নির্মাণকাল থেকে বয়স সাড়ে তিন শ বছর হতে চলল। কিন্তু মুঘল স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহনকারী লালবাগ কেল্লা মসজিদটি এখনও যেন নতুন। বাইরের রঙ চটে গেলেও ভেতরের চাকচিক্য কমেনি এতটুকু। চিড় ধরেনি নকশায়ও। মুঘল প্রাসাদ দুর্গের অন্যতম এ স্থাপণাটিতে এখনও নজর কাড়ে কেল্লায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের। এলাকার মানুষরা নিয়মিত নামাজ আদায় করেন এখানে।
নির্মাণ ইতিহাস
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘দ্য আর্কিওলজিক্যাল হেরিটেজ অব বাংলাদেশ’ বই থেকে জানা যায়, লালবাগ কেল্লা মসজিদ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের ৩য় পুত্র শাহজাদা আজম বাংলার সুবাদার থাকাকালীন এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ১৬৭৮-৭৯ সালে। আয়তাকারে (১৯.১৯ মি: × ৯.৮৪ মি) নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি এদেশের প্রচলিত মুঘল মসজিদের একটি আদর্শ স্থাপত্য।
কিন্তু পুরো দুর্গের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই আওরঙ্গজেব তাঁকে দিল্লিতে ডেকে পাঠান। তাঁর উত্তরসুরী শায়েস্তা খান ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করলেও দুর্গের কাজ সমাপ্ত করেন নি। ১৬৮৪ সালে শায়েস্তা খানের কন্যা বিবি পরী এখানে মারা গেলে দুর্গটিকে তিনি অপয়া হিসেবে বিবেচনা করে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন। অবশ্য তার আগেই মসজিদটির নির্মান কাজ শেষ হয়ে যায়।

অবস্থান ও গঠন
পুরান ঢাকা নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে লালবাগ কেল্লার অবস্থান। নদীটি বর্তমানে আরও দক্ষিণে সরে গিয়ে দুর্গ থেকে বেশ খানিকটা দূর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ডয়েলির অঙ্কিত চিত্র থেকে (১৮০৯-১১) দেখা যায় যে, পূর্ব-পশ্চিমে আয়তাকারে বিস্তৃত দুর্গের দক্ষিণ ও দক্ষিণপশ্চিম অংশের অর্ধেকেরও বেশি নদী সংলগ্ন ছিল। মসজিদটি কেল্লার উত্তর পশ্চিমাংশে অবস্থিত।
বর্তমান অবস্থা
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি এখনও জামে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেল্লার মূল দূর্গে ঢুকতে টিকেট লাগলেও। মসজিদটি সবার জন্যই উন্মুক্ত। বিশেষ পথ তৈরি এবং লোহার সীমানা প্রাচীর দিয়ে কেল্লার মূল স্থাপনা থেকে মসজিদটিকে আলাদা রাখা হয়েছে। এলাকার মানুষ নিয়মীত এখানে নামাজ আদায় করেন। কেল্লায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরাও এখানে নামাজ আদায় করেন। বাইরের রঙ কিছুটা চটে গেলেও ভেতরটা এখন ঝকঝকে। মুসল্লীদের আরামের জন্য মসজিদটি লাগানো হয়ে দামী দামী বৈদ্যুতিক ফ্যান। ঝলমলে রাখতে সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতির পাশাপাশি রয়েছে অভিজাত ঝাড়বাতিও।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকলেও মসজিদটি পরিচালনা করার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। তারাই মসজিদটির ব্যয়ভার নির্বাহ করেন। ইমাম, মোয়াজ্জিন এবং দুই জন খাদেম এখানে কর্মরত। তাদের বেতনও পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নির্বাহ করা হয় বলে চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান স্থানীয় বাসিন্দা এবং এই মসজিদের নিয়মিত মুসল্লী মো. শফিকুর রহমান।

শকিকুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: এলাকার মানুষ নিয়মিত এখানে নামাজ আদায় করে থাকেন। ঐতিহাসিক নিদর্শন হওয়ায় অন্যান্য মসজিদের তুলনায় এ মসজিটটি মুসল্লীদের একটু বেশিই টানে। তাছাড়া কেল্লার পরিবেশও অনেককে এ মসজিদে নামাজ আদায় করতে উৎসাহী করে তোলে।
অন্যান্য মুসল্লীরা জানান, মসজিদটিতে সবসময়ই মুসল্লীদের ভিড় হয় তবে সবে বরাতে এখানে উপচে পড়া ভিড় হয়। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন শবে বরাতের নামাজ আদায় করতে।
যেভাবে যাওয়া যাবে
রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিউমার্কেট, আজিমপুর বা বকশী বাজার বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিক্সায় করে মসজিদ তথা লালবাগ কেল্লায় আসা যায়। দূরত্বভেদে রিক্সা ভাড়া আলাদা আলাদা। গুলিস্তান নগরভবনের সামনে থেকে ছেড়ে আসা লেগুনায়ও (হিউম্যান হলার) আসা যেতে পারে।








