অনেকদিন ধরেই দেশের ফুটবল মহাসংকটে পতিত। কোনো আয়োজন থেকেই ভালো কোনো ফলাফল বয়ে আনতে পারছে না ফুটবল দল। উল্টো মালদ্বীপ, ভুটানের মতো দেশের কাছেও এখন নাকানি-চুবানি খেতে হচ্ছে। ফুটবলের এই মহা দুঃসময়ে বারবার বিদেশী কোচ আনা হলেও তাতে কার্যকর কিছুই হচ্ছে না। বরং ব্যর্থতার ষোলোকলাই বারবার চিত্রায়িত হচ্ছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ ফুটবল দলের বিদেশী কোচ ছিলেন বেলজিয়ামের টম সেন্টফিট। কিন্তু তিনি ভুটানকে জয় করতেই ব্যর্থ হন।
গত বছরের অক্টোবরে এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে ভুটানের মাঠে বাংলাদেশ ৩-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হলে বাফুফের সাথে নতুন করে কোনো চুক্তি না হওয়ায় সেন্টফিস্ট বাংলাদেশের শুভকামনা করে বিদায় নেন। সেন্টফিট চলে যাওয়ার পর অনেকটাই কোচবিহীন থাকে বাংলাদেশ দল। আর তাই নতুন করে আবার কোচের অনুসন্ধান চলে। নতুন কোচ হয়ে আসছেন অষ্ট্রেলিয়া থেকে এন্ড্রু অর্ড নামের একজন। এই কোচের বয়স তেমন বেশি নয়।
আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে তার সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে বলে বাফুফে জানিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা তাতে মনে হয়-শুধু বিদেশী কোচ যায় কোচ আসে, ফুটবলের কিছুই হয় না। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন ১৮ জন বিদেশী কোচ। এর মধ্যে প্রথম দিককার কোচেরা ভালো সফলতা দেখালেও হালে যারা আসছেন তারা কিছুই করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম বিদেশী কোচ হয়ে আসেন জার্মানের ওয়ার্নার বেকেলহফট।
এ দেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে তখনই আনা হয় বেকেলহফকে। তাকে আনার অন্যতম কারণ ছিল বিদেশের মাটি এবং বিদেশী দলগুলোর বিরুদ্ধে যেনো বাংলাদেশ ভালো করত পারে। ওয়ার্নার বেকেলহফটের পর ৮২ সালে কোচ হয়ে আসেন জার্মানের গার্ডস্মিট। তিনিও আসেন চুক্তির আওতায়। গার্ড স্মিট মাত্র এক বছর কোচিং করান বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের। তার কোচিং ৮২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল দল ভারতের দিল্লীতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করে। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ তিনটি খেলায় অংশ নিয়ে দুটিতে পরাজিত হয় এবং একটিতে জয়লাভ করে।
গার্ডস্মিথের এ ফলাফল সে সময় খানিকটা প্রশংসিতই হয় ক্রীড়ামোদীদের কাছে। ৮২ সালে গার্ডস্মিথ চলে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দল বিদেশী কোচবিহীন থাকে। প্রায় পাঁচ বছর পর আবার যেনো সম্বিত ফিরে পান বাফুফের কর্মকর্তারা। ৮৯ সালে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ইরানের নাসের হেজাজীকে। একসময় মোহামেডান ক্রীড়া চক্রে খেলোয়াড় কাম কোচ হিসেবে যোগ দেন তিনি। তার কোচিং এবং দল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় মুগ্ধ হয়েই বাফুফে তাকে আমন্ত্রণ জানায়।

বাফুফের আমন্ত্রণে সাড়া দেন নাসের হেজাজী। হেজাজীর সিলেকশনও সর্বত্র সমাদৃত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মাত্র ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় দল থেকে বহিস্কার করা হয় তাকে। তার বহিষ্কারের কারণ ছিল ভালো ফলাফল এনে দিতে না পারা। নাসের হেজাজীর পর ৯৩ সালে কোচ হিসেবে আনা হয় সুইজারল্যান্ডের ওল্ডরিখ সোয়াবকে।
কোচ সোয়াবকে আনা হয়েছিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ গেমসের ফুটবল স্বর্ণ জয়ের একান্ত বাসনায়। সোয়াব ফুটবলারদের নিয়ে প্রাণান্তকর চেষ্টাও করতে থাকেন। টুর্নামেন্টের আগে তার কোচিং পদ্ধতির অনেকেই প্রশংসাও করেন । কিন্তু বাস্তবে ঘটে একেবারে উল্টো ঘটনা। মালদ্বীপ, নেপালের কাছে অসহায়ের মতো অাত্বসমর্পণ করে বাংলাদেশের ফুটবলাররা রীতিমতো এক হ্নদয় বিদারক ঘটনার জন্ম দেয়। বিদায় করে দেওয়া হয় সোয়াবকে।
এরপর বছর না ঘুরতেই অনেকটা দ্রুতই দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা হয় কোচ ম্যান ইয়াং ক্যাংকে। কিন্তু ক্যাংও বেশিদিন টিকতে ব্যর্থ হন। ৯৫ সালে বাংলাদেশে কোচ নিযুক্ত হয়ে আসেন অটো ফিস্টার। বলা যায়, বাংলাদেশে এ যাবৎ সর্বকালের সেরা কোচ ছিলেন তিনিই। ঘানাকে বিশ্ব যুবকাপ পাইয়ে দেওয়া এই কোচ জাতীয় দলের দায়-দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমবারের মতো বিদেশী কোনো টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য কৃতিত্বও দেখান ফিস্টার। তার কোচিং-এ ফুটবলার মুন্নার নেতৃত্বে মায়ানমারে অনুষ্ঠিত চার জাতি ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ যেনো শত বছরের কালিমা লেপন করতে সক্ষম হয়।
এরপর অনেকদিন অটো ফিস্টারকে বসিয়ে রাখা হয়। ফলে অভিজ্ঞ বনেদী এই কোচ কর্মকর্তাদের ওপর ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে স্বদেশে চলে যান। পরবর্তীতে সৌদি আরব, টগো এবং ক্যামেরুন ফুটবল দলের কোচ হিসেবে তিনি কাজ করেন। অটোফিস্টার চলে যাওয়ার পর ৯৮ সালে কোচ হিসেবে যোগ দেন ঢাকার মাঠে আবাহনীর হয়ে খেলা আলোচিত ফুটবলার সামির শাকির। ইরাক জাতীয় দলে খেলা শামির সাকির ৮৭ সালে আবাহনী ক্রীড়া চক্রের হয়ে খেলেন।
এরপর আবাহনীর কোচ হন তিনি। আবাহনীর পর মোহামেডান ক্লাবেরও কোচের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর দায়িত্ব নেন জাতীয় দলের। শুরতে শামির সাকিরকে নিয়ে অনেক রকম প্রশ্নের অবতারণা হলেও মাঠে নিজেকে অন্যরকমভাবে মেলে ধরতে থাকেন মহা মেজাজী সামির শাকির। প্রথমে সাফ ফুটবলের আগে গোয়ায় অনুষ্ঠিত একটি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশকে রানার্স আপ করে ক্রীড়ামোদীদের মাঝে কিছুটা উষ্ণতা তৈরি করেন। এরপর সাফ গেমসে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করে দীর্ঘ পনোরো বছরের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি।
ফুটবলমোদীদের কাছে শামির সাকির সত্যিই একজন কৌশলী কোচ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। কিন্তু পরবর্তীতে বাফুফে কর্মকর্তাদের সাথে তার বনিবনা না হওয়া এবং শামির সাকিরের কিছু বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে অনেকটা দ্রুতই শামির সাকির পর্বের সমাপ্তি ঘটে।
শামির সাকিরের পর ২০০০ সালের প্রারম্ভে অষ্টম বিদেশী কোচ হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে আসেন কোচ মার্ক হ্যারিসন। মে মাসে তার কোচিং-এ জাতীয় দল অংশগ্রহণ করে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত চারজাতি ফুটবল টুর্নামেন্টে। সহসাই তার বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠে। ২০০১ সালে কোচিং-এর দায়িত্ব নেন অস্ট্রিয়ান কোচ জজ কোটান। অস্ট্রিয়ান এই কোচ সাফ ফুটবলে বাংলাদেশে চ্যাম্পিয়ন করার অনন্য কৃতিত্ব দেখান। কিন্তু নানাবিধ বিষয় নিয়ে বাফুফের কর্মকর্তাদের সাথে তার টানাপোড়েন ও মতবিরোধ চলতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় একসময় তল্পিতল্পাসহ তাকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। দীর্ঘ আড়াই বছর কোচবিহীন থাকে বাংলাদেশ। এরপর আনা হয় আর্জেন্টিনা থেকে দশম বিদেশী কোচ আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানি। ত্রুসিয়ানি ফুটবলে কিছুটা পরিবতন আনতে পারলেও করাচিতে অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশীপে দলকে শীর্ষে নিতে ব্যর্থ হন। এই ধারাবাহিকতায় তাকে বিদায় নিতে হয়।
ক্রুসিয়ানির বিদায়ের পর কোচ নিয়ুক্ত হন ভারতের সৈয়দ নাইমুদ্দিন। কিন্তু ২০০৭ সালে তিনিও আশানারুপ অর্জনে ব্যর্থ হন। বিদায় ঘন্টা বেজে উঠে তার। এরপর ২০০৮ সালে প্রথম ব্রাজিলিয়ান কোচ হয়ে আসেন এডসন সিলভা ডিডো। ডিডো শৃঙ্খলাভঙ্গেও দায়ে বেশ কয়েকজন খেলোয়ারকে শাস্তির আওতায় আনলে বিষয়টি নিয়ে বাফুফের সাথে তার দ্বন্ধ তৈরি হয়। শেষমেষ তাকে বিদায় নিতে হয়।
এরপর ক্রোয়েশিয়া থেকে আসের রবার্ট রুবচিচ। তিনিও সাফল্যেও খাতা খোলার আগেই বিদায় নেন। এরপর আসেন নিকোলাই ইলিয়েভস্কি মেসোডোনিয়া থেকে। এসেই মালদ্বীপের সাথে সাফের লড়াই-এ বড় পরাজয়ের স্বাদ এনে দেন। বিদায়ও তার নিশ্চিত হয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশ দলের সাথে যুক্ত হন ডাচ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ, ইতালির ফাবি ও লোপেজ, স্পেনের গঞ্জালো মরেনো। আর সবশেষ ছিলেন টম সেন্টফিট।
এখন আসছেন কোচিং জগতের তরুণ মানুষ অষ্ট্রেলিয়ার এন্ড্রু অর্ড। বায়োডাটার প্রাথমিক তথ্য বলছে অতোটা অভিজ্ঞ কোচ নন তিনি। ফলে কতদিন তিনি টেকসই হন সেই প্রশ্ন সামনে থেকেই যাচ্ছে। আরও প্রশ্ন সত্যিই কী তিনি কিছু উপহার দিতে পারবেন? নাকি ফটো সেসনের মাঝেই সব আবদ্ধ থাকবে? কেননা কোচ যায় আর কোচ আসে-কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলের কী হয়?
বাংলাদেশ ফুটবলের সাথে যে সব বিদেশী কোচ এ যাবৎ সম্পৃক্ত হয়েছেন
কোচের নাম সময়কাল দেশ
ওয়ার্নার বেকেলহপ্ট ১৯৭৮-১৯৮০ জার্মান
গার্ড স্মিট ১৯৮২ জার্মান
নাসের হেজাজি ১৯৮৯ ইরান
ওল্ডরিখ সোয়াব ১৯৯৩ সুইজারল্যান্ড
ম্যান ইয়াং ক্যাং ১৯৯৫ দক্ষিণ কোরিয়া
অটো ফিস্টার ১৯৯৫-৯৭ জার্মান
সামির শাকির ১৯৯৮-৯৯ ইরাক
মার্ক হ্যারিসন ২০০০ ইংল্যান্ড
জর্জ কোটান ২০০১-০৩ অস্ট্রিয়া
ডিয়েগো ক্রুসিয়ানি ২০০৫-০৬ আর্জেন্টিনা
সৈয়দ নঈমুদ্দিন ২০০৭-০৮ ভারত
এডসন সিলভা ডিডো ২০০৮-০৯ ব্রাজিল
রবার্ট রুবচিচ ২০১০-২০১১ ক্রোয়েশিয়া
নিকোলাই ইলিয়েভস্কি ২০১১-১২ মেসোডনিয়া
লোডভিক ডি ক্রুইফ ২০১৩-১৬ হল্যান্ড
ফাবি ও লোপেজ ২০১৫ ইতালি
গঞ্জালো মরেনো ২০১৬ স্পেন
টম সেন্টফিট ২০১৬ বেলজিয়াম
এন্ড্রু অর্ড ( অনুষ্ঠানিক চুক্তির অপেক্ষায়) ২০১৭ অষ্ট্রেলিয়া
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)




