আসলেই বড্ড সিনেমাটিক স্টাইলে এগিয়ে যাচ্ছে চাঞ্চল্যকর মিতু হত্যার কাহিনী। কাহিনীর সাথে পাল্টা কাহিনী উঠে আসার কারণে এই হত্যাকাণ্ডের যেনো কোনো কূলকিনারাই মিলছে না। পুলিশের পক্ষ থেকেও তেমন কোনো সাফল্যময় অগ্রগতির কথা বলা হচ্ছে না। যদিও পুলিশ বলছে তারা মূল ঘটনার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু কার্যত মিতু হত্যাকাণ্ড যেনো দিনকে দিন আরও রহস্যময় হয়ে উঠছে। সেই রহস্যময়তা যেনো আরও পরিপূর্ণতা লাভ করেছে সম্প্রতি মিতুর মা-বাবা কর্তৃক মিতুর স্বামী বাবুলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলার কারণে। সত্যিই বাবুল এবং তাঁর শ্বশুর পক্ষের অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্যে দিয়ে মিতু হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন ক্লাইমেক্স-এর অবতারণা হয়েছে।
এতদিন ধরে বাবুলের শ্বশুর এবং শ্বাশুড়ি জামাই বাবুলকে মিতু হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই, তেমন আশঙ্কাও করেন না বলে সিএমপির তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে বললেও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঠিক উল্টোটাই বলেন তারা। এদিন এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান রাজধানীর মেরাদিয়ায় নিহত মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন এবং মা শাহেদা মোশাররফের মুখোমুখি হন। মিতুর মা এবং বাবা দুজনেই মিতু হত্যাকাণ্ডের সাথে তার স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা আছে বলে অভিযোগ করেন। তাঁরা আরও বলেন, মিতু এবং বাবুলের পরিবারে অশান্তি ছিল। মিতু একবার আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিল। আরও অভিযোগ করেন এই বলে যে, বাবুল পরকীয়া করতো এবং একাধিক নারীর সম্পর্ক ছিল। এ কারণেই বাবুল তাঁর স্ত্রী মিতুকে হত্যা করেছে বলে তারা অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগ ঐদিনই অনলাইন এবং পরেরদিন দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ছাপা হয়। বাবুলের শ্বশুর-শ্বাশুড়ির পক্ষ থেকে আনা এসব অভিযোগ নাগরিক মনে কিছুটা হলেও নতুন করে ধাক্কা দেয়। কেননা বাবুলের শ্বশুর এবং শ্বাশুড়িই এতদিন ধরে জোর ধারণা দিয়ে আসছিলেন যে, মিতু হত্যাকান্ডের ঘটনায় বাবুল সম্পৃক্ত নয়। এই হত্যাকাণ্ড তৃতীয় পক্ষ ঘটিয়ে বাবুলকে ফাঁসিয়ে দিতে চাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে শুরু থেকেই বাবুলের প্রতি জনসাধারণের এক ধরনের সহানুভূতি তৈরি হয়।
এদিকে পরের দিনই শ্বশুর আর শ্বাশুড়ির অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাবেক এসপি বাবুল আক্তার ফেসবুকে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিলে মিতু হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন আলোচনা জমে উঠে। পরেরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি বাবুল আক্তার ফেসবুকে ‘সবাই বিচারক আর আমি তথ্য প্রমাণ ছাড়াই খুনী’ শিরোনামে দীর্ঘ এক বক্তব্য লিখেন। প্রায় আড়াই হাজার শব্দের এই দীর্ঘ লেখায় তিনি সম্প্রতি যেসব ঘটনাবলী ঘটেছে তাঁর সূত্র টেনে পাল্টা উত্তর ও বিবরণ দেন। অনেকক্ষেত্রে পাল্টা প্রশ্নও ছুঁড়ে দেন। বাবুল নিজ স্ট্যাটাসের লেখায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকগুলো ঘটনা ও বিষয়াবলী তুলে ধরেন। বিশেষ করে স্ত্রী মিতু ও তার সংসার জীবন কেমন ছিল, কেন তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন, কেন তিনি মিতুর কলেজ পড়ুয়া খালাতো বোনকে বিয়ে করতে চাননি-এসব বিষয়গুলো তুলে ধরেন ও ব্যাখ্যা দেন। বাবুল তার লেখাতে কথিত পরকীয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণরুপে অস্বীকার করে বলেন, এটি মিথ্যা। এক জায়গায় বলেছেন, ‘একই এলাকায় থাকলে কিংবা বাবা-ভাইয়ের সাথে পরিচয় থাকলেই যদি পরকীয়া হয়ে যায় তবে আমার পরকীয়ার প্রেমিকাদের নাম লেখা শুরু করলে তা পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ গোলার্ধে পৌঁছালেও শেষ হবে না।’
সবশেষে তিনি বলেছেন, ‘আমি চাই আমার স্ত্রী হত্যার সঠিক বিচার হোক। সে আমার সন্তানদের মা, আমার পৃথিবীর ভিত ছিল সে। তাকে হারিয়ে আমি এবং আমার বাচ্চা দুটোর চেয়ে বেশি কষ্ট কেউ পেয়েছে বলে আমার বোধ হয় না। এখনও সামলে উঠতে পারিনি আমরা। বাচ্চাদের একটা স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এরমধ্যেই যে যা ইচ্ছে বলছে, ছাপছে। আমার ছেলেটা যখন এসব সংবাদ পড়ে ও দেখে তখন তার মানসিক অবস্থাটা কী দাঁড়ায়? কোন সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র কারও ব্যক্তিস্বার্থে করা মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে যারা কথা বলছেন, তারা আমার জায়গায় নিজেকে একবার রাখুন, নিজের সন্তানটিকে আমার ছেলের জায়গায় ভাবুন। তারপর কলম হাতে নিন, সংবাদ বাণিজ্য করুন। আজ আমার ছেলের জন্মদিন, মাকে ছাড়া প্রথম জন্মদিন তার। কী ভাবছে সে মনে মনে? কতটা কষ্ট পাচ্ছে সে? এসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায় কার? কথাগুলো একান্তই পারিবারিক। মেয়ে হারিয়ে মা-বাবার কষ্ট প্রকাশের একটা মাধ্যম হয়ত এসব ভিত্তিহীন অসংলগ্ন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথাবার্তা, তাই আমি প্রত্যুত্তরে এতটুকু শব্দ করতেও নারাজ। কিন্তু এখন কথাগুলো পরিবারের সীমা পেরিয়ে লোকের ঘরে ঘরে বিনোদোনের উৎস হিসেবে স্থান পেয়েছে। তাই আজ কিছু বলতে হল। এত স্বল্প পরিসরে সবটুকু বলে শেষ করা সম্ভব নয়। যদি সব বলতে বসি তবে হয়ত একটা বই-ই হয়ে যেত।’
মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেভাবে এগুচ্ছে তাতে করে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য আর কোনোদিন উদঘাটন হবে না বলে জনমানসে এরকম একটি প্রশ্ন তৈরিই হয়েছে। যেমনটি এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের ঘটনা। অনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশের পুলিশ চাইলেই সব পারে। কিন্তু এও সত্য পুলিশ চাইলেও পারে না। যদি সিনেমার মতো ঘটনার মধ্যে আবার ঘটনা ঘটতে থাকে। মিতু হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচনে পুলিশ নিজেও কিছু রহস্য তৈরি করেছে। পুলিশ নিজেই সবচেয়ে যে রহস্যটি তৈরি করেছে তা হলো গত বছরের ৫ জুলাই নবী ওরফে নুরুন্নবী এবং নুরুল ইসলাম রাশেদ ওরফে ভাগিনা রাশেদার বন্দুকযুদ্ধে রাঙ্গুনিয়ার রানীরহাট এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনা। সে সময় পুলিশ বলে এরা দুজনই মিতুর কিলিং মিশনে যুক্ত ছিল। এর আগে ২৬ জুন মিতু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ওয়াসিম এবং আনোয়ার আদালতে দাঁড়িয়ে মিতু হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ৭ জনের নাম প্রকাশ করেছিল। মিতু হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বলে সবচেয়ে বড় যে সন্দেভাজন সেই মুছা এখন কোথায় কীভাবে আছে কেউ জানে না। এখানেও পুলিশ সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।
মিতু হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিলো জঙ্গীরা ঘটিয়েছে। আবার ধারণা করা হলো নেপথ্যে অন্য ধরনের স্বার্থবাজ রাঘববোয়ালরা রয়েছে। স্বামী বাবুল ছাড়া অনেকের বিরুদ্ধেই সন্দেহের তীর ছোঁড়া হচ্ছিল। অনেকেই অনেক কথা বলছিলেন। বাবুলের প্রফেশনাল দক্ষতা আর ভেতর বাইরের শত্রুমিত্র নিয়েও কথা বলা হলো। কিন্তু এখন খোদ ঘরের মধ্যেই নতুন সন্দেহ ও যুদ্ধ শুরু হয়েছে যা সাধারণ জনগণের রক্তও হিম করে দিচ্ছে। তবে এটি সত্য মিতুর বাবা-মা এবং বাবুলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তেমন পরিষ্কার নয়। মিতুর বাবা মা বাবুলের সম্পৃক্তার কথা বলে যেসব কারণ চিহ্নিত করেছেন সে-গুলো খুব জোরালো নয়। এওতো ঠিক যে কোনো পিতাই চাইবে না তাঁর সন্তানের সামনে তারই লেলিয়ে দেওয়া খুনী তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করুক। আবার বাবুল স্পষ্টত বলছে না কারা, কেন এই ধরনের নির্দয় নিষ্ঠুর কাজটি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো এই হত্যাকাণ্ড উদঘাটনে পুলিশ মোটেও সফলতার পরিচয় দিতে পারছে না। তথ্য-প্রযুক্তির এই আমলে মিতুর ব্যবহ্নত সিমটি উদ্ধার করতে এত সময় কেন লাগবে? এটিতো এমন হওয়ার কথা ছিল যে মিতুর সিমটি যখনই সচল হবে তখনই পুলিশের অনুসন্ধানী সেল বিষয়টি জানতে পারবে। অথচ মিতুর মায়ের কাছ থেকে শোনার পর পুলিশ সিমটি উদ্ধারে তৎপর হয়। খুব সম্ভবত মিতু হত্যাকাণ্ডের ফয়সালা হয়ে গেছে সেদিনই যেদিন এসপি বাবুলকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়? আর এখন সত্যমিথ্যার আড়ালেই ঘুরপাক খাবে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








