আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে এখনও এক রূপময় চরিত্র ১৫ আগস্ট ভোরে বুলেটবিদ্ধ হয়ে নিহত প্রিয়দর্শিনী অ্যাথলেট সুলতানা কামাল। তাঁর হাস্যোজ্জ্বল দীপ্তিময় মুখাবয়ব এখনও এ দেশের নারী খেলোয়াড়দের জন্যে অন্যরকম এক অনুপ্রেরণার আঁধার। মাঠে ও মাঠের বাইরে লড়াই আর অসাধারণ ব্যক্তিত্বে প্রিয়দর্শিনী হিসেবে খ্যাত ছিলেন তিনি। নতুন প্রজন্মের কাছে ছিলেন রীতিমতো রোলমডেল। যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সাথে ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে লড়েছেন তারা কখনই তাঁকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেন নি। এখনও লড়াকু প্রিয়দর্শিনী অ্যাথলেট সুলতানা যেনো সবার মনেই সমুজ্জ্বল।
ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে তাঁকে যারা দেখেছেন তাদের স্মৃতির পাতায় এই নামটি এখনও বড় বেশি উজ্জ্বল। খুকী নামেও তিনি সমান প্রিয় ছিলেন। মৃত্যুঅব্দি ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডের সাথেই তাঁর ছিল গভীর সখ্যতা। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সব কিছুই তুচ্ছ হয়ে উঠেছিল ঘাতক চক্রের কাছে। আর তাইতো বঙ্গবন্ধু পরিবারে নববধূ হয়ে আসা এই অ্যাথলেটকেও সেদিন নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। খুব সম্ভবত বিশ্বে আর কোনো নারী অ্যাথলেটের এভাবে বুলেটবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার নজির নেই।
মৃত্যুর মাত্র একমাস আগে ১৪ জুলাই বঙ্গবন্ধু পরিবারের নতুন সদস্য হয়ে এসেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের সাথে তার বিয়ে হয়েছিল পারিবারিক মতামতের ভিত্তিতেই। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পুত্র শেখ কামালের সাথে বিয়ে হওয়ার আগেই ক্রীড়াঙ্গনের অদ্বিতীয়া এক নারী হিসেবে খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তারপর বঙ্গবন্ধু পরিবারের বধূ হয়ে আসায় সন্দেহাতীতভাবেই তিনি উঠে এসেছিলেন আরো উচ্চতায়। যদ্দুর জানা যায়, সুলতানাদের পরিবারের সাথে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সখ্যতা ছিল স্বাধীনতার আগে থেকেই। সেই কারণে কামাল-সুলতানা একে অপরকে ভালোভাবেই জানতেন, চিনতেন। আবার দুজনেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।
জানা যায়, ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুই প্রথম ফরিদপুরের কোনো এক পার্লামেন্ট সদস্যকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠান সুলতানার বাবা দবিরউদ্দিনের কাছে। তারপর দু পরিবারের সম্মতিতে কামাল ও সুলতানার বিয়ে সম্পন্ন হয়। সুলতানা বউ হয়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর পরিবারে। অ্যাথলেট হিসেবে সুলতানা কামাল যে অসাধারণ ছিলেন জাতীয় অ্যাথলেটিক্সের রেকর্ডই তার বড় প্রমাণ। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় অ্যাথলেটিক্সের আসর বসে ৭৩ সালে। এই প্রতিযোগিতায় তিনি অসাধারণ কৃতিত্বেও স্বাক্ষর রাখেন। বেঁচে থাকা পর্যন্ত সুলতানা কামাল ’৭৩, ’৭৪ এবং ’৭৫ পর পর এই তিন সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। রেকর্ডপত্র অনুসন্ধান করে দেখা যায়, সুলতানা কামালের প্রিয় ইভেন্ট ছিল হার্ডলস, হাইজাম্প এবং ব্রডজাম্প। এই তিনটি ইভেন্টে বরাবরই তিনি দেশে ও বিদেশের মাটিতে অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন। 
স্বাধীনতার পর প্রথম ১৯৭৩ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতার প্রথম আসর বসে। এই আসরে মেয়েদের বিভাগে মোট নয়টি ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে এই প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো এককভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তিনটি ইভেন্টে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এক অনন্য রেকর্ড গড়েন সুলতানা।
১০০ মিটার হার্ডলস, হাই জাম্প এবং ব্রড জাম্পে তিনি প্রথম হন। এ ছাড়া ১০০ মিটার স্প্রিন্টারে অংশ নিয়ে তিনি দ্বিতীয় হন। ১০০ মিটার হার্ডলস প্রতিযোগিতায় সুলতানা আহমেদ খুকী আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের কাজী লুৎফুন্নেসা এবং দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আরা মিমুকে (বর্তমানে শামীমা সাত্তার) পেছনে ফেলে প্রথম হন। লুৎফুন্নেসা ও মিমু যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হন।
এদিকে হাইজাম্পেও শ্রেষ্ঠত্ব দেখান সুলতানা আহমেদ খুকী। দিনাজপুর জেলা একাদশের ফরিদা বেগম লিলি এবং মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের সুমিত্রা রায়কে পেছনে ফেলে প্রথম হন। লংজাম্পেও সুলতানা আহমেদ প্রথম হন। তার পেছনে থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হন দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আক্তার মিমু এবং মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের মিস হামিদা। এই তিন ইভেন্টের বাইরে ১০০ মিটার স্প্রিন্টারে তিনি দ্বিতীয় হন আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের শামীম আরা টলির পেছনে থেকে। এই ইভেন্টে তৃতীয় হন দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আরা মিমু।
পরের বছর ৭৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতাতে ব্রড জাম্পে দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আরা মিমু এবং সুফিয়াকে পেছনে ফেলে প্রথম হন সুলতানা আহমেদ। হাইজাম্পে খুলনা জেলা একাদশের মেরিনা খানমের কাছে হেরে গিয়ে দ্বিতীয় হন। এই ইভেন্টে তৃতীয় হন সিলেট জেলা একাদশের আবেদা চৌধুরী। এ বছর ১০০ মিটার হার্ডলসে অপ্রত্যাশিতভাবে শ্রেষ্ঠত্ব হারান সুলতানা কামাল। কুমিল্লা জেলা একাদশের রোকেয়া বেগমের কাছে পরাজিত হন। এই ইভেন্টে তৃতীয় হন বিটিএমসির শামীম আরা টলি। 
এরপর ৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা। এই জাতীয় আসরই ছিল সুলতানা কামালের জীবনে শেষ অংশগ্রহণ। এই আসরে সুলতানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে দারুণ পারফর্ম করে নিজের গৌরব ফিরিয়ে আনেন। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ১০০ মিটার হার্ডলসে ১৭.০৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি নতুন রেকর্ড গড়ে প্রথম হন। তার পেছনে থেকে দ্বিতীয় হন কুমিলা জেলা একাদশের রোকেয়া বেগম খুকী এবং চট্টগ্রাম জেলা একাদশের রওশন আরা রেশমি। একইভাবে তিনি ব্রডজাম্পেও নিজের কৃতিত্ব ধরে রাখেন। বিটিএমসির শামীম আরা মিমু এবং কুমিলা জেলা একাদশের আনারকলিকে পেছনে ফেলে প্রথম হন।
সুলতানা কামালের জন্ম জন্ম ১৯৫২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার বকশীবাজারে। তার বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়র। ১৯৬৭ সালে তিনি মুসলিম গার্লস স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তৎকালীন গভ: ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেসা) ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। এরপর অনার্স পাশ করে ভর্তি হন এম এ ক্লাসে। এমএতে লিখিত পরীক্ষা দেন। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই ঘাতকদের বুলেটে তিনি নিহত হন। স্কুলবেলা থেকেই সুলতানা খেলাধুলোয় ছিলেন দারুণ পাকা। তারই ধারবাহিকতায় তিনি আন্তঃস্কুল ও কলেজ প্রতিযোগিতায় তিনি শীর্ষস্থান অধিকার করেন। এরমধ্যে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তৎকালীন পাকিস্তান অলিম্পিকে নতুন রেকর্ড স্থাপন করে স্বর্ণপদক জয়লাভ করেছিলেন। শুধু এই নয়, ১৯৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হার্ডলসে নিজেই নিজের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড স্থাপন করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। 
একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় পর মূলত তার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় দল জাতীয় পর্যায়ের লড়াই-এ একাধিক পদক জয় করতে সক্ষম হয়। সুলতানা কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা ব্লু। ক্রীড়া জগতে অসামাণ্য কৃতিত্বের জন্যে ডাকসু তাঁকে বিশেষ পদকেও সম্মানিত করে। ১৯৭৩ সালে জাতীয় ক্রীড়ালেখক সমিতি কর্তৃক তিনি সেরা অ্যাথলেটও নির্বাচিত হন। এরকম আরো অনেক সাফল্য রয়েছে সুলতানার।
আসলে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে খেলাধুলোয় নিজেকে উৎসর্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশজুড়ে সুলতানা এক অদ্বিতীয়া ক্রীড়াচরিত্র হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। আকর্ষণীয়া চেহারার সাথে অ্যাথলেটিক্স সৌন্দর্য মিলিয়ে নিজেকে এক বর্ণিল রুপ দিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর চরিত্রে বরাবরই পরিষ্ফুটিত ছিল লড়াই, সাহস আর আজীবন এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প। আর এ কারণেই মৃত্যুর তিন দশক পরেও প্রিয়দর্শীনি অ্যাথলেট হিসেবে এখনও সুরভী ছড়ান তিনি।
শেখ কামালের ইচ্ছে ছিল আবাহনী ক্লাবে একটি অ্যাথলেটিক্স টিম করবে যার নেতৃত্বে থাকবে সুলতানা কামাল। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে স্ত্রী সুলতানাকে নিয়ে আবাহনী ক্লাবে গিয়েছিলেন তিনি। ম্যানেজার ও বন্ধুদের বলেছিলেন ‘সুলতানাও এখানে বসবে।’ কিন্তু ভোর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বুলেট বিদ্ধ হয়ে নিহত হন প্রিয়দর্শিনী অ্যাথলেট সুলতানা কামাল এবং ক্রীড়াসংগঠক শেখ কামাল।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








