ঢাকা, এক মায়ার শহর। জাদুর শহর। কার্যত বিশ্বের নোংরা শহরগুলোরও একটি। আর এমন শতচ্ছিন্ন একটি শহরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে যিনি মনে প্রাণে শপথ নিয়েছিলেন তিনি আনিসুল হক। মেয়র হিসেবে ক্ষমতা নেয়ার মাত্র দুই বছরেই ঢাকা শহরের আমূল পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। কথা দিয়ে কাজ করার মতো কোনো নেতাকে এই প্রজন্ম খুব একটা দেখেনি, তাই আনিসুলকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকে। অনুগত হয়েছিলেন কেউ কেউ। আর তাই গেল বছরের ৩০ নভেম্বর তার অকাল প্রয়ানের খবরে কেঁদে উঠে পুরো ঢাকা!
আনিসুল হকের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হলো শুক্রবার। ঢাকা শহরের নানা অঙ্গনের মানুষ এমন দিনে তাকে স্মরণ করছেন। সোশাল মিডিয়াতেও আনিসুল হকের প্রতি সাধারণ মানুষের মুগ্ধতা প্রকাশ দেখার মতো। তবে মেয়র হিসেবে তাকে পেয়ে মানুষ যতোটা মুগ্ধ, তারচেয়ে কোনো অংশে কম মুগ্ধ নয় টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে আনিসুল হকের ক্যারিশমা নিয়ে। বিশেষ করে নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে বিটিভির ‘জলসা’র একটি অ্যাপিসোডকে ঘিরে যেন বার বার ফিরে আসছেন তিনি!
সোশাল মিডিয়ায় আনিসুল হকের প্রতিচ্ছবি ধরা দিলো এভাবে, ‘এই শহরে একদিন এলেন এক নায়ক। যার চলনে বলনে বেশ ভিন্নতা। একদিন টিভি পর্দায় দেখা গেল তাকে। দর্শক প্রথম দেখাতেই তুমুল করতালিতে গ্রহণ করলেন। মানুষটি দিন দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে থাকলেন। হয়ে উঠলেন তারকা। তার নাম আনিসুল হক।’
হ্যাঁ। নব্বই দশকে বিটিভির উপস্থাপক হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন সুদর্শন আনিসুল হক। বাচন ভঙ্গি, উপস্থাপনে ভিন্নতা, শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলাসহ নানা কারণেই সব শ্রেণির মানুষের কাছে খুব অল্প সময়েই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন তিনি। তার উপস্থাপনায় বিটিভিতে ‘জলসা’র একটি বিশেষ অ্যাপিসোডে হাজির ছিলেন তৎকালীন সময়ের খ্যাতনামা সব সংগীত ও সাহিত্য বিশারদ। সেইসঙ্গে একই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন বাংলাদেশি ব্যান্ড দলগুলো। পুরনোর সাথে নতুনের কোনো দ্বন্দ্ব আছে কিনা, বা নতুনকে কীভাবে বরণ করেন পুরনোরা ‘জলসা’র সেই আলোচনায় এসব স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছিলেন আনিসুল হক।
১৯৯৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিটিভিতে প্রচার হয় ‘জলসা’। যার প্রযোজক ছিলেন নওয়াজিশ আলী খান! যেখানে দেশের সেরা প্রায় সব ক’জন শিল্পী/ব্যান্ড এক আসরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মোস্তফা মনোয়ার, কলিম শরাফী, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, খান আতাউর রহমান, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সুবীর নন্দী, নীলুফার ইয়াসমিন, সাদিয়া আফরীন মল্লিক, রেনেসাঁ, ফিডব্যাক, মাইলস এবং সোলসের সদস্যরা। যার নান্দনিক উপস্থাপনায় ছিলেন আনিসুল হক। প্রায় দুই যুগ পরেও যে অনুষ্ঠানটি একেবারে টাটকা!
আনিসুল হকের প্রথম প্রয়ান দিবসে তার উপস্থাপনায় ‘জলসা’র সেই আলোচিত অ্যাপিসোডটি ঘুরছে সোশাল মিডিয়াতেও। বিশেষ করে ফেসবুকে শেয়ার করে মুগ্ধতা প্রকাশ করছেন সব প্রজন্মের মানুষ। এরমধ্যে বেশির ভাগই শোবিজ অঙ্গনের। ছোট ও বড় পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা আনিসুল হকের উপস্থাপনায় ‘জলসা’র সেই ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘এমন অনুষ্ঠানও হতো। আনিসুল হক নেই এক বছর। সময় কত দ্রুত যায় …।’
‘জলসা’ নিয়ে এক দর্শক লিখেছেন, উপস্থাপনায় সর্বকালের অন্যতম সেরা প্রয়াত আনিসুল হক। তার উপস্থাপনায় একটা অনুষ্ঠান দেখেছিলাম সেই ছোট বেলায় বিটিভিতে। ওটার রেশ এখনও কাটেনি। অনুষ্ঠানটার বিশেষত্ব ছিল, ওখানে বিভিন্ন মাধ্যম ও পর্যায় থেকে শিল্পীদের এনে একটা ফিউশন ঘটানোর চেষ্টা করেছিল আনিসুল হক সাহেব। বলতে গেলে শতভাগ সফলও হয়েছিলেন। এরকম অনুষ্ঠান এখন হচ্ছে না। হবে কীভাবে, এখন সবাই ই সবার প্রতিদ্বন্দ্বী। আমার দেখা বিটিভির অন্যতম পরিবেশনা ছিল সেটা।
মাজহারুল ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, গত ২৩ বছরেও কেউ এমন একটা অনুষ্ঠান করতে পারলো না। আশ্চর্য! সুজন মাহমুদ নামের একজন লিখেছেন, এই প্রজন্ম আনিসুল হককে চিনে কেবল মেয়র হিসেবে, অথচ তিনি কতোটা শিল্পী ছিলেন তা কি চিনবে কখনো!
আনিসুল হকের ‘জলসা’ দেখে আবার নতুন করে আবেগাপ্লুত তানজিন আহমেদ। ভিডিওটি শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, সবাই কতো বিখ্যাত তবুও কত সহজ-সরল। সবাই কত সহনশীল। সমালোচনা কত সহজভাবে নিচ্ছেন সবাই। আজ কি এরকম অনুষ্ঠান করা সম্ভব? আমরা কেন জানি দিন-দিন অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছি। আসুন আমরা সুস্থ সমাজ গড়ে তুলি।
আরেকজন ব্লগার ‘জলসা’র এই অনুষ্ঠানটি নিয়ে লিখেছেন, একটা সংগীতানুষ্ঠানও যে এত শিক্ষনীয় হতে পারে,এটা না দেখলে বুঝতাম না। সমালোচনা মানেই ঘৃণা নয়। সবাই এক হওয়াটাও বেশ ভালো লাগার বিষয়। যারা কথা বললেন তারাও সবার প্রিয় মানুষ।
বিটিভি’র ‘জলসা’য় আজও মানুষের মুগ্ধতা:








