দোকানে বসে আছি। মিনি সুপার শপ টাইপের দোকান। ক্যাশের এক পাশে ল্যাপটপ রেখে চোখ রাখছিলাম ফেসবুকের পাতায়। এমন সময় ৭/৮ বছর বয়সী এক বাচ্চাছেলে এলো চকলেট কিনতে। পছন্দের চকলেটের নাম বলার পাশাপাশি আড়চোখে তাকাচ্ছিল ল্যাপটপের দিকে। ফেসবুকের পাতায় তখন জননেত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবিসহ কিছু টেক্সট ছিল। আমি ছেলেটির কাছে জানতে চাইলাম উনাকে চেন? মাথা নেড়ে হ্যা বলল। এরপর যা বললো, তাতে আমি নড়েচড়ে বসলাম। ভালোভাবে পরখ করে দেখলাম ছেলেটিকে। মনে হলো, কোন মাদ্রাসার ছাত্র হবে হয়তো। সে বলছিল, ‘আমিনী হজুরকে শেখ হাসিনা মেরে ফেলেছে (ফজলুল হক আমিনী)।’ তার কথার সূত্র জানতে চাইলে বললো, ‘মাদ্রাসার বড় হুজুর তাদের একথা বলেছে। বড় হুজুর নাকি আরো বলেছে, শেখ হাসিনা খারাপ এবং নাস্তিকদের পক্ষের লোক।’ সময়টা ছিল ২০১৩ সাল। হেফাজত ইসলামের শাপলা চত্বরে তাণ্ডবের সময় এবং ওই সময় আমি ঢাকাতেই ছিলাম।
১৮৬৬ সালের ৩০ মে তদানীন্তন অখণ্ড ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দে হজরত কাসেম নানতুভি (রহঃ) এর নেতৃত্বে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই ছিল প্রথম কওমি মাদ্রাসা। এর ছয়মাস পর দারুল উলুমের আদর্শ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সাহারানপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘মুজাহেরুল উলুম মাদ্রাসা’। তারপর দেওবন্দের কারিকুলামে বিভিন্ন দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়তে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম কওমি মাদ্রাসা দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। মোটা দাগে মোটামুটি এই হলো কওমী মাদ্রাসার গোড়াপত্তনের ইতিহাস। সংক্ষেপে দেওবন্দের ইতিহাস এই কারণে তুলে ধরলাম যে, দেশে ৯০ ভাগ মানুষ জানে না কোন উদ্দেশ্যে কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ভিন্নপন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করাই যে এদের উদ্দেশ্য, তা তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের নামে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের একটি ব্যর্থ চেষ্টা আমরা দেখেছি। ইসলাম ধর্মের নামে আজকের জঙ্গিবাদ চেতনার মূলে এই দেওবন্দের দায় সে কারণে কোনভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নাই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানই হচ্ছে কওমীদের মূল টার্গেট।
১৮৬৬ সাল থেকে তারা লক্ষ্যকে সামনে রেখে পথচলা শুরু করেছিল এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ অবধি তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। ধর্ম হেফাজতের নামে, ইসলাম ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে লাখ লাখ কিশোর তরুণদের ‘ব্রেন-ওয়াশ’ করে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে মাঠে নামাতে সক্ষম হচ্ছে। এর বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কী করছেন? কারো উপর চাপাতির কোপ পড়লেই কিছুদিন চিৎকার চেঁচামেচি করা ছাড়া আর কী দেখেছি গত দুই দশক ধরে! ‘আমি নাস্তিক নই’- এই একটি বিষয় প্রমাণ করার যেন হিড়িক পড়ে যায় তখন। এটাতো যুদ্ধ শুরুর আগেই পরাজয় স্বীকারের নামান্তর মাত্র। কোরআন থেকে উদ্বৃতি দিয়ে আর যা-ই হোক, জঙ্গি মোকাবেলা হয় না। অনেকে কিছুটা বীরত্ব দেখান না, তা নয়! তারা বিকট স্বরে মেরে ফেলবো, কেটে ফেলবো বলে অনেকটা মহল্লা মাথায় তোলার মতো অবস্থা করেন! কেউ কেউ একাত্তরের আলখাল্লা গায়ে জড়িয়ে কপালে বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে প্রশ্ন করেন, মাদ্রাসায় জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয় না কেন, ইত্যাদি। আর গভীর রাতের টক শোর কথা বলে আর কী হবে! এই হলো প্রসারিত অর্থে বাংলাদেশে সেক্যুলার অনুশীলন!
অনেকদিন আগে একটি লেখায় বলেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মান্ধ দেওবন্দ চেতনাকে মোকাবেলা করা যাবে না। লোহা দিয়ে যেমন লোহা কাটতে হয়, ঠিক তেমনই ধর্ম দিয়েই ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী জঙ্গিবাদী চেতনার মোকাবেলা করতে হবে! কেউ নাস্তিক বললে তাকে পবিত্র কুরআনের সুরা নিসারের ৯৪ নং আয়াত শুনিয়ে দিতে হবে। যেখানে স্পষ্ট বলা আছে, কাউকে নাস্তিক, কাফের বা অমুসলিম বলে গালমন্দ করা যাবে না। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের মতো হাদিসগ্রন্থেও এব্যাপারে একাধিক হাদিস রয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মামলায় কোর্টে সাক্ষী দিতে গেলে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরকে এক যুদ্ধাপরাধী নাস্তিক বললে তিনি তা প্রমাণ করার জন্য পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ছিলেন। আবার ৭১ টিভির এক টক শোতে কাউকে নিজ গ্রামের মসজিদ কমিটিতে রয়েছেন জানিয়ে নিজেকে নাস্তিক ফতোয়া থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতেও দেখেছি। এ ব্যর্থ চেষ্টা করে তারা কি আস্তিকদের কাতারে সামিল হতে পেরেছেন? ‘আমি নাস্তিক নই’- প্রমাণের এই ব্যর্থ চেষ্টা না করে তারা যদি পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত বিভিন্ন বাণী শুনিয়ে দিতেন, তাহলে অনেক বেশি কার্যকর হতো বলে আমি বিশ্বাস করি।
শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কেন এবং কিভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে সে বিষয়ে বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যায় ব্রেনওয়াশ হওয়া কোমলমতি কিশোরদের জানানো এবং কিভাবে আমরা একটি দেশ, পতাকা আর জাতীয় সঙ্গীত পেলাম তা জানালে ওই শিশুকিশোর কোমলমতিদের মনে নিশ্চয়ই দাগ কাটতো। হয়তো তারা উত্তরবিহীন হলেও কিছু প্রশ্ন মনে গেঁথে নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগ পেতো।
মাদ্রাসায় জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয় কি-না, এই প্রশ্ন করার পাশাপাশি সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শোনালে অনেক বেশি কার্যকর হতো। ঢাকার ছোট ছোট হলগুলোতে সভা-সেমিনার করে হয়তো বিভিন্ন মিডিয়ার কাভারেজ পাওয়া যায়, কিন্তু সেই বাণী মাদ্রাসার কোমলমতি শিশুদের কাছে পৌঁছায় না। এটা বোঝার জন্য বোধ করি বিশাল বুদ্ধিজীবী হওয়ার প্রয়োজন নেই। জঙ্গিবাদী চেতনাকে প্রতিহত করতে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় সভা-সেমিনারের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন জরুরি।
শুরুতে ছোট বাচ্চাটার কথা উল্লেখ করে যে ঘটনার উল্লেখ করেছিলাম, তা জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে বন্ধ করা যাবে না। জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রত্যেকটি সংগঠনকে পাড়ায় মহল্লায় গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোতে যেতে হবে এবং ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের গল্প ও ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। শিশুতোষ ভাষায় ধর্মনিরেপক্ষতার ব্যাখ্যা তুলে ধরতে হবে। শুধু তাহলেই সম্ভব জঙ্গিবাদমুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো কি সেটা পেরেছে? সেটা সম্ভব হলে আজ জাফর ইকবাল স্যারদের ওপর হামলা হতো না। সুতরাং এ বিষয়ে তাদের কি দায় এড়ানোর সুযোগ আছে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








