২০২০ সালের শুরুতেই দিন গণনা শুরু হয়েছিল মুজিববর্ষের। সবখানে ঘড়িতে কাউন্ট ডাউন চলছে। মুজিববর্ষের বই মেলাতে অসংখ্য বই প্রকাশ হয়েছে জাতির পিতার নামে। উৎসবমুখর পরিবেশে জাতির পিতার শত জন্মবার্ষিকী পালিত হবে এটা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু মুজিববর্ষের আতিশয্যে দেশের কিছু মানুষের দল ও প্রশাসনের নামে বাড়াবাড়ি অবস্থা দেখে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হুঁশিয়ারি ও নির্দেশনা দিতে বাধ্য হলেন।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ভাসছে দেশ। সত্যিকারের মুজিব প্রেমীদের চেয়ে সুযোগ সন্ধানীদের অনেক বেশি ভিড় ক্ষমতায় আধিষ্ঠ্য ব্যক্তিদের সন্নিকটে। অর্থ লুটপাট, দুর্নীতি, ক্ষমতা অপব্যবহার, জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বাজারের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিত্যকার ঘটনা বর্তমান বাংলাদেশের। রাজনীতি বিমুখ জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করছে না। এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের ব্যক্তিরাও ভোট দিতে যায় না! বঙ্গবন্ধু মানে শুধু ছবি, ব্যানার, পোস্টার, গান, নাটক, সিনেমা আর বইয়ের মলাটের শিরোনাম নয়।
বর্তমান বাংলাদেশে মুজিববর্ষের এ ক্ষণে আত্মা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসলে, স্মরণ করা উচিত যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের তার কথাগুলোকে। যা তিনি দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে অনুধাবন করেছিলেন দল আর সরকারের ভেতরে উদ্ভব পরিস্থিতিতে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের সাথে সাথে জানতে হবে তিনি দুর্নীতি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কী করে প্রতিবাদ করতে বলেছেন দেশের মানুষকে। আসলে অর্থনৈতিক মুক্তি ততদিন আসবে যত দিন মুষ্টিমেয় ব্যক্তি দেশকে দুর্নীতির আখড়াতে পরিণত করে রাখবে। আর এ সব ব্যক্তিরা লুকিয়ে থাকে নানারূপে নানাবেশে। এদের কোন দল, মত নেই। এরা সব সময় বর্তমান।
১৯৭৪ সালের ২৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তার নাতিদীর্ঘ ভাষণে আওয়ামী লীগের সদস্যদের বলেছিলেন, “…… আজ সত্য কথা বলতে কি আমাদের একটা কথা মনে রাখা দরকার। আওয়ামী লীগ কর্মীরা, কোথায় যেন গোড়ায় একটু গলদ রয়ে গেছে। মানুষ এতো অর্থের জন্য পাগল হয়েছে কেন? শুধু টাকা কামাই করবে কী করে, এই চেষ্টা। একদিন হাসতে হাসতে বললাম যে, বাংলার কৃষক, বাংলার দুঃখী মানুষ এরা কিন্তু অসৎ নয়। ব্ল্যাকমার্কেটিং করে কারা? রাগ করবেন না। আপনারা শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় আছেন, আপনারা রাগ করবেন না। ব্ল্যাকমার্কেটিং কারা করে? যাদের পেটের মধ্যে দুই কলম বিদ্যা হয়েছে তারাই ব্ল্যাকমার্কেটিং করে। স্মাগলিং কারা করে? যারা বেশী লেখা-পড়া করছে তারা বেশী করে। হাইজ্যাকিং কারা করে? যারা বেশী লেখা-পড়া শিখছে তারাই করে। ইন্টারন্যাশনাল স্মাগলিং তারাই করে। বিদেশে টাকা রাখে তারাই। আমরা যারা শিক্ষিত, আমরা যারা বুদ্ধিমান ঔষধের মধ্যে ভেজাল দিয়ে বিষাক্ত করে মানুষকে খাওয়াই তারাই। নিশ্চয়ই গ্রামের লোক এসব পারে না। নিশ্চয় আমার কৃষক ভাইরা পারে না। নিশ্চয় আমার শ্রমিক ভাইরা পারে না। পেটের মধ্যে যাদের বুদ্ধি বেশী আছে তারাই ব্ল্যাক-মার্কেটিয়ার। আর বিদেশী এজেন্ট কারা হয়। নিশ্চয়ই আমার কৃষক নয়, নিশ্চয়ই আমার শ্রমিক নয়। আমরা যারা লেখা-পড়া শিখি, গাড়ীতে চড়ি, বিদেশে যাবার পারি, বিদেশীদের সাথে মিশতে পারি, ভাল স্যুট পরতে পারি তারাই বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে বিদেশের এজেন্ট হই।
মহাবিপদের মধ্যে আছি আমরা। আপনারা যারা বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত, যারা দেশকে নেতৃত্ব দেন তাদের কর্তব্য হবে আত্মসমালোচনা করা। আর আওয়ামী লীগের সহকর্মী ভাইয়েরা, তোমরা ব্ল্যাক-মার্কেটারদের পিছনে লাগো। হোল্ডারদের পিছনে লাগো। ঘুষখোরদের পেছনে লাগো। তোমরা আমার কথায় আগেও লেগেছো, এখনো লাগো। শুধু আইন দিয়ে, শুধু শক্তি দিয়ে দুর্নীতি দমন করা যায় না। এজন্য এমনভাবে জনমত সৃষ্টি করতে হবে, যেমনভাবে ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত জনমত সৃষ্টি করে আমরা আন্দোলন করেছিলাম। যেমনভাবে ২৫শে মার্চ থেকে ন’মাস পর্যন্ত জনমত সৃষ্টি করে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলাম। তেমনি বাংলার মাটিতে জনমত সৃষ্টি করতে হবে–দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও শোষকদের বিরুদ্ধে। আমি বিশ্বাস করি তা’হলে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি উঠে যাবে।”
জাতির পিতার একথাগুলো যেন আজও সত্য। এ দেশে আইন দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। প্রশাসনে হরিলুট হচ্ছে প্রকল্পের নামে। এসব অনৈতিক সুবিধা গ্রাম বাংলার কৃষক, শ্রমিকরা অতীতেও নেয় নাই, আর এখনো নিচ্ছে না। বরং সাধারণ মানুষের কাছে মুজিববর্ষ নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের আয়োজন সরকারের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীকে এখন নির্দেশনা দিতে হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের চেনা বঙ্গবন্ধুকে মুখোশ পরিয়ে অচেনা করছে বলেই আজ বড় প্রয়োজন ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু ভাষণটি। জাতির উদ্দেশে দেয়া তার জীবনের শেষ ভাষণে তিনি জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি। জবাব দিয়েছেন তার সরকারকে বিরুদ্ধে কি করে অপপ্রচার হচ্ছে, দেশে ও বিদেশ কতটা অনুকূল পরিবেশে পরিস্থিতির স্বীকার এবং লড়াই করা জীবনে হতাশা, সীমাবদ্ধতা কতখানি। এ ভাষণে আবারও বঙ্গবন্ধু দেশের দুর্নীতি ঘুষখোরদের হুঁশিয়ার করেছিলেন।
তিনি বলেছেন, “একটা কথা বলি আপনাদের কাছে। সরকারী আইন করে কোনো দিন দুর্নীতিবাজদের দুর করা সম্ভব নয়, জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একটি মাত্র অনুরোধ আছে আপনাদের কাছে।আমি বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে- এক নম্বর কাজ হবে, দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। কেমন করে করতে হবে? আইন চালাব। ক্ষমা করব না। যাকে পাব, ছাড়ব না। একটা কাজ আপনাদের করতে হবে। গণআন্দোলন করতে হবে। আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন আন্দোলন করতে হবে যে, ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিক বয়কট করতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে। গ্রামে গ্রামে মিটিং করে দেখতে হবে, কোথায় আছে, ঐ চোর, ঐ ব্ল্যাক মার্কেটার, ঐ ঘুষখোর। ভয় নাই, আমি আছি। ইনশাল্লাহ, আপনাদের উপর অত্যাচার করতে দেব না। কিন্তু আপনাদের গ্রামে গ্রামে আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন করতে পারে কে? ছাত্র ভাইয়েরা পারে। পারে কে? যুবক ভাইয়েরা পারে। পারে কে? বুদ্ধিজীবীরা পারে। পারে কে? জনগণ পারে। আপনারা সংঘবদ্ধ হন। ঘরে ঘরে আপনাদের দূর্গ গড়তে হবে। সে দূর্গ গড়তে হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করবার জন্য, বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচন করবার জন্য। এই দুর্নীতিবাজদের যদি খতম করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দুঃখ চলে যাবে। এত চোর যে কোথা থেকে পয়দা হয়েছে জানি না। পাকিস্তান সব নিয়ে গেছে, কিন্তু এই চোর রেখে গেছে। এই চোর তারা নিয়ে গেলে বাঁচতাম। কিছু দালাল গেছে, চোর গেলে বেঁচে যেতাম।”
বঙ্গবন্ধুর এ প্রত্যাশা যদি পূরণ হত তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে দুর্নীতির বীভৎসতা দেখত না দেশের মানুষের। মানুষের আত্মসংশোধন হয়নি এখন অবধি। আর এ গ্লানি মোচনের জন্য জাতির পিতার কথাগুলো স্মরণ করা প্রয়োজন।
তিনি একই ভাষণে বলেছিলেন, “শিক্ষিত সমাজের কাছে আমার একটা কথা। আমরা শতকরা কতজন শিক্ষিত লোক? আমরা শতকরা ২০ জন শিক্ষিত লোক। তার মধ্যে সত্যিকার অর্থে আমরা শতকরা ৫ জন শিক্ষিত। শিক্ষিতদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন। আমি এই যে দুর্নীতির কথা বললাম, তা কারা করে? আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? ব্ল্যাক মার্কেটিং করে কারা? বিদেশি এজেন্ট হয় কারা? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? হোর্ড করে কারা? এই আমরা, যারা শতকরা ৫ জন শিক্ষিত। এই আমাদের মধ্যেই রয়েছে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে, আত্মশুদ্ধি করতে হবে। দুর্নীতিবাজ এই শতকরা ৫ জনের মধ্যে, এর বাইরে নয়।”
“আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, শিক্ষিত ভাইয়েরা, আপনাদের লেখাপড়ার যে খরচ জনগণ দিয়েছে, তা শুধু আপনাদের সংসার দেখবার জন্য নয়। আপনাদের ছেলেমেয়েদের দেখবার জন্য নয়। দিয়েছে এই জন্য যে, তাদের জন্য আপনারা কাজ করবেন, তাদের সেবা করবেন। তাদের আপনারা কী দিয়েছেন? কী ফেরত দিয়েছেন, কতটুকু দিচ্ছেন? তাদের টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, তাদের টাকায় ডাক্তার সাহেব, তাদের টাকায় রাজনীতিবিদ সাহেব, তাদের টাকায় মেম্বার সাহেব, তাদের টাকায় সব সাহেব। আপনারা দিচ্ছেন কী? কী ফেরত দিচ্ছেন? আত্মসমালোচনা করুন। বক্তৃতা করে লাভ নাই। রাতের অন্ধকারে খবরের কাগজের কাগজ ব্ল্যাক মার্কেটিং করে সকাল বেলা বড় বড় কথা লেখার দাম নেই। রাতের বেলা ঔষধ ব্ল্যাক মার্কেটিং করে বড় বড় কথা বলার দাম নাই। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মদ খেয়ে অনেস্টি এর কথা বলার দাম নেই। আত্মসমালোচনা করুন, আত্মশুদ্ধি করুন। তাহলেই হবেন মানুষ।”
বাঙালি এখন অবধি মানুষ হতে পারেনি। এ ভাষণের কিছুদিন পরই কিছু অমানুষ হত্যা করেছে জাতির পিতাকে। অসাধু দুর্নীতিবাজরাও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শামিল হয়েছিল সেসময়। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এ ভাষণের আবহ দেশে বিরাজ করছে ক্রমশ। যার সুযোগ নিয়ে মুজিববর্ষের নামে বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকারকে জনগণের বিরাগভাজন করার অপচেষ্টা চলছে।
তবে বঙ্গবন্ধুর এ সত্য কথনগুলোকে মুজিববর্ষে বাস্তব রূপ দিতে পারলে দেশের মানুষের জীবনে আসবে শান্তি। আর একই সাথে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সার্থক প্রতিফলন হবে মুজিববর্ষে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান যেন বঙ্গবন্ধুর সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








