মার্কিন নির্বাচনের দিন অনেকে যোগাযোগ করে জানান, তারা হতাশ হয়েছেন ভুল ভবিষ্যদ্বাণী পেয়ে। এত মানুষকে হতাশ করার জন্যে একান্ত দুঃখিত। নিচে কিছু বিষয়ে আলোকপাত করছি যা পড়লে বুঝতে পারা যাবে সারা দুনিয়ার বড় বড় স্ট্যাটিস্টিশিয়ান ও অ্যানালিস্টরা এই ভবিষ্যদ্বাণী ভুল করলেন কীভাবে।
১। শুরুতেই ট্রাম্পের জয়টা একটু সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলি। ধরুন, আপনি এবং আমি কয়েন টস করছি। আপনি পাঁচবার কয়েন টস করবেন, আমিও পাঁচবার টস করবো। যদি আপনি ৫ বারের মধ্যে ৪ বার হেড পান, তাহলে আপনি জিতবেন। আর আমি যদি ৫ বারের মধ্যে মাত্র ১ বার হেড পাই তাহলেই আমি জিতব। বুধবার রাতে ট্রাম্প ঠিক এভাবে পরপর ৪ বার হেড জিতেছেন (চারটা ব্যাটলগ্রাউন্ড অঙ্গরাজ্য জেতা)। ব্যাটেল গ্রাউন্ডে জিতার সম্ভাবনা ৫০-৫০, একবারে কয়েন টসের মতোই। এখন পর্যন্ত হিলারি মোট ভোটের সঙ্খ্যায় জিতে আছে, শুধু একটা বা দুটা ব্যাটল গ্রাউন্ড স্টেট জিতলেই সে প্রেসিডেন্ট হয়ে যেত।
২। বর্তমান বিশ্বের সব চাইতে সফল রাজনীতিক ফলাফলের ভবিষ্যদ্বাণী করেন নেইট সিলভার নামের একজন। নেইট সিলভার নির্বাচনের আগের দিন ৭১ শতাংশ সম্ভাবনা দিয়েছিল হিলারি জেতার, অনেকটা ওপরে দেয়া কয়েন টসের উদাহরণের মতোই। নিউইয়র্ক টাইমস দিয়েছিল ৮৮%, হাফিংটন পোস্ট ৯৮%।
যদি এদেরকে পছন্দ না হয়, তাহলে আপনি যেতে পারেন টাকা দিয়ে যারা ভবিষ্যদ্বাণীর জুয়া খেলে তাদের দিকে। বেটিং মার্কেটগুলোর কোনোটাতেই হিলারির জেতার সম্ভাবনা ৮০% এর নিচে ছিল না। নির্বাচনের আগের সমস্ত জরিপে, এমনকি ট্রাম্পের দলীয় সমর্থক ফক্স নিউজের মতামত জরিপেও হিলারি এগিয়ে ছিলেন ৪ শতাংশ। এতগুলো সূত্র ইচ্ছে করে একসঙ্গে মানুষের সাথে প্রতারণা করেনি। বিশেষ করে বেটিং মার্কেট, যেখানে মানুষ জুয়া খেলে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে। ইচ্ছে করে টাকা হারানোর জন্য কোনো জুয়ারি জুয়া খেলে না।
৩। নির্বাচনের আগে পরপর ৯ দিন আমেরিকান শেয়ারবাজার নিচের দিকে নামছিল, কেননা তখন এফবিআইয়ের তদন্তের কারণে ট্রাম্পের সমর্থন বাড়ছিল। গত ৩০ বছরে আমেরিকার পুঁজিবাজার কখনো পরপর ৯ দিন ধরে নামেনি। হ্যাঁ, ৩০ বছর! নির্বাচনের ২ দিন আগে এফবিআই হিলারিকে দায়মুক্ত করে দেয়ার পর শেয়ারবাজার আচমকা ওপরে উঠতে থাকে।
শেয়ারবাজারের এই বাড়া অব্যাহত থাকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত, কেননা সারা পৃথিবীর সবচাইতে বুদ্ধিমান অনুমানকারীরা ধরে নিয়েছিলেন হিলারিই জিতবেন। ট্রিলিওন ডলারের শেয়ারবাজারে যারা বিশ্লেষণ করেন, তাদের সবাই পেশাদার, আবেগনির্ভর না।
৪। এবার আসি বিশ্লেষক প্রসঙ্গে। এক ধরণের বিশ্লেষক নিজের মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে বিশ্লেষণ করেন। নিজের মনে ধারণ করা বিশ্বাস, নিজের চোখে দেখা ঘটনা, আবেগ, উপলব্ধি ইত্যাদি ব্যবহার করে এগুলোকে বিশ্লেষণের মধ্যে রেখে কাজ করেন। এ ধরনের বিশ্লেষণ অনেক সময়ই সঠিক হয়। যেমনটি হয়েছে ট্রাম্পের বিজয়ের ক্ষেত্রে।
৫। অন্য এক ধরনের বিশ্লেষকও আছেন, যাদের মধ্যে আমি পড়ি। এদের বিশ্লেষণ ১০০ ভাগ উপাত্ত ও পরিসংখ্যান নির্ভর। এর মানে এটা নয় যে এদের নিজস্ব কোনো বিশ্বাস নেই, বা মূল্যবোধ নেই। এগুলো ঠিকই আছে। কিন্তু এদের বিশ্লেষণের কোনো নিজস্ব বিশ্বাস বা আগে থেকে নির্ধারিত উপসংহার নেই। তথ্যের বাইরে গিয়ে, শুধু মাত্র বিশ্বাসের উপর ভর করে এরা কোনো বিশ্লেষণ করে না।
উদাহরণ দিচ্ছি। উপরে ২ নম্বর বুলেটে যাদের কথা বললাম, এরা এ ধরনের ডাটা ভিত্তিক বিশ্লেষক। এ কারণে নিউইয়র্ক টাইমস সকাল ১০টায় বলেছে হিলারি জেতার সম্ভাবনা ৯১%। আবার রাত ৭টায় বলেছে ট্রাম্প জেতার সম্ভাবনা ৬০%, আবার রাত ৯টায় বলেছে ৯০% ট্রাম্প জেতার সম্ভাবনা। আপনি বলতে পারেন, “শালা এমন এনালাইসিস তো আমিও করতে পারি, যখন যা দেখমু দেইখা শুইনা নতুন সম্ভাবনা বসায় দিমু”। কথা সত্য, চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ভবিষ্যদ্বাণীর এই বিষয়টিকে বলে ‘বিলিফ আপডেটিং’, পেশাদার বিশ্লেষক হতে হলে বিলিফ আপডেটিং জরুরি।
উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষকরা উপাত্তের বাইরে যেতে পারেন না বা যেতে চান না, এটা তাদের সীমাবদ্ধতা। এ কারণে এরা রোবটিক, মেশিনের মতো, তাদের কোনো চেতনা নেই, বিশ্বাস নেই, আবেগ নেই, অনেক ক্ষেত্রে রাগ, ক্ষোভ এমনকি লজ্জাও কম থাকে। এরা গর্ব করে বলেন:
“When Facts change, I change my opinion, what do you do sir?”
৬। মিডিয়াতে এবং ফেসবুকে কিছু মানুষ অনেক আগেই জানিয়েছিলেন ট্রাম্প জিতবেন। তাদের সবাইকে অভিনন্দন। এরকম মানুষ আমেরিকায় যত না ছিলেন, তার চাইতে বেশি ছিলেন আমেরিকার বাইরে। এ কারণে তাদের জন্যে বেশি করে শুভেচ্ছা।
যারা আগে থেকে বলেছিলেন ট্রাম্প জিতবে, তাদের কেউ হয়তো তাদের অসাধারণ সিক্সথ সেন্স কিংবা কমন সেন্স ব্যবহার করেছিলেন, কেউ হয়তো হিলারির নানা ধরণের ইতিহাসের বিরুদ্ধে মানুষের মনোভাব কী হতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করে ধরতে পেরেছিলেন যে ট্রাম্পই জিতবেন। এদের কেউ কেউ নিছক কন্সপিরেসি থিউরি, কিংবা আল্লাহর বিচার আছে এমন বিশ্বাস থেকেও ট্রাম্পকে বিজয়ী ভেবেছিলেন।
তবে এটুকু জেনে রাখা ভালো, যারা ট্রাম্পের বিজয় আগে থেকে ধরতে পেরেছিলেন, তাদের কেউ কোনো হার্ড ডাটা বা এনালিটিক্স দেখাতে পারবেন না। কেননা, ট্রাম্পের বিজয়ী হবার মতো কোনো হার্ড ডাটা স্বয়ং রিপাবলিকান দল কিংবা প্রার্থী ট্রাম্পের কাছেও ছিল না। ওপরের ২ নম্বর বুলেটে যাদের কথা বললাম তাদের কাছেও ছিল না, এমনকি ফক্স নিউজের কাছেও ছিল না। অনেকের মতামত ছিল, কিন্তু হার্ড ডাটা ছিল না।
হার্ড ডাটাভিত্তিক বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধতা হচ্ছে তথ্য নেই তো বিশ্লেষণ নেই। এ কারণে অনেক মানুষের ট্রাম্প জেতার মতামত শুনেও হার্ড ডাটাভিত্তিক বিশ্লেষকদের কেউ তাদের মতামত পরিবর্তন করেননি।
উপসংহারে বলতে হবে, আমেরিকার এই নির্বাচনের ফল যেসব বিশ্লেষক ডাটা বা তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে, অনুভূতিবিহীন রবোটের মতো বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের জন্যে খুবই লজ্জার। এই দলে আমিও আছি ছোটখাটো মানুষ হিসেবে।
লজ্জা কাটানোর উপায় এখন একটাই এটা জেনে যে এই লজ্জার ভাগীদার আমি একা না। আমার কাতারে আমেরিকার পাঁচজন জীবিত প্রেসিডেন্ট যাদের ২ জন রিপাবলিকান, প্রায় ৯০% রিপাবলিকান দলের সিনেটর ও কংগ্রেসম্যান, ওয়াল স্ট্রিট, দলমত নির্বিশেষে সব কয়টা পত্রিকা, সব কয়টা টিভি নেটওয়ার্কের পরিসংখ্যানবিদেরাও আছেন।
এখন কথা হলো, হার্ড ডাটাভিত্তিক বিশ্লেষণের দিন কি তাহলে শেষ? না, কখনোই না।
যারা পরিসংখ্যান বোঝেন তারা জানেন, হার্ড ডাটাভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে ৯৭% ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ সঠিক, আর ৩% ক্ষেত্রে ভুল হয়। পরিসংখ্যানের ভাষায় একে বলে ‘মার্জিন অফ এরর’।
বুধবারের রাতটা ছিল সেই ৩% এর রাত। এমন রাত বিরল, কিন্ত কখনোই অসম্ভব না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







