ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত ঘোষণার পর দাফনের আগে নড়ে ওঠা নবজাতক মীম ভূমিষ্ট হওয়ার আগে তার মা শারমিন আক্তার চিকিৎসকদের বলেছিলেন, পেটে বাচ্চা নড়াচড়া করছে না।
তবে চিকিৎসকদের প্রি-পারসেপশন (পূর্ব ধারণা) ছিল বাচ্চাটি মায়ের পেটেই মারা গেছে।
সঠিক প্রস্ততি (ওয়েল অরগাইজড) থাকলে মীমকে বাঁচানো যেত কিনা তাতে আশংকা থেকে যায়; তবে ফলাফল ভালো হতো না বলে জানিয়েছে ঢাকা শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কারণ মীম ছিল অপরিপক্ক, তার ওজন ছিল মাত্র ৯০০ গ্রাম। বাচ্চাটি মিনিটে মাত্র তিন থেকে চারবার শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিল।
‘জন্মের পর বাচ্চাটি কাঁদেনি, জন্মের তিন মিনিটের মধ্যে বাচ্চা না কাঁদলে আমরা অবস্থা সংকটাপন্ন হিসেবে ধরে নেই।’
মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা শিশু হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ।
তিনি বলেন, ‘শিশু হাসপাতালে ভর্তির পর আমরা খুব সংকটাপন্ন অবস্থায় মীমকে পাই। তার শ্বাস-প্রশ্বাস খুবই কম ছিল, মিনিটে মাত্র তিন চার বার শ্বাস নিচ্ছিল।
আমাদের এখানে ভর্তির পর আমরা আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশনের মধ্যে মীমকে রাখি। সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে মীমের অবস্থা খানিকটা উন্নত হয়। তবে একটু পর থেকেই অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। রাত একটার দিকে তার অবস্থা খুবই খারাপ পর্যায়ে চলে যায়। পরে রাত ১টা ৩৩ মিনিটে মীম মারা যায়।’
আব্দুল আজিজ বলেন, ‘মীমকে বাঁচাতে আমাদের ডাক্তাররা প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও বাচ্চাটির ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। আমরা চেয়েছিলাম মীমকে সুস্থ করে তার বাবা মায়ের হাতে তুলে দেবো। কিন্তু হিউম্যান রিলেটেড সকল প্রক্রিয়া আমরা গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু সবকিছু সবসময় আমাদের হাতে থাকে না।’

শিশুটির মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে ডা. আজিজ বলেন, ‘ডাক্তারদের মধ্যে পূর্ব ধারণা ছিল মায়ের পেটেই বাচ্চাটি মারা গেছে, মায়ের পেটেও বাচ্চাটি নড়াচড়া করেনি, আজিমপুরে গোসলের সময় নড়ে ওঠলে তাকে মাতৃসদনে ইনকিউবিটরে রাখার পর আমাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
চিকিৎসকদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গাফিলতি, ভুল এবং ধারণা বিষয়গুলো ভিন্ন। শিশুটির মা গত ১৯ তারিখ ধামরাইয়ের একটি ক্লিনিকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। তারপর গত ২১ তারিখ রাতে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। শিশুটির মা ধারণা করছিলেন, তার বাচ্চা পেটে মারা গেছে। শিশুটি অপরিপক্ক হওয়ায় পেটের ভেতরে তার শ্বাস-প্রশ্বাসও ধরা পড়ছিল না।
ডা. আজিজ বলেন, ২৩ তারিখ সকালে ডেলিভারি হওয়ার পর শিশুটির ওজন এবং হার্টবিট এত কম ছিল, যা বুঝতে কষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক। পরে গোরস্থানে গোসলের সময় পানি পেয়ে শিশুটি নড়ে ওঠে।
‘ওখানকার ডাক্তারদের যেহেতু শিশুটি জীবিত বলে ধারণা হয়নি, তাই পরবর্তী চিন্তাও হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত একটা গ্যাপ হয়ে গেছে। পূর্ব ধারণা ঠিক হলে ডেলিভারিটা ওয়েল ওরগানাইজড হতো। জন্মের পর শিশুটির যে অবস্থা ছিল, তাতে ফলাফল হয়তো ভালো হতো না।’
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঢাকা মেডিকেল একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তারা যদি আমাদের কাছে তথ্য চায়, আমরা যে কোন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করব।’
এরপর নবজাতকটির মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শিশুটিকে ধামরাইয়ের গ্রামের বাড়ি শ্রীরামপুর নিয়ে দাফন করার কথা জানিয়েছে পরিবার।
ঢামেক থেকে মৃত ঘোষণা করা ওই নবজাতককে সোমবার সকাল ১০টার দিকে কবর দেয়ার জন্য আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দাফনের আগে গোসল করানোর উদ্দেশ্যে মৃতদেহ কবরস্থানের গোসলঘরে নিয়ে গায়ে পানি দেয়ার সময় হঠাৎ শিশুটি নড়েচড়ে ওঠে। পরে আবার পানি দিলে সে চিৎকার করে কান্না শুরু করে।
আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার হাফিজুল ইসলাম ঘটনাটি নিশ্চিত করেন।
মৃত ঘোষিত মেয়ে শিশুটি জীবিত উপলব্ধি করে তাকে নিয়ে স্বজনরা দ্রুত কবরস্থান থেকে হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা দেন। প্রাথমিক অবস্থায় শিশুটিকে আজিমপুর মাতৃসদন কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হয়। সেখান থেকে পরে ঢাকা শিশু হাসপাতালে নেয়া হয় মীমকে। বাচ্চাটি সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিল।








