চলতি বিশ্বকাপে হটফেভারিট হিসেবেই এসেছে স্পেন। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে কেপভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করলেও পরের ম্যাচগুলোতে ছন্দে লা-রোজারা। এপর্যন্ত একটিও গোল হজম না করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে স্পেন। আর শেষ আটের লড়াইয়ে বড় পরীক্ষার সামনে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। সেমিফাইনালে ওঠার মহারণে মুখোমুখি হবে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি বেলজিয়ামের বিপক্ষে। ২০১০ সালের পর প্রথমবার সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামছে স্পেন, অন্যদিকে বেলজিয়াম তাদের সোনালী প্রজন্মের শেষ অবশিষ্টাংশদের নিয়ে অধরা শিরোপার স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে মরিয়া।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ১টায় সেমিফাইনাল ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে স্পেন ও বেলজিয়াম। স্পেন শেষ ষোলোতে পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। অন্যদিকে শেষ ষোলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারিয়ে শেষ আটে ওঠেছে বেলজিয়াম। কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে বাদ পড়া দলটি চাচ্ছে কেভিন ডি ব্রুইনের নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মত সেমিফাইনালে টিকিট কাটতে।
চলতি বিশ্বকাপে স্প্যানিশদের পথচলা এপর্যন্ত এককথায় নিখুঁত। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করে একটু হোঁচট খেলেও, পরের চার ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে কোন সুযোগ না দিয়ে ক্লিনশিটসহ জয় তুলে নিয়েছে তারা। অন্যদিকে বেলজিয়ামের যাত্রাটা মোটেও মসৃণ ছিল না, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে জয় এসেছে মাত্র দুটি ম্যাচে। তবে মোক্ষম সময়েই নিজেদের চেনা ছন্দটা ফিরে পেতে শুরু করেছে বেলজিয়াম।
আসন্ন মহারণের আগে গত এক দশক ধরে দুদল একে অপরের ছায়াও মাড়ায়নি। আর কোন প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের কথা ধরলে তো পিছিয়ে যেতে হবে আরও পেছনে। ২০১৬ সালে সবশেষ দেখা হয়েছিল স্পেন ও বেলজিয়ামের। সেটি ছিল আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। শেষ দেখায় ২-০ গোলে দুর্দান্ত জয় পায় স্পেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্পেন ও বেলজিয়াম মুখোমুখি হতে চলেছে তৃতীয় বারের মত। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবার দল দুটি মুখোমুখি হয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চার দশকের পুরোনো এক স্মৃতি। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও বেলজিয়াম। অতিরিক্ত সময় শেষে ১-১ সমতায় থাকা ম্যাচ টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে শেষ চারে উঠেছিল বেলজিয়াম। এরপর ১৯৯০ সালের গ্রুপপর্বে বেলজিয়ামকে ২-১ ব্যবধানে হারায় স্পেন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে সেই হার আজও স্প্যানিশ ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। প্রায় চল্লিশ বছর পর আবার বিশ্বকাপের শেষ আটে দেখা।
শক্তিমত্তাতেও বেশ এগিয়ে স্পেন। ফিফার সবশেষ র্যাঙ্কিং হালনাগাদ অনুযায়ী তৃতীয় স্থানে থাকা দলটি ফ্রান্স। স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণভাগ এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। চলতি বিশ্বকাপে তারা এখনও একটি গোলও হজম করেনি। গোলরক্ষক উনাই সিমন টানা ৬০৯ মিনিট ক্লিনশিট রাখার বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। রদ্রি, পেদ্রি ও দানি ওলমোর মাঝমাঠ যেকোন প্রতিপক্ষকে বল পজেশনে কোণঠাসা করতে সক্ষম। ডানপ্রান্তে লামিন ইয়ামালের গতি ও স্কিল প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের জন্য বড় হুমকি। এছাড়া মিকেল ওয়েরজাবাল, দানি ওলমো ও অ্যালেক্স বেনারা তো আছেনই।
অন্যদিকে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের আট নম্বরে থাকা বেলজিয়ামের আক্রমণভাগ বর্তমানে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে। শেষ ৩ ম্যাচে তারা ১২টি গোল করেছে। কেভিন ডি ব্রুইনের নিখুঁত পাসিং এবং ছন্দে থাকা রোমেলু লুকাকু ও চার্লস ডি কেটেলিয়ারের গোল করার ক্ষমতা যেকোন ডিফেন্স ভাঙতে পারে। বিশেষ করে কাউন্টার অ্যাটাকে তারা দারুণ কার্যকরী।
পরিসংখ্যান অবশ্য স্পেনের পক্ষে কথা বলছে। দুই দলের ২২টি মুখোমুখি লড়াইয়ে স্পেনের জয় ১২টি, বেলজিয়াম জিতেছে ৫টিতে। আর ড্র হয়েছে ৫ ম্যাচে। পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান অপটার সুপার কম্পিউটারও এই ম্যাচে স্পেনকে এগিয়ে রাখছে। ম্যাচের আগে অপটার সুপার কম্পিউটার জানিয়েছে, নির্ধারিত ৯০ মিনিটের মধ্যে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ৫৯.৩ শতাংশ। বেলজিয়ামের সম্ভাবনা ১৮.৩ শতাংশ এবং ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ২২.৪ শতাংশ। অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিলে স্পেনের সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা দাঁড়ায় ৬৯.৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যান, শক্তিমত্তা- সবকিছুতে এগিয়ে থাকলেও বেলজিয়ামকে বেশ সমীহ করছেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তার মতে চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে চলেছে স্পেন। বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা যত ম্যাচ খেলেছি, তার মধ্যে এই ম্যাচটাই হবে সবচেয়ে কঠিন। বেলজিয়াম খুবই শক্তিশালী দল। তাদের দলে এমন অনেক ফুটবলার আছে, যারা ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে নিয়মিত শিরোপা জেতার অভিজ্ঞতা নিয়ে খেলছে। আমাদের জন্য এটি বড় একটি চ্যালেঞ্জ হবে।’
অন্যদিকে শিষ্যদের নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী লজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া। তার বিশ্বাস, নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারলে স্পেনকে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। বলেছেন, ‘স্পেন অসাধারণ একটি দল। তারা এখন পর্যন্ত কোন গোল হজম করেনি, যা তাদের শক্তিশালী রক্ষণভাগেরই প্রমাণ। কিন্তু ফুটবলে সবকিছুই সম্ভব। আমরাও বিশ্বাস করি, নিজেদের সেরাটা খেলতে পারলে তাদের হারানো সম্ভব।’
স্পেনের সম্ভাব্য একাদশ
উনাই সিমন (গোলরক্ষক), পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আইমেরিক লাপোর্তে, মার্ক কুকুরেয়া, রদ্রি, পেদ্রি, লামিন ইয়ামাল, দানি ওলমো, অ্যালেক্স বেনা, মিকেল ওয়েরজাবাল।
বেলজিয়ামের সম্ভাব্য একাদশ
থিবো কোর্ত্তয়া (গোলরক্ষক), ম্যাক্সিম ডি কুইপার, নাথান এনগয়, ব্র্যান্ডন মেচেলে, টিমোথি ক্যাসটেন, হ্যান্স ভানাকেন, ইউরি টেলেসমান্স, লিয়েন্দ্রো ট্রসার্ড, কেভিন ডি ব্রুইনে, জেরেমি ডোকু, চার্লস ডি কেটেলেয়ার।







