যুগের পর যুগ এ ভূ-খণ্ডের উত্থান-পতনের সাক্ষী প্রবীণ বাঙালিদের কাছে এক বিস্ময়ের নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরের পহেলা বৈশাখের সঙ্গে গত এক দশকের তুলনা করে তারা বলছেন, এই এক উৎসব উদযাপনেই দেশের অগ্রগতির চিত্র ফুটে উঠছে। ‘তখন মানুষের ঘরে খাবার ছিলো না, পরনের কাপড় ছিলো শতচ্ছিন্ন। আর আজ এ দিনটিতে উৎসব আনন্দে ভাসছে বাংলাদেশ,” সহজ কথায় মধ্যবিত্তের বিকাশে অর্থনৈতিক অগ্রগতির এমন চিত্রই তুলে ধরলেন দেড় দশক আগে সরকারি চাকুরি থেকে অবসরে যাওয়া ৭৫ বছর বয়সী আফতাব আহমেদ।
আফতাব আহমেদ যেটা সাদা চোখে দেখে সহজভাবে বর্ণনা করছেন, বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকরা তার বিশ্লেষণ দিয়ে বলছেন, ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে স্বাধীনতার ৪৪ বছরে বাংলাদেশ এখন ‘এশিয়ার উদীয়মান টাইগার’। নববর্ষের হালখাতার মতো হিসাব করলে ব্যর্থতার সঙ্গে সঙ্গে অর্জনের তালিকা কম দীর্ঘ নয়। সুশাসন এবং রাজনীতিসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে কিছু গেরো থাকলেও জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অনেক।
তবে অগ্রগতির পথটা খুব সহজ ছিলো না। একাত্তর পরবর্তী সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বিদেশি সাহায্যনির্ভর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে যে মন্তব্য করেছিলেন, সেই তকমা কাটাতে বাংলাদেশকে বহু ঘাত-প্রতিঘাত পার হতে হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে গার্মেন্টস, কৃষি, জনশক্তি রপ্তানিসহ নানা খাতের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে ‘নেক্সট ইলেভেন’ দেশগুলোর একটিতে স্থান এনে দিয়েছে। বাংলাদেশকে উন্নয়ন পরীক্ষাগারের পরিবর্তে উন্নয়ন মডেল বলছেন অনেকে।

ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে স্বাধীনতা। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অর্থনীতি, শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নের যে অর্জন তা উল্লেখ করার মতো। দেশের অনেক মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন, যা স্বাধীনতার ফলেই সম্ভব হয়েছ।
কিন্তু কিছু চিন্তার খোরাকও রাখছেন তিনি। ‘বাংলা ভাষা এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্য’ এই যে দুটি কারণে বাঙালি স্বাধীনচেতা হয়ে উঠেছিল, স্বাধীনতার পরে তার প্রতিফলন যথাযথ হয়নি। বাংলা ভাষার ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে না। সমাজের ধনীরা এই ভাষাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে না, বা বলতে পারি লাগাতে দিচ্ছে না।‘ এমন চিত্র অগ্রগতির সুফল সমাজে সমহারে বন্টন না হওয়ার প্রমাণ বলে মনে করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তাঁর মতে, শিল্প-সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যমে দৃশ্যত উন্নতি হলেও পুঁজির কাছে ধীরে ধীরে আত্নসর্মপণ করছে সাধারণ মানুষের সার্বজনীন ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবও তাই রূপ নিচ্ছে ‘করপোরেট কালচারে’।
তবে মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত। এক জাহাজ খাদ্যের জন্য যেখানে সত্তরের দশকে লাখ মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে মারা যাওয়াসহ অপুষ্টিতে ভুগে প্রজন্মের পর প্রজন্ম রেশ রেখে গেছে, সেখানে চাল আমদানি প্রায় ইতি টেনে এখন রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। সত্তরের দশকে রাজধানীর কমলাপুরে কিছু টেইলারিং শপ গড়ে উঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারী দেশ। গার্মেন্টস সেক্টরের পর দেশের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে তথ্য প্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশন্স খাত। দেশে এখন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ১১ কোটির বেশি। ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন সাড়ে চার কোটি মানুষ। দেড়শর বেশি দেশে প্রায় কোটি বাংলাদেশি তাদের কর্ম দক্ষতার ছাপ রেখে চলেছেন।

অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, স্বাধীনতার পরে দেশের অর্থনৈতিকখাতে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ৭২-৭৩ সালে দেশের বাজেট যেখানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ছিলো, তা এখন আড়াই লক্ষ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিভাবে সম্ভব হয়েছে এটা? ইব্রাহিম খালেদ বলছেন, দেশের সাধারণ মানুষের নিজ নিজ ক্ষেত্রে একাগ্রতার কারণে। ব্যাংকিং খাতেরও একটি বড় অবদান এখানে রয়েছে। উদার এবং প্রান্তিক ব্যাংকিং এর ফলে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
তবে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাাম চৌধুরীর মতো তিনিও কিছু সমস্যা দেখছেন। ‘অর্জনে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাঠামোতে সুনীতি আর সুশাসনের অভাব। এর ফলে সার্বিক অর্জনের সুফল যে হারে সাধারণ মানুষের পাওয়ার কথা ছিলো,সেটি তারা পাচ্ছেন না। স্বাধীনতার পর ৭০ দশকের দিকেও এই অবস্থা যথেষ্ট ভাল ছিলো, কিন্তু ধীরে ধীরে এই অবস্থার অবনতি ভাবিয়ে তুলেছে।
তারপরও তিনি হতাশ নন। ইব্রাহিম খালেদ বলেন,রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের অগ্রগতি বেশ ভাল। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুনীতির চর্চা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে আমরা আরও এগিয়ে যাব।
সুশাসন আকাঙ্খার কিছু প্রমাণ অবশ্য এরইমধ্যে পাওয়া গেছে। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে বঙ্গবন্ধুর আত্ন-স্বীকৃত খুনিদের বিচার শেষ করার পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতির দায়মুক্তির প্রমাণ। তবে সার্বিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা, মানবাধিকার এবং গণমাধ্যম বিষয়ে নানা নেতিবাচক লক্ষণ আর প্রকাশ বিভিন্ন অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

তারপরও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল আশাবাদী। তিনি বলেন, বরাবরই দুর্যোগ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা অনেক এগিয়েছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি আর রাজনৈতিক দুর্যোগই বলি, কোনোটাই আমাদের থামিয়ে দিতে পারেনি। মাঝে মাঝে যে বাধা আসছে, তা কাটিয়ে উঠতে আমাদের আরও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অমুসলিমদের ওপর নির্যাতন, মুক্ত চিন্তার সুরক্ষা, আইন-বর্হিভুত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক দৃষ্টি দিতে হবে।
‘স্ব-নাগরিক উদ্যোগে আমরা চেষ্টা করছি ঠিকই, কিন্তু সরকারের আরও ভূমিকা রাখতে হবে।’ সুলতানা কামালের এ কথার মতো অন্যরাও বলছেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বপ্নযাত্রায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি, যে দায়িত্ব পালন করতে হবে রাজনীতিকদের।








