সাকিব-তামিমের মত ঢাকঢোল পিটিয়ে তার আবির্ভাব হয়নি। পরিশ্রম আর ক্রিকেটীয় মেধা দিয়ে পরে নিজের জাতটা চিনিয়েছেন ঠিকই। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে গত বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে তারকাখ্যাতিও পেয়েছেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশ দলে ভরসার অন্য নাম মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সেই সিনিয়র ক্রিকেটারটিকে নিয়ে সোমবার এক পসলা নাটক হয়ে গেলো টাইগারদের ক্রীড়াঙ্গনে।
সোমবার পি. সারা থেকে টিম ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজনের মাধ্যমে মিডিয়াতে চলে আসে রিয়াদকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি। সন্ধ্যায় বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আবার সেটিকে ব্যালান্স করে বিষয়টি তার জানা নেই বলে সংবাদ সম্মেলন করেন। এরপর রাতে শ্রীলঙ্কা সফরের ওয়ানডে সিরিজের জন্য ঘোষিত দলেও জায়গা মেলে মাহমুদউল্লাহর। কিন্তু দিনভর তাকে নিয়ে হওয়া এই নাটকে বিস্মিত হয়ে পড়ে ক্রীড়াঙ্গন। মাহমুদউল্লাহকেও তো বড় একটা ধাক্কা দিয়েছেই। প্রবাসী ক্রীড়া বিশ্লেষক ফরহাদ টিটো তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে সেটিই তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ কি তবে ভুল বাগানের ফুল?
ফরহাদ টিটো ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে এই বিশ্রী নাটকটা না করলে পারতো টিম ম্যানেজমেন্ট? তাকে নিয়ে যখন যা খুশি বলে ফেলছেন তারা। মিডিয়ার কানের সামনে। কলম্বোয় বসে টিম কর্তারা একবার বলে দিলেন শুধু টেস্ট না, ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি সব ফরম্যাট থেকেই বাদ দিয়ে দেয়া হবে রিয়াদকে।
একবার তারা মিডিয়াতে ঘোষণাই দিয়ে দিলেন দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে তাকে, দ্বিতীয় টেস্টের আগেই। মিডিয়া-সোশাল মিডিয়ার সর্বত্র চাউর হয়ে গেল এই অসুস্থ খবর। চব্বিশ ঘণ্টা না যেতেই উল্টে গেল সংবাদটা। দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না রিয়াদকে!
চণ্ডিকা-সুজনদের এইসব আপত্তিকর আচরণে দেশে বসেও নিশ্চয় পরোক্ষ সংগত দিয়েছেন বিসিবির শীর্ষ কেউ। মাহমুদউল্লাহকে সব ফরম্যাট থেকে অকস্মাৎ সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা অন্যায়ও মনে করলেন কেউ কেউ, যাদের মধ্যে নির্বাচকরাও আছেন শুনেছি। তাদের কারণেই হয়তো চূড়ান্ত অপমানের হাত থেকে এই যাত্রা রক্ষা পেয়ে গেলেন রিয়াদ।
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ দলের সিনিয়র ক্রিকেটার। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ভদ্র ক্রিকেটার হিসেবেই সবাই জানে তাকে। ম্যানেজমেন্টের কেউ যদি দাবি করে বসেন সাব্বির-আল আমিনদের মতো ইয়ংস্টারদের মতো কিছু করে ফেলেছিলেন রিয়াদ, মারাত্মকভাবে ভেঙে ফেলেছেন কোড অফ কন্ডাক্ট অথবা সাকিবের মতো বিশাল ‘বেয়াদবি’ করে ফেলেছেন বসদের সঙ্গে… কেউ কি তা বিশ্বাস করবে?
করবে না, আমি নিশ্চিত।
কলম্বো টেস্টে সেরা একাদশে থাকছেন না রিয়াদ এটা প্রায় সবাই বুঝে গিয়েছিলেন গল টেস্টের পর। এ নিয়ে কোথাও কেউ দ্বিমত বা প্রতিবাদ করেছেন বলে শুনিনি। রিয়াদকে বসিয়ে দেওয়ার কাজটা সুন্দরভাবে, সম্মানজনকভাবেই সেরে ফেলা যেতো। কেউ কিছু বলতোও না। রিয়াদও তা মেনে নিতে পারতেন সহজে।
কিন্তু তিনি যে বাগানের ফুল সেই বাগানের মালিরা যে নিষ্ঠুর। ফুলের গন্ধ কমে গেলে সেই ফুল ছিঁড়ে ফেলে দিতে এতটুকু সময় লাগে না তাদের!

পৃথিবীতে কোনো কিছুতেই কেউ অপরিহার্য না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে রিয়াদও না। খারাপ ফর্মের কারণে আজ তাকে বাদ পড়তে হচ্ছে টেস্ট দল থেকে, ক’দিন পর হয়তো টি-টুয়েন্টি আর ওডিআইকেও বিদায় জানাতে হবে। তবে এমন অসুস্থ প্রক্রিয়ায়?
ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অভিভাবক, পালক-প্রতিপালক হতে পারেন টিমের কোচ-ম্যানেজাররা অথবা বিসিবি কিংবা বিসিবি-প্রধান। কিন্তু ব্যক্তি রিয়াদ বা মানুষ রিয়াদের অভিভাবক তো তারা কেউ নন। একজন সম্মানিত মানুষকে জাতির সামনে নাটক করে এভাবে অপমান করার অধিকার কারোরই নেই। নেই হাথুরু, সুজন, পাপন- কোনো মিস্টারেরই।
ক্রিকেটে বদলে যাওয়ার যে ছবিটা আজকে আপনারা দেখছেন, হঠাৎ শক্তিশালী আর সমীহ জাগানো যে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে আজ আপনারা গর্ব বোধ করছেন তার জন্ম কিন্তু ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে। সেখান থেকে মাহমুদউল্লাহর নাম মুছবেন কী করে!
এতগুলো বিশ্বকাপ খেলে ফেললো বাংলাদেশ অথচ যে কাজটা করতে পারলেন না অতীতে আমাদের কেউ, রিয়াদ তা একাই করে দেখিয়ে দিলেন দুই-দু‘বার। যারা ভাবছেন বিশ্বকাপের সেই দুই সেঞ্চুরি ভাঙিয়ে দলের মধ্যে টিকে আছেন মাহমুদউল্লাহ তারা হয়তো ক্ষুদ্র অর্থে ঠিক, তবে যে কীর্তিগাঁথা রচনা হয়ে গেছে তার ব্যাট দিয়ে.. বড় অর্থে তা অমরত্ব পেয়ে যাবে আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে। যতদিন, যতযুগ ক্রিকেট বাঁচবে, আমাদের ততদিন মাহমুদউল্লাহর নাম মনে রাখতেই হবে। না রাখতে চাইলেও রেকর্ড এসে দাঁড়িয়ে যাবে আপনার সামনে। মনে করিয়ে দেবে বিলক্ষণ।’








