ঢাকার কাছের জেলা মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার শান্ত কাটিগ্রামের কোলে ঘুমাচ্ছেন রবিউল করিম, সাদা টাইলসে বাঁধানো মাটির বিছানায়। দেশের জন্য কাজ করবেন বলে প্রবাস থেকে গ্রামে ফিরেছিলেন তিনি। নিজের গ্রামের সব মানুষকে পরিবারের মতো ভালোবাসতেন মানুষটি। তাদের জন্য স্বপ্ন লালন করা বুকটি স্প্লিন্টারে ঝাঁঝরা হওয়ার আগ পর্যন্ত তার ভালোবাসার অবদান রেখে যেতে পেরেছেন এই গ্রামে।
রবিউলের কবরের পাশেই গ্রামের ঈদগাহ মেহরাবটিও তার করে যাওয়া। গ্রামের শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার সুযোগ দিতে দু’টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তিনি। কবরস্থান পাড় হয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই তার হাতে গড়া ছোট্ট একটি স্কুল, নাম নজরুল বিদ্যাসিঁড়ি। চ্যানেল আই অনলাইন টিম যখন স্কুলের আঙিনায় তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। মনে হলো যেনো আদরের মাণিককে হারিয়ে কাঁদছে কাটিগ্রাম।
গ্রামের মানুষেরা বলছেন, পুলিশ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেয়া সাহসী অফিসারদের যদি নামের তালিকা করা হয় তাহলে কাটিগ্রামের এই সন্তানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পুলিশ বাহিনীর বীরের মর্যাদা তিনি অর্জন করেছেন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে। আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রবিউল যোগ দিয়েছিলেন পুলিশ বাহিনীতে। ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে মর্যাদার ইউনিফর্মে রক্তে রঞ্জিত হয়ে এখন তিনি দেশের বীর।

প্রবাস ছেড়ে পুলিশে
আজীবন মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ রবিউলের পুলিশে যোগ দেয়ার কারণ চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান তার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী মিজানুর রহমান মিজান।
কাটিগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে ভারী হয়ে আসা কণ্ঠে বন্ধু-সহকর্মীর স্মৃতি চারণ করছিলেন তিনি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করে তারা নিজেদের গ্রামেই একটা কিছু করার কথা ভাবছিলেন। একটি এনজিও করার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে রবিউলের বাবা মারা যান। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাকে। পাড়ি জমান ইটালিতে।
ইটালি থেকে একবার দেশে এসে অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে জেদের বশেই আর ফিরে যাননি রবিউল।

সেই জেদের কারণ তুলে ধরে মিজান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “আমাদের একজন বড় ভাই একটি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। রবিউল ইটালি থেকে দেশে এলে তাকেসহ আমাকে স্কুলটির ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান তিনি। সেখানে মঞ্চে ওঠা অতিথিদের পরিচয় পর্বে রবিউলকে ‘ইটালি প্রবাসী’ বলবেন না কী বলবেন এই নিয়ে নিয়ে খানিকটা ইতস্তত করেছিলেন ওই বড় ভাই। অনুষ্ঠান শেষে রবিউল তাকে বলেছিলেন, ‘বুঝতে পেরেছি আমার পরিচয়টা দিতে আপনার সমস্যা হচ্ছিলো’।”
এরপর দেশেই নিজের মর্যাদাপূর্ণ পরিচয় তৈরিতে রবিউলের জেদ চেপে বসে। ২০১২ সালে ৩০তম বিসিএসে টিকে বাংলাদেশ পুলিশে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগ দেন তিনি।
সব কলি যেনো ফুল হয়ে ফোটে
শহরে যখন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের ‘প্রতিবন্ধি’ বলা হচ্ছে তখন রবিউলের ভাবনায় গ্রামের এই শিশুদের জন্য আলাদা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্কুলের ভাবনা ঘুরছে। রবিউল করিমের এই চিন্তার ফসল ‘ব্লুমস’ নামে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্কুল।
গ্রামের বিশেষ চাহিদার বাচ্চাদের জন্য পুলিশের এই কর্মকর্তার অবদান স্মরণ করলেন ব্লুমসের সার্বিক দায়িত্বে থাকা কলেজ শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম।

চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: রবিউল করিম কামরুল শুধু কাটিগ্রাম নয়, আশেপাশের ৪-৫ টি গ্রামের আস্থার প্রতীক ছিল। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। এরকমই একজন ছিলেন তিনি। গ্রামের বিশেষ চাহিদার শিশুদের শিক্ষা, খাবার এবং নিরাপদ বসবাসের জন্য আশ্রম গড়তে চেয়েছিলেন রবিউল। সেই প্রচেষ্টাই কিছুটা বাস্তবায়িত হয়েছে।
মায়ের কাছে সেই ২৭ রমজান এই ২৭ রমজান
বাবার রেখে যাওয়া একতলা বাড়িটিকে দোতলা করে সুন্দর সৌখিন একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন রবিউল করিম। তিনি এখন নেই। প্রায় ফাঁকা বাড়িটিতে থাকেন তার দাদী। নাতীর ছবি, পুরস্কারের ট্রফি এবং মেডেল-ক্রেস্টগুলো সযত্নে আগলে রেখেছেন তিনি।
রবিউলের মা-কে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তার স্ত্রী উম্মে সালমা।
চ্যানেল আই অনলাইন টিম যেদিন ওই বাসায় গেলো সেদিন ২৭ রমজান। গত রমজানের সেই দিনেই ছেলেকে হারিয়েছিলেন মা। এমন দিনে ছেলে হারানো মায়ের চোখে অঝোর ধারায় কান্না, প্রায় বাকরুদ্ধ তিনি। সন্তানহারা এই মা-কে তার নাড়ি ছেঁড়া ধনকে নিয়ে তেমন কিছু জিজ্ঞেস করার শক্তি হয়নি।
কাঁপা কণ্ঠে মা শুধু বলতে পারলেন: আমার ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই সাহসী, সৎ মানুষ হিসেবে বড় হয়েছে।
শহীদের স্ত্রী হিসেবে গর্বিত উম্মে সালমা
শাশুড়িকে পাশের কক্ষে রেখে কথা বলতে এলেন রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা। পরনে শুভ্র পোশাক। স্বামী হারানোর শোক শক্তিতে পরিণত করেছেন তিনি । কারণ এখন ৮ বছরের সামি, ১১ মাসের রাইনাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে বড় করার দায়িত্বটা তাকে একাই বহন করতে হবে।
সরকার-পুলিশ বাহিনীকে পাশে পেয়েছেন, পাবেন এই ভরসায় নিজেদের জন্য কোন বাড়তি চাহিদা নেই তার। শুধু রবিউলের অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলোর মধ্যে ব্লুমস স্কুলের সামনের রাস্তাটি যেনো পাকা করা হয় এবং বিশেষ চাহিদার বাচ্চাগুলো যেন ভালো জীবন পায় এই চান তিনি।

শহীদ পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী বলেন, ‘দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ওর অনেক কিছু করার ইচ্ছা ছিল। কিছু কিছু শুরু করে গেলেও সম্পূর্ণ শেষ করে যেতে পারেনি। ও দেশের জন্য শহীদ হয়েছে, আমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে হারিয়েছি। একটা সন্তান আল্লাহ আমার গর্ভে রেখে আরেকজনকে কোলে রেখে ও-কে আমার কাছ থেকে তুলে নিয়েছেন। আমি সব হারিয়েছি। তবুও আজ আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, শহীদের স্ত্রী হিসেবে আমি গর্বিত।
‘আমাদের দুই সন্তান বড় হয়ে মাথা উঁচু করে পরিচয় দিতে পারবে ওরা শহীদের সন্তান। তবু, ওদের ভেতরে হয়তো বাবা না থাকার কষ্টটা থেকেই যাবে।’
ছবি দেখেই ‘বাবা’ ডাকে মেয়ে
মাত্র ৭ বছরে বাবা হারানো সামির বাবার সঙ্গে মধুর স্মৃতিগুলো স্পষ্ট মনে আছে। বাবাকে হারিয়ে এই এক বছরে বয়সে যেন একটু বড়ই হয়ে গেছে সে।
বাবা না থাকার কষ্টটা রাইনার বুঝতে দেরী আছে। রবিউলের মৃত্যুর ১ মাস পর রাইনার জন্ম হয়। তবে বাবাকে সে যেন চিনতে পারে।
শিশুদের মা উম্মে সালমা বলেন: রাইনা কান্না শুরু করলে বাবার ছবির সামনে নিয়ে গেলে চুপ হয়ে যায়। এমনভাবে তাকিয়ে থাকে মনে হয় ওর আব্বু ওর কত পরিচিত, যেন সে চেনে, যেন দেখেছে আগে।
ছবি: জাকির সবুজ








