নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায় একদিকে মানুষের লোভ এবং ক্ষমতার অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। অন্যদিকে উন্মোচন করেছে ন্যায়বিচারের কাছে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় ক্ষমতা ও লোভ। আর এ বিচারের পথ সুগম করে দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত।
সাত খুনের ঘটনায় এলিট ফোর্স র্যাবের কয়েকজন বিপথগামী সদস্যের জড়িত থাকার খবরে মানুষ বিস্মিত হয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত তাদের বিচার হবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ও ছিলো অনেকের। কিন্তু, সব শঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করেছে ন্যায়বিচার।
সাত খুনের ঘটনায় যে মামলা হয় তাতে বলা হয়েছিল, র্যাবকে ঘুষ দিয়ে তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করেছে নূর হোসেন। আদালতেও সেটি প্রমাণিত হয়। রায়ে তাই মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে ২৬ জনের, ৯ জনকে দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ।
র্যাবের মতো একটি বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের জন্য দেশের ইতিহাসে যে কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছে তার বিচারের পর রায়কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের জন্য একটি বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।
রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের জন্য এই রায় বিশেষ বার্তা বহন করছে। র্যাব সদস্যের ফাঁসির রায় হওয়ায় প্রমাণিত হয়েছে কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়।
যেভাবে সুগম হয় বিচারের পথ
আইনের রক্ষাকারীরাই যখন টাকার লোভে আইন ভঙ্গকারী হয়ে উঠে তখন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও অনেক সংগ্রাম করতে হয় বলে মন্তব্য করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
তিনি বলেন, এই মামলার ন্যায়বিচারের আশায় দুই বছর আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েছি, উচ্চ আদালতে গেছি, দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। সেসময় কোনো কূল কিনারা পাচ্ছিলাম না। পরে আমরা তিনজন মিলে আদালতে একটি রিট করি। রিটের পর আদালত র্যাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশনা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরকে গ্রেফতার করার সাহস পায় এবং গ্রেফতার করে।
তিনি বলেন: এরপরই তাদের কাছ থেকে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনাটি উদঘাটিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
‘সেটারই ফলাফল আজকের রায়।’
মামলার চার্জশিটে প্রথমে এমন নৃশংসতার পরিকল্পনাকারীর বিষয়ে তেমন কিছু না থাকলেও পরে তা যোগ করা হয় উল্লেখ করে পাবলিক প্রসিকিউটর ওয়াজেদ আলী খোকন সাংবাদিকদের বলেন, উচ্চ আদালত দেখেছেন নূর হোসেন ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা এবং তাদের উৎসাহিত করেছেন এই ঘটনাটা ঘটানোর জন্য।
‘১২০ এর বি তে পর্যবেক্ষণ হচ্ছে যিনি পরিকল্পনা করবেন, ষড়যন্ত্র করবেন এবং দুস্কর্মে সহযোগিতা করবেন তার সর্বোচ্চ শাস্তি, যাকে দিয়ে হত্যা করাবেন তার মতোই হবে,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন: চার্জশিটে প্রথমে এই ধারাটি সংযুক্ত হয়ে আসেনি। মহামান্য উচ্চ আদালত পরবর্তীতে যখন দেখলেন চার্জশিটে এই জায়গাটুকুতে ত্রুটি আছে তখন এটুকু সংশোধন করে দেন।
‘পরে আমরা ওভাবেই চার্জ গঠন করি ও প্রমাণ করে দিয়েছি যে নূর হোসেন পূর্ব থেকেই ষড়যন্ত্র করেছেন, পরিকল্পনা করেছেন, দুস্কর্মে সর্বশেষ সহযোগিতা করেছেন গাড়ি দিয়ে, লোকবল দিয়ে লাশগুলোকে ট্রলারে উঠিয়ে গুম করার জন্য। যে ২০ জন চাক্ষুস সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তারাও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছেন, ফলে বিষয়গুলো স্পষ্ট চলে এসেছে সাক্ষ্যপ্রমাণে।’








