বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট যুক্তিতে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে এই জামিনের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ যে সব যুক্তি তুলে ধরে মিন্নির জামিন প্রশ্নে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা সেগুলো হচ্ছে-
১) এজাহারে আসামির (মিন্নির) নাম উল্লেখ না থাকা।
২) গ্রেপ্তারের আগে দীর্ঘ সময় মিন্নিকে পুলিশ লাইনসে আটক রাখা।
৩) আদালতে হাজির করে রিমান্ড শুনানির সময় তার (মিন্নির) আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ না পাওয়া।
৪) ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিপিবদ্ধ করার আগেই আসামির দোষ স্বীকার সম্পর্কিত জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্য দেওয়া।
৫) তদন্তকারী কর্মকর্তার মতে মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে, সুতরাং আসামি কর্তৃক তদন্ত প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ না থাকায়।
৬) এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারার ব্যতিক্রম, অর্থাৎ আসামি একজন নারী- এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার জামিন প্রশ্নে জারি করা রুলটি যথাযথ ঘোষণা করা হল।
তবে জামিন আদেশ দিয়ে আদালত বলেন: জামিন পেয়ে সে (মিন্নি) তার বাবার জিম্মায় থাকবে এবং মিডিয়ার সামনে সে কথা বলতে পারবে না।
মিন্নির জামিন আদেশের পর তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের বলেন: আমি খুব খুশি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুষ্কৃতিকারীরা যেগুলো করতেছে, এগুলো সব জনসম্মুখে প্রচার পেয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারোয়ার হোসেন বাপ্পি বলেছেন: এ রায়ে আমরা মর্মাহত। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত লিভ টু আপিল করবে।
আজ আদালতে মিন্নির জামিনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জেড আই খান পান্না, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন, আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন মেহেদী, আইনুন নাহার সিদ্দিকা, ব্যারিস্টার অনিক আর হক, আইনজীবী এম মঈনুল ইসলাম, মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম, রোহানি সিদ্দিকা ও জামিউল হক ফয়সাল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসেন।
এর আগে গত ২০ আগস্ট হাইকোর্টের এই বেঞ্চ মিন্নির জামিন প্রশ্নে রুল জারি করেন। এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয় এবং এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে মামলার নথিসহ ২৮ আগস্ট হাইকোর্টে তলব করা হয়। এছাড়া মিন্নি দোষ স্বীকার করেছে দাবি করে দেয়া সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে বরগুনার এসপিকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
সেই অনুযায়ী বুধবার এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামলার নথিসহ হাজির হন। সেই সাথে সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে বরগুনার এসপির দেয়া লিখিত ব্যাখ্যা আদালতে দাখিল করা হয়। এরপর আদালত এ বিষয়ে শুনানি নিয়ে রায়ের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
এর আগে গত ৮ আগস্ট বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের অবকাশকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এই জামিন আবেদন ফেরত নেন মিন্নির আইনজীবী। ওইদিন হাইকোর্ট বেঞ্চ মিন্নিকে জামিন না দিয়ে জামিন প্রশ্নে রুল জারি করতে চেয়ে বলেন, জামিন দিতে হলে আগে এ মামলার ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি দেখতে হবে। তাই আমরা শুধু রুল জারি করতে পারি।
তখন মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না মিন্নির জন্য জামিন প্রার্থনা করলে আদালত বলেন, আমরা এখন রুল দিতে পারি অন্যথায় আপনারা আবেদনটি ‘টেক ব্যাক’ করতে পারেন। তখন মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন: ওকে, আমরা জামিন আবেদনটি (ফেরত নিচ্ছি) ‘টেক ব্যাক’ করছি।
এরপর মিন্নির এই জামিন আবেদনটি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানির জন্য আনা হয়।
এর আগে গত ৩০ জুলাই বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান মিন্নির জামিন নামঞ্জুর করে আদেশ দেন। তার আগে গত ২১ জুলাই বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালত মিন্নির জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করেন।
গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যার ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
এ ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয় রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশাকে। কিন্তু আয়েশার শ্বশুর মামলার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই এই হত্যাকাণ্ডে আয়েশা জড়িত এমন দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করার পর মামলাটির তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয়।
পরবর্তীতে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় মিন্নিকে। আর এই মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া সবাই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
অন্যদিকে গত ২ জুলাই এই মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।








