বিভিন্ন মহল থেকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জোরালো হয়ে ওঠার সময়ে এর অপপ্রয়োগ চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এধারার মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছেন সাংবাদিকেরা। কেবল সাংবাদিক নন ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ ফেসবুক এক্টিভিস্টদের কেউই রেহাই পাচ্ছেন না হয়রানি থেকে। সকল মহল থেকে এধারা বাতিলের দাবি ওঠলেও সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যে একে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। বাতিল হবে, বাতিল করা উচিত- এমন ইঙ্গিত সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে করা হলেও উদ্যোগ নেই। বিপরীতে যা কিছু তা কেবল আশ্বাস আর ইঙ্গিতেই সীমাবদ্ধ।
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনও ব্যক্তির তথ্য যদি নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ করে, এতে যদি কারও মানহানি ঘটে, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, তা হবে অপরাধ। এর শাস্তি অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা জরিমানা। মানে দাঁড়ায় অনলাইনে এধরনের কোন কিছুতে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে সে মামলা দায়ের করতে পারে। আর এধারায় উল্লেখিত দোষী সাব্যস্ত হলে চৌদ্দ বছরের কারাবাস এবং একই সঙ্গে এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড। মজার বিষয় হচ্ছে একইভাবে কারও যদি প্রিন্টেড সংবাদমাধ্যম বা প্রকাশনায় কথিত মানহানি হয় সেক্ষেত্রে মাত্র দুই বছরের কারাবাস।
প্রত্যেক আইনের শব্দ-বাক্যের আলাদা করে সংজ্ঞায়ন করা হলেও এধারার জন্যে আলাদা করে ব্যাখ্যা নাই, ফলে বিষয়টি একেবারের ফ্রি-স্টাইলে পরিণত হয়েছে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই অভিমত প্রকাশ করেছেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কারা হতে পারেন এনিয়েও ব্যাখ্যা নাই, ফলে আকাশে চাঁদ দেখে যদি মাটিতে বসে শেয়াল ডাকে আর সে শেয়ালের ডাকের খবর কেউ যদি অনলাইনে প্রকাশ করে তার বা তৃতীয় কারও মানহানি হয়েছে বলে মামলা ঠুকে দেয় তবে পুলিশ সুড়সুড় করে তাকে ধরে নিয়ে যাবে।
শেয়াল, আকাশ, চাঁদ, মামলা আর গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে অনেকের কাছে; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এমনই এক ঘটনা ঘটে গেছে সম্প্রতি। খুলনার ডুমুরিয়া থানাবাসী এক সাংবাদিক ফেসবুকে একটা ছাগলের মৃত্যুর খবর শেয়ার করায় ৫৭ ধারার মামলায় পড়েছেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে, এরপর দুইদিন পর আদালত থেকে তিনি জামিন নিয়েছেন। মামলার অভিযোগে প্রকাশ, ছাগলের মৃত্যুর খবর শেয়ার করায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের মর্যাদা হানি হয়েছে। মর্যাদা হানির বিষয়টি অবশ্য প্রতিমন্ত্রী টের পান নি, টের পেয়েছেন তারই এলাকার একজন যিনি নিজেও একজন সাংবাদিক বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ।
ওই ঘটনার আরেকটু ভেতরে গেলে দেখা যায়, এফসিডিআই প্রকল্পের আওতায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ গত ২৯ জুলাই তার নিজ এলাকা ডুমুরিয়ায় কয়েকজন দুস্থের মাঝে হাঁস, মুরগি ও ছাগল বিতরণ করেন। জুলফিকার আলী নামের এক ব্যক্তির পাওয়া ছাগল এদিন রাতেই মারা যায় বলে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই খবর ফেসবুকে শেয়ার করেন সাংবাদিক আব্দুল লতিফ মোড়ল। তিনি তার ফেসবুকে ছাগলের মৃত্যুর সংবাদের পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রীর একটি ছবি পোস্ট করেন এবং লিখেন, ‘সকালে ছাগল বিতরণ বিকালে মৃত্যু’। মামলার বাদী সুব্রত ফৌজদারের অভিযোগ, ছাগলের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের সময়ে লতিফ মোড়ল প্রতিমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করেছেন, আর এতেই তার কাছে মনে হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা হানি হয়েছে, প্রতিমন্ত্রীকে ছাগলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলেও ধারণা তার।
এমন অদ্ভুত অভিযোগে সাংবাদিক গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগের ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পর প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বিবিসি বাংলার সঙ্গে আলাপকালে জানান, তার দেওয়া ছাগল মরে নি, অন্যের দেওয়া ছাগল মরেছে; এতে তার মর্যাদা হানি হয় নি। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষণে বলা যায়, তার দেওয়া ছাগল মরার খবর অপপ্রচার, যেহেতু তার দেওয়া ছাগল মরেনি সেহেতু তার বদনাম হয় নি, মর্যাদারও হানি হয় নি। কথার পিঠে কথার ফুলঝুরি আর যুক্তি কতখানি হাস্যকর, ভাবা যায়!
ছাগল ও ৫৭ ধারার প্রয়োগ নিয়ে এমন আলোচনার সময়ে খুলনার ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার বিশ্বাসকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ হচ্ছে। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বলেন, “খুলনায় যে ঘটনা ঘটেছে, আমার মনে হয় এটা অপপ্রয়োগ হয়েছে। আমি মনে করি ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ ঠেকাতে মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করা উচিত।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের বিষয়ে যদি মামলা করতে হয় তাহলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে করা উচিত। তুচ্ছ কারণে, সামান্য কারণে হুট করে একটা মামলা ঠুকে দেওয়া, এটা সঠিক নয়।”
ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের পর পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) একেএম শহিদুল হক ৫৭ ধারার মামলা নেওয়ার জন্যে থানাগুলোকে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। এজন্যে তিনি চারটি ধাপ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে- এই আইনের ৫৭ ধারায় সংঘটিত অপরাধ সংক্রান্ত মামলা রুজুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে; অভিযোগ সম্পর্কে কোনও রূপ সন্দেহের উদ্রেক হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি নিয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই-বাছাই করতে হবে; মামলা রুজুর আগে পুলিশ সদরদপ্তরের আইন শাখার সঙ্গে আইনগত পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে; এবং কোনও নিরীহ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
এটা দেরিতে হলেও কিছুটা যে ইতিবাচক পদক্ষেপ তা বলা যায়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ এআইনের মাধ্যমে যে হয়রানির শিকার হচ্ছে তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও।
এরআগে, বিভিন্ন সময় সরকারের একাধিক মন্ত্রী ৫৭ ধারা বাতিলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী এধারা নিয়ে একেক সময় একেক বক্তব্য দিলেও সরকারের মন্ত্রীদের অনেকেই ৫৭ ধারা চালু রাখার পক্ষে আদতে চূড়ান্ত অবস্থানে।
এবার দেখি, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনার আগে কেমন ছিল পরিস্থিতি। পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে ৫৭ ধারায় মামলা রুজুর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে সিদ্ধান্তের পর অনেকেই হয়ত ভাবতে পারেন কেউ থানায় কোন অভিযোগ নিয়ে গেলেই আগে ৫৭ ধারায় মামলা হয়ে যেত। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে এধরনের ধারণাই ভুল। ৫৭ ধারার মামলা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টরা তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলত, এবং তাদের সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে মামলা রুজু হতো। এক্ষেত্রে থানার ডিউটি অফিসার কিংবা তদূর্ধ্ব কারও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল কম। এটা ধারণাপ্রসূত কথা নয়, সিলেটের এক মামলা সম্পর্কে জানতে গিয়ে এ অভিজ্ঞতাটুকু হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে ৫৭ ধারার মামলা- এমন সিদ্ধান্তের কারণে অতি-উৎসাহী স্তাবকদের অনেকেই হয়ত তড়িতাহত হয়ে মামলা করতে যাবে না, কিন্তু আদতে আগের অবস্থাটাই থাকবে। মানুষজন নাজেহাল হবে। এখন বাজারি ফর্মুলায় মামলা হওয়ার কারণে সরকারপক্ষ হয়ত আদালতে আইনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে না, কিন্তু আগামীতে সেটাই করতে থাকবে। কারণ পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় যেখানে জড়িত থাকবে সেখানে তালগাছটার কর্তৃত্ব অন্য কারও হাতে দেওয়া যাবে না এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। পুলিশ প্রশাসন কোনোভাবেই চাইবে না তাদের পরাজয়, ফলে এটা একপ্রকার ইগো-সঙ্কটে রূপান্তর ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সরকার স্বীকার করছে অপপ্রয়োগ হচ্ছে, তবু তারা বিতর্কিত আইনের বিতর্কিত এধারা বাতিলে আগ্রহী নয়। বাতিল হবে বলে যে আভাস পাওয়া যায় সেখানে আবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামের আরেক আইনে সেটা প্রতিস্থাপনেরও কথা আসছে। ফলে সতর্কতামূলক যে নির্দেশনার কথা জানাচ্ছে পুলিশ তা কতখানি কার্যকর হবে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তাছাড়া অনুভূতির আঘাতের বিষয়টি যেহেতু কোনোভাবেই সংজ্ঞায়িত হয় না সেহেতু এর অপপ্রয়োগ ঠেকানো যাবে না। পুলিশের আইন শাখার অনুমোদনে মামলা হবে এটা ভেবে পুলকিত হওয়ার কিছু নাই, কারণ আইনপ্রণেতারাই আইনের এধারার মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করতে চেয়েছেন। ওটা ছিল তাদের ভুল, কিন্তু তারা এখনও সে ভুল স্বীকারে আগ্রহী না। তারা বলছেন অপপ্রয়োগের কথা, কিন্তু বুঝতে চাইছেন না আইনটা এমনই যে চাইলেও অপপ্রয়োগ ঠেকানো সম্ভব না।
অনুভূতির সংজ্ঞা মানুষে মানুষে সকল ক্ষেত্রেই ভিন্ন হয়ে থাকে। এর সাক্ষাৎ প্রমাণ ছাগল মরলে স্তাবক বলে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা হানি হয়েছে, আর প্রতিমন্ত্রী বলেন ওগুলো আমার দেওয়া ছাগল নয়, আমার মর্যাদা হানি হয় নি। হ্যাঁ, এটাই অনুভূতি; কার ইচ্ছায় কখন আঘাতপ্রাপ্ত হয় কেউ জানে না। যার নামে অনুভূতি দোলে সেও হয়ত জানে না, আর যখন জানে তখন দেখে আদতে সব শেষ!
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি সকল মহল থেকেই জোরেশোরে উঠেছে। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনও এনিয়ে আন্দোলন করছে, আন্দোলনকারীদের এদলে আছেন সরকার-সমর্থক বলে পরিচিত সাংবাদিক নেতারাও। আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন তারা খোদ তথ্যমন্ত্রীও বর্জনের পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। সারাদেশের কোন প্রেসক্লাবে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু প্রবেশ করতে পারবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা। এঘোষণার পর তথ্যমন্ত্রী এখনও দেশের কোন প্রেসক্লাবে যান নি বলে সেটা কতখানি কার্যকর তা বলা এখনই সম্ভব না, তবে রাজধানীতে মন্ত্রীর এক অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে। এর পেছনে যে আন্দোলনকারী নেতাদের আল্টিমেটাম তা বলাই বাহুল্য। এমন অবস্থায় মিডিয়া কাভারেজের কারণে দেশব্যাপী আলোচনায় থাকা এক মন্ত্রী হঠাতই কম কাভারেজের আওতায় পড়ে গেছেন। এধারা চলতে থাকলে একসময় হয়ত তথ্যমন্ত্রী হয়েও মিডিয়ার আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হতে পারেন তিনি। জানি না সে পর্যন্ত কিছু হবে কীনা, তবে এখন পর্যন্ত সেসবেরই আলামত সুস্পষ্ট।
৫৭ ধারা বাতিলের দাবি দেশে প্রথম উপস্থাপন করেছিল ব্লগার ও ফেসবুক এক্টিভিস্টগণ। এখন এদাবিতে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন সাংবাদিকরা। এর সঙ্গে আছে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। আশঙ্কার কথা হচ্ছে, সরকার এধারা বাতিলে এখনও উদ্যোগী নয়। তারাও বলছে অপপ্রয়োগের কথা, বলছে সতর্কতার কথা; কিন্তু আইনটা এমন যে শত সতর্কতায়ও অপপ্রয়োগ ঠেকানোর উপায় নাই। পথ সেক্ষেত্রে একটাই- ৫৭ ধারা বাতিল, এবং একই ধারার অনুরূপ কিছু অন্য কোন আইনে প্রতিস্থাপন না করা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)





