রাজাকারের তালিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। এমনকি সমালোচনার মুখে ওই তালিকা স্থগিত করা হয়েছে। এই তালিকা নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিষয়টা আমাদের নজরে এসেছে। আমাদের দলের সভাপতি শেখ হাসিনাও তা জানেন। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অলরেডি তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং ভুল সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছে। কাজেই এ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমরা যে তালিকা পেয়েছিলাম, সেটি না দেখেই প্রকাশ করেছি। এটিই ছিল আমার ভুল। এর জন্য সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। প্রতিটি উপজেলায় যদি মুক্তিযোদ্ধাদের কমিটি থাকতো তাহলে এই ভুল হতো না৷ তিনি আরও একটি চমৎকার কথা বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাজাকারদের তালিকা নিয়ে যাচাই-বাছাই না করেই প্রকাশ করে বেআক্কেলের মতো কাজ করেছি। এই ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছি। তাই বলে এই তালিকা হবে না, তা নয়। রাজাকারের তালিকা হবেই হবে।
রাজাকারের একটা তালিকা করতে গিয়েও যদি প্রধানমন্ত্রীকে এত নির্দেশনা দিতে হয় তাহলে এই মন্ত্রণালয় সম্পর্কে আর কী বলার থাকে? স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এই ভুলে ভরা রাজাকারের তালিকার দায় কার? মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের?
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বললেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাজাকারদের তালিকা নিয়ে যাচাই বাছাই না করে বেআক্কেলের মতো কাজ করেছেন৷ দেশের মন্ত্রী যদি বেআক্কেলের মত কাজ করেন তাহলে দেশের কী অবস্থা হতে পারে? তিনি বলেছেন, প্রতি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধার কমিটি থাকলে এই ভুল হতো না৷ তিনি কি এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমিটি নেই এগুলো রয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বে তাই এমনটি হলো? যদি তাই হয় জানুয়ারিতে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা কাদের মাধ্যমে করবেন? এই সময়ে কি সব উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধার কমিটি হবে? নাকি এই কথাটাও তিনি বেআক্কেলের মতই বলে ফেললেন? দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমিটি না করে কেবল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তালিকা নিয়ে রাজাকারের তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ তালিকাটি বের করে ফেললেন! আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কি তবে বেআক্কেলের মতোই তালিকাটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে দিয়ে দিলেন?
মুজিব বর্ষের আগে স্বাধীনতার এত বছর পরে এমন একটি বেআক্কেল তালিকায় সারা দেশের মানুষ বিভ্রান্ত ও বিব্রত হল৷ আর এসব বেআক্কেলের কাজের দায় নিতে হয় খোদ প্রধানমন্ত্রীকে৷ কিন্তু মন্ত্রীরা থাকে বহাল তবিয়তে৷ দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনায় কি এসব বিভ্রান্তি ও বিব্রত হওয়া রোধ হবে? রাজাকারের তালিকা নিয়ে তুমুল সমালোচনায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আবার ঘোষণা দিলেন, আগামী জানুয়ারি মাসেই মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে। সে কারণে ওয়েবসাইটে থাকা পুরনো তালিকা স্থগিত করা হয়।এখনতো মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেই সেটি রয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বে৷ রাজাকারের তালিকায় যেমন মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার হয়ে গেল মুক্তিযোদ্ধা কমিটিতে তখন আবার রাজাকার স্থান পাবে না তো? এমনটি হলে কি তা বেআক্কেল প্লাসের মতো হবে না? বেআক্কেল হলে তা সামলে নেবেন প্রধানমন্ত্রী৷ বেআক্কেল প্লাস হলেও কি তাই?
তাড়াহুড়ো করে এরকম বিতর্কিত তালিকা বের করে আত্মঘোষিত বেআক্কেল হওয়া মন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদের জন্য লজ্জার নয় কি? নাকি রাজনীতির অভিধান হতে লজ্জা কথাটি মুছে দেয়া হয়েছে? মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ঠিক না করে রাজাকারের তালিকা কেন প্রকাশ করা হল? সেটি ঠিক না করেই আবার কেন তড়িগড়ি করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা। এখানেও রাজাকারের তালিকা করার ক্ষেত্রে সর্ষেতে ভূতের সক্রিয় ভূমিকা থাকবে না তার নিশ্চয়তা নেই। তাই তড়িঘড়ি নয় ধীরে সুস্থে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা উচিত৷ নতুন বছরের শুরুতে জাতি আরেকটি সমালোচিত কর্ম দেখতে চায় না৷ আমরা এমন কথা শুনতে চাই না যে, উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা যা পাঠিয়েছে তাই প্রকাশ করেছি৷ কারণ সব উপজেলাতেই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের দায়িত্বে এখন উপজেলা নির্বাহী অফিসার৷ এমন অবস্থায় কে মুক্তিযোদ্ধা ও কে অমুক্তিযোদ্ধা তা নির্ধারণ কি যথার্থ হতে পারে?
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জোর দিয়ে বললেন, রাজাকারের তালিকা হবেই হবে৷ কিন্তু কিভাবে ও কখন হবে তা কি বলবেন? মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দেশব্যাপী কমিটি গঠন ও কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনের আগে রাজাকারের তালিকা করা হবে আরও একটি ভুল৷ সর্বাগ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন দিতে হবে৷ কোন অবস্থাতেই পুনরায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসকদের দিয়ে আমলাতান্ত্রিক তালিকা প্রণয়ন করা ঠিক কাজ হবে না৷ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সুশীল সমাজ সকলের সমন্বিত প্রস্তাবনাতেই এই তালিকা প্রণয়ন করা উচিত৷ প্রকাশের আগেই ভাবতে হবে সেটা যেনো আর বিতর্কিত না হয়৷ ভাবনার সাথে সুষ্ঠু তালিকা প্রণয়নের পরিকল্পনাও সাজাতে হবে৷ আর সে উদ্যোগটা নিতে হবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীকেই৷ একবার বেআক্কেলের মত কাজ করে দ্বিতীয়বার বেআক্কেল প্লাস যেন না হয় সেদিকেই নজর দিতে হবে৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








