ গোলের হারটা ছিল একটা দুর্যোগ। আর দুর্যোগ নিয়মিত হয় না। আমরা এ নিয়ে কথা বলেছি। আর আমরা জানতাম, আমাদের কোথায় কোথায় ভুল ছিল।
সুতরাং, আমাদের দায়িত্ব ছিল ভুলকে আর ফিরতে না দেয়া। এরপর আমরা জার্মানির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচই খেললাম। সবাই জানে, ঘুরে ফিরে সবাই ওই ম্যাচ নিয়ে কথা বলবে। কিন্তু আমাদের এসব ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
রাশিয়ায় ব্রাজিলের সম্ভাবনা কতটুকু দেখছেন?
টিটে: কে বলতে পারে এবার আমরাই জিতবো না। বিশ্বকাপ হল সাত ম্যাচের আসর। এটা জিততে হলে আপনাকে অন্তত ছয়টা ম্যাচ জিততেই হবে। কেবল গ্রুপ পর্বে একটা ম্যাচ হারা যাবে সর্বোচ্চ। আর শেষ চারটি ম্যাচ যে করেই হোক, আপনাকে নিজেদের পক্ষে রাখতে হবে।
আগের কাজ আগে। গ্রুপ পর্বে আমাদের কমপক্ষে সাত পয়েন্ট অর্জন করতে হবে। আর নকআউট সম্পর্কে তো কেউ কিছু বলতে পারে না। বিশ্বকাপ জিততে হলে আমাদের একটা ধারা বজায় রেখে খেলে যেতে হবে। ধারার উপরে যেতে পারবেন কিন্তু নিচে না। নকআউটে পারফরম্যান্সের ধারা বজায় রেখে সর্বোচ্চটা দিয়েই খেলতে খেলতে হবে।








