অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় ২ বছরের জন্য শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করায় নিন্দা-সমালোচনায় সরব সামাজিক মাধ্যম। দেশের শিক্ষাবিদ, লেখক, সাংবাদিকরা বাংলা একাডেমির এমন সিদ্ধান্তের নিন্দা এবং প্রকাশককে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ না দেয়ায় কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
মুক্তমতের চর্চা এবং প্রতিবাদ করার গণতান্ত্রিক অধিকার থাকার পরও শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় মহান ভাষা আন্দোলনের অর্জনই প্রশ্ন বিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করে দেশের সচেতন সমাজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বাংলা একাডেমির ভূমিকায় প্রশ্ন তুলে ফেসবুকে লিখেছেন,‘ একুশের ঐতিহ্য বিস্মরিত হয়ে, ‘কী’ রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে বাংলা একাডেমী???
“ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে-পায়!”
প্রকাশক গ্রেফতারের সমালোচনা করায় বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলায় রবীন আহসান এর শ্রাবণ প্রকাশনীর স্টল দু’বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে!
কথা বলার অধিকার চেয়ে হাজার মানুষের ধর্মঘট, “বরকত, সালামের খুনে লাল ঢাকার রাজপথ” — এই দিয়ে না বাংলা একাডেমীর ভিত গড়া!”

মেলায় স্টলের জন্য অনুমোদন চাইতে গিয়ে শ্রাবণ নিষিদ্ধ করার কথা জানতে পারেন প্রকাশনীটির স্বত্বাধিকারী রবীন আহসান। ফেসবুক স্ট্যাটাসে আকস্মিক এই তথ্যে নিজের বিস্ময় জাগানো অনুভূতি জানিয়ে তিনি লিখেছেন,‘ আজকে জানলাম শ্রাবণ প্রকাশনী ২ বছর বাংলা একাডেমিতে নিষিদ্ধ!!! বাংলা একাডেমির বইমেলায় সংস্কৃতিমিস্ত্রীর উপস্তিতিতে ষষ্ঠ সভায় নাকি এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে! আমরা কি করতে পারি?”
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের স্বেচ্ছাচারি ভূমিকায় প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক মুজতবা খন্দকার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,‘ কেবল একটা একাডেমির মালিক বনে এত ভাব! দেশের মালিক হলে না জানি তিনি আরো কত কি নিষিদ্ধ করতেন’।
বাঙালির সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি খোদ বাংলা একাডেমিতেই হারাতে বসেছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
সাংবাদিক তুষার আব্দুল্লাহ ফেসবুকে লিখেছেন,‘সমালোচনা সহ্য করার সহিষ্ণুতা বাংলা একাডেমির যদি না থাকে, তবে তাকে কোথায় খুঁজে পাই?’।

গণমাধ্যমকর্মী ও লেখক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা,‘ শ্রাবণ প্রকাশনী ২ বছর বাংলা একাডেমিতে নিষিদ্ধ! কেন? বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা যারা করেন তারা এতোটা অসহিষ্ণু হতে পারেন? আমি যেদিকেতে চাই, অবাক বনে যাই কোন অর্থ নাহি পাই …”
সাংবাদিক হাসান মামুন এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,‘ শুধু বাংলা একাডেমি নয়, অন্যান্য ‘প্রতিষ্ঠানে’রও খোঁজ নিন। কোথায় আছে সহিষ্ণুতা?’।
শুধু বাংলা একাডেমির এমন ভূমিকায় সরকারের সমালোচনাও করেছেন কেউ কেউ।
লেখক মাসুদা ভাট্টি’র ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা,‘ নিষিদ্ধ একটি শব্দ মাত্র যা দিয়ে জনপ্রিয় হওয়া যায় দ্রুতই এবং রাজনীতির একটি ঘুটিও! দুঃখ কোথায় রাখি? নিষিদ্ধ আর আওয়ামী লীগ সরকার, ঠিক খাপ খায় না! ’
বাংলা একাডেমির উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে সাংবাদিক সাঈফ ইবনে রফিক লিখেছেন,‘ ইংরেজরা যে কারণে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বানাইছিল, পাকিস্তানিরা একই কারণে বাংলা একাডেমি বানাইছিল। শ্রাবণ প্রকাশনী না থাকলে আমি বইমেলায় ঢুকবো না, আপনি?’।

লেখক জাহিদ হোসাইন লাকী শ্রাবণ নিষিদ্ধের নিন্দা জানিয়েছে ফেসবুকে লিখেছেন,‘ তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির প্রকাশনা সংস্থা ‘শ্রাবণ প্রকাশনী’ থেকে আমার ৪ টি গ্রন্থ ও ১ টি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এবারও ৩ টি গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। আমার ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থটি শ্রাবণ প্রকাশনীর বেষ্ট সেলার এর তালিকায় ছিল গত বইমেলায়। একটি টকশোতে বাংলা একাডেমির অপকর্মের প্রতিবাদ করায় আজ শ্রাবণ প্রকাশনীকে দুই বছরের জন্য বই মেলায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বাংলা একাডেমি! এটা কেমন আচরণ হলো মাননীয় ডিজি মহোদয়? আমাদের মতো সামান্য লেখকদের ক্ষতি করে আপনার কী লাভ?!’।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির জয় দেখা যাচ্ছে জানিয়ে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক রাজেশ পাল লিখেছেন,‘ স্বত্বাধিকারী কর্তৃক একজন প্রবীণ প্রকাশককে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানানোর কারণে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ শ্রাবণ প্রকাশনীকেই নিষিদ্ধ করে দিলেন অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে। তাও আবার দুই বছরের জন্য। গতবছর বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল শামসুজ্জোহা মানিকের ব দ্বীপ প্রকাশনী। গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁকে। যতটুকু জানা আছে , তিনি এই অশীতিপর বৃদ্ধ বয়সে এখনো জেলের ঘানি টানছেন।
এর আগের বছর এই বইমেলাতেই কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা বাংলা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় আমাদের প্রিয় অভিদাকে। আর তাঁর বই প্রকাশ করায় প্রকাশক দীপন ভাইকে।
এই বইমেলা প্রাঙ্গণেই মরণঘাতী আঘাত আসে হুমায়ূন আজাদ স্যারের উপরে।
বোঝাই যাচ্ছে , প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পাশাপাশি বাংলা একাডেমীর বড় পদে থাকা সুশীল ব্যক্তিরাও চাইছেন এমন একটি বইমেলা যেখানে পুস্তক বলতে পাওয়া যাবে বাচ্চাদের নন্টে ফন্টে কমিকস্ , সোলেমানী তাবিজের কিতাব , এরাবিয়ান নাইটস বা রসময় গুপ্তসমগ্র।
আর এই কারণেই গতবছর আগেভাগেই সাবধান করে দেয়া হয়েছিল উস্কানিমূলক লেখা না লেখার ব্যাপারে। আর এবছরতো মেলা শুরুর আগেই নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো একটা আস্ত প্রকাশনীকে।
অবিলম্বে জেলখানা থেকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে শফিউর রহমান ফারাবিকেই বরং বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হউক। তাতেই বরং ষোলোকলা পূর্ণ হবে। সবকিছুই নষ্টদের অধিকারে যাবে, সরি, চলে গেছে’।

উল্লেখ্য, শ্রাবণের স্বত্ত্বাধিকারী রবীন আহসান এবারের বইমেলার স্টলের আবেদন পত্র আনার সময় জানতে পারেন আগামী দু’টি বই মেলায় তার শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করেছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ।
বাংলা একাডেমির কিছু কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলায় তার উপরে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই ব্যাপারে শ্রাবণ প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী রবীন আহসান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘গতবছরও বাংলা একাডেমি এই ব্যাপারে আমাদের কোনো নোটিশ দেয়নি। এবারও দেয়নি। এবার যখন ফর্ম আনতে লোক পাঠিয়েছি তখন তারা বলেছে শ্রাবণ প্রকাশনী নিষিদ্ধ’।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গতবার বইমেলা থেকে প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিককে গ্রেফতার করা হয়। শামসুজ্জোহা মানিকের পক্ষে ও বাংলা একাডেমির ওই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে টেলিভিশন টকশোগুলোতে কথা বলায় এবং সমাবেশ করায় এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে’।
তবে এখনকার করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে রবীন বলেন, সবকিছু গুছিয়ে তারপর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবো। ওই সময়ের সমাবেশে যারা ছিলো তাদের কেউ কেউ বাংলা একাডেমি ঘেরাও কর্মসূচি প্রদান করেছে।
উল্লেখ্য গত বইমেলায় আলোচিত সেই বইটি বের হয়েছিলো বদ্বীপ প্রকাশনী থেকে। বইমেলায় বদ্বীপ প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করা ও লেখক-প্রকাশক সামশুজ্জোহা মানিকের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সরব ছিলেন শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্ত্বধিকারী রবীন আহসান। সেই জন্যই আগামী দুই বছরের জন্য তার প্রতি এই নিষেধাজ্ঞা।








