ঢাকায় নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। এর মধ্যে গত ১০ বছরে নিবন্ধন হয়েছে ১১ লাখ। কিন্তু সে তুলনায় সড়ক বাড়েনি। সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা আজ পরিণত হয়েছে দমবন্ধ করা এক শহরে। অসহনীয় দুর্ভোগ এ শহরে বসবাসকারী মানুষের নিত্য কষ্টের উপাদান। প্রতিদিনই নাগরিকদের জীবন থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দুই তিন ঘণ্টা করে সময়। প্রতিদিন মানুষের আয়ু কমছে এ শহরে নানা কারণে। তার মধ্যে দীর্ঘসময় যানজটে ক্ষয়ে যাচ্ছে জীবন। দিনে দুই ঘণ্টা করে ধরলে বছরে কতদিন চলে যাচ্ছে জীবন থেকে।
করোনার সময়ে ঢাকা শহরে যে যানজটের মাত্রা কম ছিল। সেটার কারণ ছিল ভিন্ন। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল, অনেকে ঘর থেকে বের হননি, অফিস চালু থাকলেও সবাই পালা করে অফিস করেছেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ায় যানজট পুরনো চেহারায় ফিরে এসেছে। বিশেষ করে মার্চে প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার পর যানজট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আগে সকাল ও বিকেলে অফিস খোলা ও বন্ধের সময় বেশি যানজট ছিল। এখন ছুটির দিন ছাড়া সব দিনই নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে সরকার এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার কোনোটারই সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি। একসময় ধারণা করা হয়েছিল শহরের কয়েকটি স্থানে উড়ালসড়ক নির্মাণ করলেই যানজট কমবে। কিন্তু উড়ালসড়ক নির্মাণ করার পরও যানজট কমেনি বরং বেড়েছে। তারপর ধারণা করা হলো মেট্রোরেল চালু হলেই ঢাকায় যানজট থাকবে না। মেট্রোরেলের কাজ চলমান আছে। মেট্রোরেল চালু হলে কি পুরো শহরের যানজট কমবে? যেসব এলাকা মেট্রোরেলের বাইরে থাকবে, সেখানকার পরিস্থিতি কী হবে? মেট্রোরেল থেকে প্রতিটি স্টেশনে যেসব যাত্রী নামবেন, তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর কী ব্যবস্থা থাকবে? উড়ালসড়কের মতো মেট্রোরেলের গতিবিধি একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিকল্পনার অভাব ও অদক্ষতাই প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে যে সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন সেটার দিকে কারো নজর নেই।
ঢাকা শহরের মোট সড়কের প্রায় ৫০ শতাংশজুড়েই চলাচল করে ব্যক্তিগত গাড়ি, অথচ এগুলো বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। অন্যদিকে ৫০ শতাংশ বড় বাসে প্রায় ৮৮ শতাংশ যাত্রী পরিবহন সম্ভব। তাই ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প হিসেবে উন্নত মানের সমন্বিত পরিবহন চালু করা প্রয়োজন। চার বছর আগে যদি সাবেক মেয়র আনিসুল হক গুলশান–বনানীতে সমন্বিত বাসসেবা চালু করে করে সফল হতে পারেন, অন্যান্য এলাকায় কেন সেটি চালু করা যাবে না? সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে একটি রুটে এ সেবা চালু করা হয়েছে। এর সম্প্রসারণ প্রয়োজন। শহরের ভেতরে দূরপাল্লার বাস টার্মিনালগুলোও যত দ্রুত সম্ভব বাইরে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে গণপরিবহনসেবা যত উন্নত হবে, মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে ততই নিরুৎসাহিত হবেন। সড়কও যানজটমুক্ত হবে। অবৈধ দখল, অবৈধ পার্কিং, রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, বাস বা অন্য গণপরিবহন দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি আধুনিক ও উন্নত শহরে গণপরিবহনই বাসিন্দাদের প্রধান বাহন। ঢাকা শহরে তার উল্টো। এখানে বেশিরভাগ যাত্রী চলাচল করেন রিকশা, অটোরিকশা, ব্যক্তিগত বাহনে। অন্যদিকে সড়কে যেসব গণপরিবহন তথা বাস-মিনিবাস চলাচল করে, সেসব সড়কেও সারাক্ষণ যানজট লেগে থাকে। ফলে ৩০ মিনিটের পথ পার হতে কখনো কখনো দুই ঘণ্টাও লেগে যায়। তার ওপর গণপরিবহনগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকায় ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটে।
আমরা মনে করি একটি দেশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ঢাকাকে আরও আধুনিক বাসযোগ্য করতে হলে এ শহরের অন্যতম দুর্ভোগ যানজট নিরসনে কার্যকরি পদক্ষেপ জরুরি। আমাদের আশঙ্কা এই ইচ্ছাগাড়ির শহর একদিন সড়কেই স্থবির হয়ে যাবে। সরকারকে এই উন্নয়নের অন্যান্য অনুসঙ্গের পাশাপাশি যানজট নিরসন সড়ক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক দ্রুত কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের বড় দাবি।








