হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সমালোচক ভারতের অন্যতম সিনিয়র সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশ দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ভারতের কর্নাটক প্রদেশের ব্যাঙ্গালুরুতে মঙ্গলবার রাতে নিজ বাড়ির সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
গৌরি লঙ্কেশ তার লেখনির মাধ্যমে প্রকাশ্যেই হিন্দু ডানপন্থিদের সমালোচনা করতেন। তাকে হত্যার ঘটনায় পুরো ব্যাঙ্গালুরু শহর উত্তাল হয়ে উঠেছে।
ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ কমিশনার সুনীল কুমার বিবিসিকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে গৌরি যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন বাড়ির ঠিক সামনেই তাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়। হামলার কারণ এখনো পরিষ্কার নয় বলে জানান তিনি।
পুলিশ জানায়, ৫৫ বছর বয়সী গৌরি গাড়ি করে বাড়ি ফেরার পর ঠিক বাড়ির দরজা খোলার সময় তাকে লক্ষ্য করে ৭ রাউন্ড গুলি বেশ কাছ থেকে ছোড়া হয়। তখন তার বুকে সরাসরি দু’টো আর মাথায় একটা গুলি লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। পুলিশ সেখানে পৌঁছে দরজার সামনে রক্তের মাঝে তাকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।
বন্দুকধারীরা মোটর সাইকেলে করে এসেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, পেশাদার খুনি দিয়ে গৌরিকে হত্যা করানো হয়েছে। এবং খুনের আগে তারা এলাকা রেকি করেছিল ও গৌরির দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও নজরে রেখেছিল।
পুলিশ আরও জানায়, গৌরি তার বাসার সামনে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছিলেন। পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা দু’টো ক্যামেরার ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার থেকে পাসওয়ার্ড আনলক করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
নিজ নামে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক গৌরি লঙ্কেশ সবসময়ই নির্ভীক এবং স্পষ্টভাষী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র সদস্যসহ অন্যান্য ডানপন্থি ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের ধর্মনিরপেক্ষ সমালোচনার কারণে যথেষ্ট আলোচিত ছিলেন তিনি।
এনডিটিভি জানায়, গৌরী লঙ্কেশ তার পত্রিকার মাধ্যমে ‘কমিউনাল হারমনি ফোরাম’ নামে একটি গোষ্ঠীকে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে গেছেন, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে এবং ডানপন্থি হিন্দুত্ববাদের বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করা হয়।
গত কয়েক বছর ধরেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থিদের সমালোচনাকারী ভারতীয় সাংবাদিকদের সামাজিক মাধ্যমসহ নানা ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক নারী সাংবাদিককেই ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে।

গৌরি লঙ্কেশের হত্যার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে আরও তিন যুক্তিবাদী ও হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী লেখক নরেন্দ্র দাভোলকার (নিহত, ২০১৩), এম এম কালবুর্গি (নিহত, ২০১৫) এবং ড. গোবিন্দ পানসারির (নিহত, ২০১৫) হত্যার ঘটনার সঙ্গে। গৌরির মতাদর্শের সঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ মিল ছিল।
দু’বছর আগে কালবুর্গিকেও মোটর সাইকেল আরোহীরা বাসার সামনে গুলি করে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী টিবি জয়চন্দ্র।
তবে গৌরির হত্যার খবর প্রকাশ হলে বিজেপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গৌরি লঙ্কেশের মৃত্যুতে দুঃখপ্রকাশ করে টুইটবার্তায় লিখেছেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক। খুবই ভীতিকর। আমরা বিচার চাই।’
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশিষ্টজনেরাও এই সিনিয়র সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।








