মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষা সৈনিক, সাবেক অর্থমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিতকে রোববার সিলেটে সমাহিত করা হবে। ঢাকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ শনিবার রাত পৌনে ১০টায় তার মরদেহবাহী গাড়ি সিলেটের ধোপাদিঘীরপাড়স্থ বাসভবন হাফিজ কমপ্লেক্সে পৌঁছায়। বর্ষীয়ান এ নেতার মৃত্যুতে সিলেট আওয়ামী লীগ দুইদিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
শনিবার দুপুরে নগরীর হাফিজ কমপ্লেক্সে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের জরুরী সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেনের বরাতে বাসস এ তথ্য জানায়।
রোরবার বেলা ২টায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এ এম এ মুহিতের সর্বশেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে রোববার দুপুর ১২টায় তার মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেয়া হবে। জানাজা শেষে মুহিতের ইচ্ছানুযায়ী রায়নগরে ডিপুটি বাড়িতে মরহুমের পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে।
সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যুতে দুইদিনের শোক কর্মসূচিতে কালোব্যাজ ধারণ, সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের অস্থায়ী কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, সিলেটের সকল উপজেলায় ও সিলেট মহানগরের সকল ওয়ার্ডের বিভিন্ন মসজিদ ও মন্দিরে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরের দিন বাদ জোহর হযরত শাহজালাল (রহ:) মাজার মসজিদে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
৮৮ বছর বয়সে শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী সাবেক অর্থমন্ত্রীর চির বিদায়ে শোকগ্রস্ত পুরো জাতি। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী একজন মানুষ ছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত, ছিলেন একজন সফল অর্থমন্ত্রী। দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১২ বছর। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১০ বছর অর্থমন্ত্রী হিসেবে অবসরে যান চৌকষ ও সদা হাসিমুখের এই রাজনীতিবিদ।
বার্ধক্যজনিত কিছু অসুস্থতা ছিলো তার, শুক্রবার সকালে রাজধানীর নিজ বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে রাতে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় মুহিতের।
আবুল মাল আব্দুল মুহিতের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি। অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে বেড়ে ওঠা, কৈশোরকাল সবই কেটেছে পূণ্যভূমি সিলেটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ১ম শ্রেণিতে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর মুহিত আজীবন দায়বদ্ধ থেকেছেন দেশের প্রতি।
১৯৫৬ সালে আবুল মাল আব্দুল মুহিত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে ওয়াশিংটন দূতাবাসে পাকিস্তানের কূটনীতিক হন। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মুহিত।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ফিরে তিনি পরিকল্পনা সচিব হন। এরপর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব এবং এরশাদের শাসনামলে দুই বছর অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে আবুল মাল আব্দুল মুহিত বই লিখেছেন ৪০টি।
চ্যানেল আইয়ের সাথে আব্দুল মুহিতের ছিলো নিবিড় সম্পর্ক। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে প্রতি বছর চ্যানেল আইয়ের কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মাঠের কৃষকের কথা শুনেছেন। চ্যানেল আইয়ের বিশেষ আয়োজন ও অনুষ্ঠানগুলোতে তার উপস্থিতি ছিলো নিয়মিত। আব্দুল মুহিতের ৮৮তম জন্মদিনে চ্যানেল আইতে প্রচার করা হয় কৃষি উন্নয়নে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ নির্মিত তথ্যচিত্র ‘ত্রিকালদর্শী কর্মবীর’।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ভূমিকা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করেছে। নিরন্তর কর্মপ্রচেষ্টার এই মানুষটি আজীবন বেঁচে থাকবেন বাংলার মানুষের হৃদয়ে।








