মাদকসেবীরা শুধু নিজের জন্য আত্মঘাতী নয়, দিনে দিনে তারা স্বজনের জন্যও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এক সপ্তাহে এরকম দুটি ঘটনার পর বিষয়টি আরো একবার আলোচনায়।
মনোবিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদক সেবনে দেহের পাশাপাশি বিশৃঙ্খল ও বিধ্বস্ত হয়ে যায় মনের স্বাস্থ্য, পুড়ে যায় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধ, সমাজে নেমে আসে খুনসহ নানা অপকর্ম।
সাত বছরের শিশু জারিয়া ও সোমা নামের এক গৃহবধূ হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটি বিষয় পর্যালোচনা করে তারা বলেছেন, পারিবারিক দায়বদ্ধতা, শক্তিশালী সমাজ কাঠামো বাস্তবায়ন, অনুপ্রেরণাসহ মাদক সরবরাহ বন্ধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। মাদক পাচারকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকেও সচেতন হতে হবে আরো বেশি।
গত এক সপ্তাহে দুই মাদকাসক্তের কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছে শিশু জারিয়া ও সোমা নামের এক গৃহবধূকে। শুক্রবার (৬ অক্টোবর) মধ্য বাড্ডার বাজারের গলিতে সোমা আক্তার (২৭) নামে গৃহবধূকে তার স্বামী মনির হোসেন হত্যা করে বলে সোমার স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, মনির মাদকাসক্ত ছিল, মাদকাসক্তিই তাকে স্ত্রী হত্যার মতো চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
এর আগে ১ অক্টোবর ভোরে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলের দরবার শরিফ এলাকায় সাত বছরের শিশু জারিয়াকে রফিকুল নামে একজন ডেকে নিয়ে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এলাকাবাসী জানায়, রফিকুল বেশিরভাগ সময়ই মাদকাসক্ত থাকত।
মাদকাসক্তরাই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম কাজ করে থাকে জানিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রধান ডা. মোহিত কামাল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: নেশায় পুড়ে যায় তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধ। তাই তাদের হত্যা ও ধর্ষণের মতো কাজে বুক কাঁপে না।

বাংলাদেশে মাদকের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে জানিয়ে তিনি বলেন: আমাদেরকে মাদক জিনিসটা নিয়ে জরুরীভাবেই ভাবতে হবে। যদি না ভাবি তবে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের ভয়াল ছোবলে শেষ হয়ে যাবে।
‘মাদকজনিত সমস্যার দুইটা দিক বিদ্যমান, একটি হচ্ছে মাদকের সরবরাহ আর অন্যটি হচ্ছে মাদকের চাহিদা। মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন, এটাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলতে চাই মাদক সরবরাহ বন্ধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে ‘
মাদক পাচারকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবস্হার কথাও বলেন ডা. মোহিত কামাল।
মোহিত কামালের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগলিক অবস্হানগত কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে পাচার হয়ে আসছে জীবন ধ্বংসী মাদকদ্রব্য।

মাদকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে মৌখিক উপদেশ দিয়ে কোন লাভ হবে না জানিয়ে তিনি বলেন: পারিবারিক দায়বদ্ধতা ও শক্তিশালী সমাজ কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে।
‘মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর মাদক নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কাজ করলেও অনেক সময় লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে তাদের কিছু করার থাকে না। অনেক সময় দেখা যায় গোটা জেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জন্য বরাদ্দ একটি গাড়ি, হয়তো মাদকের এক হোতাকে গ্রেফতার করতে জরুরী গাড়ির প্রয়োজন, কিন্তু সেটা তারা তাৎক্ষণিক পাচ্ছে না। পরে পুলিশের কাছ থেকে অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে।’
মাদকে স্বজন হত্যার শেষ কোথায়? ডা. মোহিত কামাল বলেন, প্রথমেই মাদকে আসক্ত হওয়া ঠেকাতে হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে মাদকাসক্ত সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যাতে তাদেরকে ওই পথ থেকে ফিরিয়ে আনা যায়।
‘অভিভাবকরা সব সময় নিজেদের প্রস্তুত রাখবেন, ধৈর্য ধরে সন্তানদের সব কথা শোনার চেষ্টা করবেন। সন্তানদের মঙ্গলের জন্য পরিবারের সদস্যদের যথেষ্ট সময় দিতে হবে। সর্বোপরি ‘গুড প্যারেন্টিং’ বিষয়ে জ্ঞান নিতে হবে বাবা-মাকে ।’

ডা. মোহিত কামালের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বেসরকারী সংস্থা সমষ্টি’র মনস্তত্ত্বাতিক কাউন্সেলর সাহিদা সুলতানা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: পরিবারের পক্ষ থেকে মাদকাসক্তদের অনুপ্রেরণা দিতে হবে, তাদের দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে না।
পরিবারের পাশে থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক পিতামতাই চায় তার সন্তানের সুস্থ ও সুন্দর জীবন। সেজন্য পিতামাতাকে বুঝে নিতে তার সন্তানের জন্য কোনটি সঠিক, কোনটি ভুল।
পরিস্থিতির আরো অবনতি ঠেকাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কী করছে? জানতে চাইলে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (ঢাকা উত্তর) মোহাম্মদ খোরশিদ আলম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার বদ্ধপরিকর, সরকার এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।

‘মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র সরকার নয়– এগিয়ে আসতে হবে নিজেদের, থাকতে হবে থানা এবং ওয়ার্ড কমিশনারের মধ্যে সমন্বয়।’
খোরশিদ আলম বলেন: মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোপরি গণজাগরণ ও গণআন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।
তবে, তারা সকলেই বলছেন: স্বজনদেরই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব। সেটা যেমন মাদকাসক্তি ঠেকানোতে, তেমনি মাদকাসক্ত হয়ে গেলে তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।








