লিগ-চ্যাম্পিয়ন্স লিগের উড়ন্ত পারফরমেন্স মিলিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে, বার্সেলোনা সেখানে দুই প্রতিযোগিতাতেই ভুগছে! কিন্তু লড়াইটা যখন এল ক্লাসিকোর, তখন আগের সব হিসেব যে বৃথা সেটিই আরেকবার মাঠের রোমাঞ্চে মঞ্চায়িত হল। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকা বার্সাই মেসি-ম্যাজিকে রিয়ালের মাঠে একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে তুলে নিয়েছে দারুণ এক জয়। সেইসঙ্গে স্প্যানিশ লা লিগায় শিরোপার আশা টিকিয়ে রাখল কাতালানরা। বার্সার জার্সিতে এদিন ৫০০তম গোলের অনন্য মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন মেসি।
রিয়ালের ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রোববার রাতে মৌসুমের দ্বিতীয় এল ক্লাসিকোতে স্বাগতিকদের ৩-২ গোলে হারিয়েছে বার্সেলোনা। লিওনেল মেসির জোড়া গোলের সঙ্গে স্কোরের খাতায় নাম তুলেছেন ইভান রাকিটিচ। রিয়ালের এগিয়ে যাওয়া গোলটি কাসেমিরোর, অন্যটি জেমস রদ্রিগেজের।
এই জয়ে ৩৩ ম্যাচে ৭৫ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে উঠে গেছে বার্সা। এক ম্যাচ কম খেলে সমান পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে দুইয়ে রিয়াল।
শুরু থেকেই স্বাগতিকদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে থাকে বার্সেলোনা। তবে প্রথম ভালো আক্রমণটি গড়ে রিয়ালই। ষষ্ঠ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শটে তখন দেয়াল হয়ে দাঁড়ান অতিথি গোলরক্ষক মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন।

বার্সেলোনা ১১ মিনিটে প্রথম সুযোগটি তৈরি করে। তবে বক্সের বাইরে থেকে সুয়ারেজের নিচু শটটি পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। ১৮ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া বেনজেমার শটে আরেকদফা দেয়াল হন টের স্টেগেন। দুই মিনিট পর আবারো ত্রাতা এই জার্মান গোলরক্ষক। এবার রোনালদোর শট বাঁয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক হাতে ঠেকান তিনি।
ম্যাচের ২০ মিনিটে মেসির ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরান মার্সেলো। তার কনুইয়ের আঘাতে মুখ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে বার্সার প্রাণভোমড়ার। পরে মুখে টিস্যু গুঁজে দ্রুত খেলায় ফিরে আক্রমণ শানাতে থাকেন মেসি।
তবে ম্যাচের ২৮ মিনিটে কার্লোস হেনরিক কাসেমিরোর গোলে প্রথম এগিয়ে গিয়েছিল রিয়ালই। কর্নার থেকে আসা বলে বক্সের বাইরে থেকে মার্সেলোর উঁচু শট খুঁজে পায় সার্জিও রামোসকে। তা থেকে নেওয়া অধিনায়কের ভলি ডান পোস্টে লেগে ফেরত আসলে ফিরতি শটে জাল খুঁজে নেন কাসেমিরো।
বার্সার সমতা ফেরানো গোলটি মেসির। আগের ছয় ক্লাসিকোতে গোল পাননি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দুই লেগে জুভেন্টাসের বিপক্ষে গোল নেই। দল টুর্নামেন্টের বাইরে ছিটকে গেছে। তবে লা লিগায় তো চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ স্কোরার তিনিই। ক্লাসিকোর সর্বোচ্চ গোলদাতাও মেসিই। তার পায়েই হয়তো সমতা আসা মানাত!

এসময় ম্যাচের ৩৩ মিনিটে বুসকেটসের বাড়ানো বল রাকিটিচকে খুঁজে পায়। সেটি রাকিটিচ বাড়িয়ে দেন মেসির দিকে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বক্সে ঢুকে প্রথমে ডান পায়ে কারভাহালের থেকে বল সরিয়ে নেন, পরে বাঁ-পায়ের দর্শনীয় শটে কেইলর নাভাসের হাতের নীচ দিয়ে জালে জড়িয়ে দেন।
এরমধ্য দিয়ে লা লিগায় হওয়া ক্লাসিকোতে ১৫তম গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে টপকে সর্বোচ্চের রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন মেসি।
প্রথমার্ধের ৩৬ মিনিটে মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচের শট ঠেকিয়ে দেন স্টেগেন। পরে ৪৩ মিনিটে সুয়ারেজের ক্রসে জর্ডি আলবার ভলি পোস্টের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। বিরতির আগ মুহূর্তে কর্নার থেকে আসা বলে দারুণ একটি সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। নাভাস বলের ফ্লাইট বুঝতে ভুল করার পর পোস্টের খুব কাছে বল পেয়েও লক্ষ্যে শট নিতে পারেননি ফুটবল মহাতারকা।
দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে শুরুতে তোড়জোড় করেছিল রিয়ালই। প্রথমে কারভাহালের ক্রস কর্নারের বিনিময়ে বিপদমুক্ত করেন পিকে। পরে টনি ক্রুসের শট অনেকটা ডানে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দলকে বাঁচান টের স্টেগেন।
এরপর চলে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের পসরা। ৫৩ মিনিটে মার্সেলোর ক্রসে বেনজেমার দুর্দান্ত হেডটি ঠেকিয়ে নায়ক সেই স্টেগেনই। ৫৬ মিনিটে রাকিটিচের বাড়ানো বলে নাভাসকে বোকা বানাতে পারেননি পাকো আলকাসের। ৫৯ মিনিটে কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে জেরার্ড পিকের বুলেট হেড গোললাইনে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফেরান নাভাস।

ম্যাচের ৬৭ মিনিটে আসেনসিওর বাড়ানো নিচু ক্রস বারের ওপর দিয়ে পাঠান রোনালদো। ৬৯ মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার বাড়ানো বলে সুয়ারেজের ভলিতে আবারো দেয়াল হয়ে দাঁড়ান পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত কিছু গোল বাঁচানো নাভাস।
অতিথিদের এগিয়ে যাওয়া গোলটি আসে মধ্যবিরতির পর। ম্যাচের ৭৩ মিনিটে দুর্দান্ত এক কোনাকুনি শটে স্বাগতিক দর্শকদের স্তব্ধ করে দিয়ে বার্সা শিবিরকে উল্লাসে ভাসান রাকিটিচ।
ম্যাচের ৭৭ মিনিটে দশ জনের দল হয়ে পড়ে রিয়াল। মেসিকে ফাউল করে এসময় লালকার্ডে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন রামোস। এরপরও ৮৫ মিনিটে স্বাগতিকরাই সমতায় ফেরে। নায়ক জেমস রদ্রিগেজ। মার্সেলোর ক্রসে বদলি নামা রদ্রিজেগের গোলে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়ার কাছাকাছি পৌঁছেছিল দুই স্প্যানিশ জায়ান্ট।
কিন্তু তখনও ছিলেন মেসি। ছিল ম্যাজিক্যাল মুহূর্ত। জয়সূচক গোলের জন্য ওঁত পেতে ছিলেন। সার্জিও রবের্তো মাঝ মাঠ থেকে বল নিয়ে ভোঁ-দৌড় দেন। পরে বক্সের কাছে যেয়ে খুঁজে পান জর্ডি আলবাকে। আলবা সেটি ঠেলে দেন মেসির দিকে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ফুটবল জাদুকরের বাঁ-পায়ের বাঁকানো শটে দারুণ ফিনিশিংয়েই জয়ের উল্লাসে মাতে বার্সেলোনা।

চলতি লা লিগায় মেসির এটি ৩১তম গোল, আর বার্সেলোনার জার্সিতে সব মিলিয়ে ৫০০তম সাফল্য। দ্বিতীয় গোলটির পর জার্সি খুলে বার্নাব্যুর পিনপতন নীরবতা নামা গ্যালারির দিকে সেটি তুলে ধরেন পাঁচবারের বর্ষসেরা ফুটবল জাদুকর। নিজের নামের পাশে যোগ করে নেন একটি হলুদ কার্ডও।








