১৯৯৩ সালের কথা। আমার ভাই’র মেয়ে যে নিজেই এখন মা সে তখন ক্লাস টু-এ পড়ে। কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সাধারণ জ্ঞানের একটা বই পড়ছিলো। সেখান থেকে কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম। একটা প্রশ্ন এরকম: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির নাম কী? আব্দুর রহমান বিশ্বাস, ঝটপট উত্তর তার। আমার মাথায় একটু দুষ্টুমি খেলা করলো। জানতে চাইলাম, আব্দুর রহমান বিশ্বাস মুক্তিযোদ্ধা নাকি রাজাকার? রাজাকার। কিভাবে জানো যে সে রাজাকার? শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বলেছেন। রাজাকার কারা? যারা একাত্তরে পাকিস্তানীদের সঙ্গে মিলে আমাদেরকে মেরেছে।
আমি বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমরা তখন ঢাকায় আধা সাংবাদিকতার সঙ্গে আধা কর্মী হিসেবে শহীদ জননীর যে আন্দোলনে সামিল হয়েছি, সেটা যে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এভাবেও কাজ করেছে বা করছে; তা নিয়ে নতুন উপলব্ধি হলো। ঢাকায় ফিরে জাহানারা ইমামকে ঘটনাটা বলার পর তিনি বললেন, এরাই দেখো একদিন যুদ্ধাপরাধীদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করবে।
তিনি ঠিক ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তিনি শুধু গণতদন্ত কমিশন আর গণআদালতে প্রতীকি বিচার করে যেতে পারলেও রক্তঋণের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার, মানুষের উপর তাঁর প্রবল বিশ্বাস আর ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ করে তিনি দিব্যচোখে দেখতে পেরেছিলেন, একদিন ঠিকঠিকই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। নিজে তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামী হিসেবে মৃত্যুবরণ করলেও (পরে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ওই মামলা প্রত্যাহার করেন) তিনি জানতেন, যে পতাকা তিনি রেখে যাচ্ছেন সেটা উত্তর প্রজন্ম পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।
তাঁর আন্দোলনের দুই দশকেরও বেশি সময় পর আজ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং একের পর এক যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে, প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে যখন বিপর্যস্ত করা সম্ভব হয়েছে, তখন অতীতের দিকে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রবল ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার বিপরীতে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য প্রবল যে ঘৃণার সৃষ্টি করে যেতে পেরেছেন সেটাই নতুন প্রজন্মকে জাগিয়ে দিয়েছে।
নতুন প্রজন্মের নতুন এ কণ্ঠকে আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে শেখ হাসিনা শুধু উপলব্ধিই করেননি তিনি তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল হওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রশ্নে সময় সময় আওয়ামী লীগ আপোষকামিতা দেখিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত মানুষের আকাঙ্খাকেই ধারণ করে বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেছে।
তবে, একটি জাতির সম্মিলিতভাবে ন্যায়বিচার প্রত্যাশী হওয়া কিংবা বিচার প্রক্রিয়ায় মাঝেমধ্যে হোঁচট খাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে গণজাগরণের মতো অবস্থার সৃষ্টি হওয়া হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ নয়। কয়েক দশক ধরে ছোটবড় যে আন্দোলন তারই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার গণদাবিতে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্কে এবং হৃদয়ে তা এমনভাবে মিশে গেছে যে মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পরে হলেও রাষ্ট্র তাদের বিচার অনুষ্ঠানে বাধ্য হয়েছে। আবার জনদাবিকে নিজের দাবি এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে পরিণত করার পরও রাজনৈতিক সরকার যখন দোদুল্যমনতা দেখিয়েছে নতুন প্রজন্ম তখন আবার রাস্তায় নেমে এসেছে, সরকারও জনদাবি রূপে আবির্ভূত গণসমর্থনে আরো শক্তিশালী হয়ে বিচার অনুষ্ঠানে আরো শক্ত অবস্থান নিতে পেরেছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এভাবে যে গণমানুষের আকাঙ্খায় পরিণত হয়েছিলো তার শুরুর কাজটা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কয়েক মাস পরই শুরু হয়েছিলো। সেটাও শুরু করেছিলেন জাহানারা ইমাম। অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন যে ১৯৯২ সালে গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীর আমীর হওয়ার পরই তিনি প্রথম উচ্চকিত হয়েছেন। কিন্তু, বিষয়টা মোটেই তা নয়।
ইতিহাস সাক্ষী যে শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ অন্য শহীদ পরিবারগুলো সেই ১৯৭২ সালেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। বিচার প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছিলো। কিন্তু, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হওয়ার পর ওই প্রক্রিয়া শুধু বন্ধই হয়ে যায়নি, কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীরা রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পায়, ক্ষমতার অংশীদারও হয় তারা।
এমন প্রেক্ষাপটে সংগ্রামের ধরনটা একটু পাল্টে যায়। একদিকে জাহানারা ইমাম ধারাবাহিকভাবে লিখতে থাকেন ‘একাত্তরের দিনগুলি’, অন্যদিকে তার সহযোদ্ধারা প্রকাশ করেন ‘একাত্তরের ঘাতক-দালালেরা কে কোথায়’। দুটি বইই ওই সময়ের নতুন প্রজন্মকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। জাহানারা ইমাম পরে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করে গণআদালতে গোলাম আযমের বিচার আয়োজন করলে এই নতুন প্রজন্ম তার সহযাত্রী হয়।
এতোদিন শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চললেও এবার রাজপথে যে সংগ্রাম তার ধারাবাহিকতায় পরের প্রজন্ম আরো প্রবলভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে পরের কয়েক সপ্তাহ যে প্রবল গণজাগরণ তাতে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে চূড়ান্ত ফয়সালা গেছে। সেই গণজাগরণের প্রাণশক্তিও ছিলেন জাহানারা ইমাম।
শহীদ জননী প্রতিষ্ঠিত নির্মূল কমিটির আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যে গণজাগরণ সেই জাগরণ এখনো চলছে। তবে কয়েক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়েই যে যুদ্ধাপরাধীদের আদর্শ নির্মূল হয়ে গেছে, বা যাবে এমন নয়। একটি তথাকথিত আদর্শিক কারণেই জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী হয়ে হত্যা-গণহত্যা-ধর্ষণ-লুটপাট-জ্বালানো-পোড়ানোর মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। তাই যে কথিত আদর্শের কারণে যুদ্ধাপরাধ সেই রাজনীতিটা সমূলে উৎপাটন করা না পর্যন্ত নির্মূল কমিটির কাজ শেষ হবে না।
কেনো এ আন্দোলনকে আরো বেশি শক্তিশালী করতে হবে তার লক্ষণ এরই মধ্যে স্পষ্ট।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ফলে জামায়াত-শিবির অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে আর সামনে পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কারণে তারা নতুন নতুন পথ খুঁজছে। নিজেরা জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসের রাজনীতির ধারক-বাহক হওয়ার কারণে এখন তারা জেএমবি কিংবা আইএসের মতো জঙ্গি গ্রুপের সঙ্গে আরো বেশি মিশে যাচ্ছে। আগামী প্রজন্মকে জঙ্গি আদর্শে তৈরি করতে সরাসরি জঙ্গি তৎপরতার পাশাপাশি নানা নামে নানা ছদ্মবেশে তারা বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। এর সবই যে সরকার তার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে মোকাবেলা করতে পারবে এমন নয়। এজন্য আদর্শিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখাটা জরুরি। সেই জরুরি কাজটার জন্যই নির্মূল কমিটি কিংবা গণজাগরণ মঞ্চের মতো সংগঠনগুলো আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।
বিশেষ করে বামপন্থী দলগুলো যখন অস্তিত্বের সংকটে কিংবা শুধু আওয়ামী বিরোধিতার কারণেই কখনো কখনো তাদের অবস্থান চরম ডানপন্থীদের মতো, যখন সাংস্কৃতিক আর শিশু সংগঠনগুলো ক্রমশঃ বিলুপ্তির পথে; তখন অসাম্প্রদায়িক-আধুনিক বাংলাদেশ গঠনে আধুনিক ধ্যান-ধারণায় নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে নানা ফ্রন্টে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে নির্মূল কমিটি। মনে রাখা উচিত উত্তর প্রজন্মকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে না পারলে অন্ধকারের শক্তি ছোবল দেবেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







