তার চোখে কি পানি? অভিমানের বরফ গলা নদী নামে কি দুগাল বেয়ে! পাশে রাখা পানির বোতলের ছিপি খুলে এক ঢোক। গলার মাঝে উঠে আসা দলা পাকানো কষ্টটাকে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়ত। ঐতো, এতটা ভীড়ের মাঝেও কেমন গোপনে চোখ মুছে নিলেন। তারপর তিনি বললেন, দশ বছর পর। ভুল করে বোকার মত ভুলে থেকেছি। তবে নিজের উপলব্ধির জন্যও সময়টা হয়ত দরকার ছিল। অনেক ভালোবাসার মানুষ আছে এখানে। এক দুই জনের জন্য কিছু যায় আসেনা।
চারপাশ করতালি মুখর।
লালমাটিয়ার বেঙ্গল বইয়ের বৃহস্পতিবার রাত। ২৮ বৈশাখ। ছোট পরিসরটায় ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরীর মত হাল। অপেক্ষায় সবাই। যন্ত্রীরা সব ঠিক করে নিচ্ছেন। রাত সোয়া আটটা। ঘিয়ে শাদা শাড়ি আর নঁকশী লাল ব্লাউজের আভিজাত্য। হাতে মন্দিরা আর কপালে অনিন্দ্য সুন্দর ভরাট লাল টিপ। তিনি আসেন। ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার/ পরাণ সখা বন্ধু হে আমার’। রবীন্দ্রনাথের গান খোলা গলায়। অন্য সব আওয়াজ থেমে যায় প্রাঙ্গণের। যন্ত্রানুসঙ্গ ছাড়া কণ্ঠের দ্যোতনায় সময়ে সুর বাঁধা হয়ে যায় অলক্ষে। শেষ হতে গান বেজে ওঠে গীটার।
সাহানা বাজপেয়ী। স্পর্শের বাইরে সাহানা অনুভবের স্পর্শে চলে আসেন।
আমি বহুবাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে/ ওরে নিষ্ঠুর সমুখ হতে যাও যে সরে।’ সবাই গেয়ে ওঠে সাহানার সঙ্গে। এদেশের মেয়ের সঙ্গে গলা মেলায় রাজধানী। এ দেশের মেয়ে বলেই জানে সাহানাকে সবাই। ২০০০-০৮ পর্যন্ত এ দেশের পুত্রবধুকে মেয়ের স্থান দিয়েছে বাংলাদেশ। তা এখনও যে আছে অনুভব করেন সাহানা। তিনি বলেন, এই শহর অনেকটাই গড়ে তুলেছিল আমাকে। এই শহরে ফিরতে চাই। বারবার। কি বলব বুঝে উঠতে পারছিনা।

এক সপ্তাহ হয়নি ঢাকা এসেছি। প্রতিদিনই দেখি ঘোর কালো হয়ে যায় আকাশ। থাকে কিছুক্ষণ। গেয়ে ওঠেন তিনি, ‘ঐ যে ঝড়ের মেঘে/ ও মেয়ে বৃষ্টি আসে মুক্ত কেশে/ আঁচলখানি দোলে। সময়ের আঁচল যেন দুলে ওঠে কণ্ঠের উদাত্ততায়। তিনি গেয়ে চলেন। রাতের আলোকিত বেঙ্গল প্রাঙ্গণের দেয়ালে গাছের ছায়া। মানুষের অবয়বের ছায়া। সুরে সুরে দুলছে। কেবল দুলছে।
এ শহরে কত যে তৃষ্ণা রবীন্দ্র সুরের কথার তা বেঙ্গল বইয়ের প্রতি মুহূর্তে ফুঁটে উঠতে থাকে। ‘তোমরা যা বলো তাই বলো/ আমার যায় বয়ে বেলা/ পাগল হাওয়া কি গান গাওয়া/’ তিনি গাওয়া শুর করে ছেড়ে দেন। সুরের সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় সহস্র কণ্ঠ। অনির্বচনীয় মুহূর্ত তৈরি হতে থাকে। সে মুহূর্ত শেষ হয়। গানও শেষ হয়। তিনি বলেন, গানটি শরতের যদিও গাইছে শেষ বৈশাখে। কারণ আমার জীবনের সঙ্গে মেলে গানটি। দেখুন আমার বন্ধুরা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা কেমন কাঁদছে। তিনিও কি ভেতর থেকে কাঁদছেন না!
এরপর একে একে ‘সকাতরে ঐ কাঁদিছে মলয়/ শোন শোন পিতা/ যা কিছু পাই হারায়ে চাই/ না মানে স্বান্তনা/ মরীচিকা ধরিতে চাই/ এ মরু প্রান্তরে’ কিংবা ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে/বসন্তেরই মাতাল সমীরণে অথবা ‘ও যে মানেনা মানা/ আঁখি ফিরাইলে বলে/ না না না।’ তিনি গান করেন। সবাই তার সঙ্গে গলা মেলায়। সাহানা চান সবাই একসঙ্গে গান করুক। উপস্থিতিও তাই চায়। একসঙ্গে হবে গান। আলাদা ভাবে এক গানে তিনি মঞ্চে উঠিয়ে নেন আরমিন মুসাকে।
গানের ফাঁকে ফাঁকে অকপট ভঙ্গিমায় স্মৃতির মুক্তো তুলে আনেন সাহানা। ক্রম হিসেবে ৮ নং গাইবেন তিনি। গান গাওয়া থেকে আধা ঘন্টার বিরতি নিয়ে ফিরেছেন কেবল। বলেন, একতার থেকে বেরিয়েছিল গানটি।
বাংলাদেশে আমার প্রথম গান প্রকাশ। সেই যে যাত্রা শুরু এখনও থামেনি। রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পাওয়া। নতুন আওয়াজে নতুন আয়োজনে। শান্তিনিকেতনে পড়ছি। আমার ক্লাসমেট অর্ণব আর আমি একসঙ্গে গান করছি।
পরিচয়ের কত রকমফের ঘটে সময়ের ব্যবধানে। আহা।
‘আমার নিশিথরাতের বাদল ধারা/ এসো হে গোপনে/ যখন সবাই মগন ঘুমের ঘোরে/ নিওগো নিওগো/ আমার ঘুম নিওগো হরণ করে/ একলা ঘরে চুপে চুপে/ এসো কেবল সুরের রূপে। ’ রবীন্দ্রনাথের গান সাহানার কণ্ঠে বেদনার স্মৃতির বাস্তব অনুসঙ্গ হয়ে ধরা দেয়।
সাহানার গানের তালিকায় উঠে আসে লোকসঙ্গীত। শাহ আবদুল করিমের গানের দুই লাইন ব্যবহার করে পুরো গান তৈরী মুরশিদাবাদের এক নারী বাউলের গান গেয়ে ওঠেন ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ গায়িকা ‘আমার হাত বান্ধিবি পা বান্ধিবি/ মন বান্ধিবি কেমনে/ চোখ বান্ধিবি বুক বান্ধিবি/ পরাণ বান্ধিবি কেমনে।’

লোক সঙ্গীতে সহজিয়া টানে আবেশে মোহিত হয় শ্রোতা। তিনি গেয়ে যান সেই শ্রোতার উদ্দেশ্যে যাদের ভালোবাসায় বারবার আপ্লুত হয়ে ওঠেন। বলেন, এরপর আরো বড় পরিসরে গাইব। এবার বেঙ্গলে দশ বছর পর ফিরে প্রথম গাইলাম এ কারণে যে বেঙ্গল থেকে আমার প্রথম অ্যালবাম এসেছিল। আমি সবসময় ভেবেছি আবার ঢাকায় ফিরছে প্রথমে বেঙ্গলে ফিরব। তাই করেছি। তিনি গেয়ে ওঠেন সেই গান যে গান মেয়ে রাহিনীকে ঘুম পাড়ানোর জন্য গাইতেন। সাহানা বলেন, যেখানেই যাই যতদূরে যাই। ওকে মনে করে ওর জন্য গানটি করি। গেয়ে ওঠেন সাহানা ‘তোমায় গান শোনাব/ তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো/ ওগো ঘুম ভাঙ্গানিয়া’।
বিলাতে থাকা রোহিনী যেন মূর্ত হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের বেঙ্গল প্রাঙ্গণে। সাহানা বাজপেয়ী গেয়ে চলেন মৌসুমী ভৌমিকের গান, ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি/ সাগরের ঢেউয়ে চেপে’ কিংবা গেয়ে ওঠেন ‘কুসুমের মধু করিব পান’, ‘তোমার খোলা হওয়ায়’ এবং ‘কোন পুরাতন গানের টানে’।
নিজের লেখা গান দিয়ে শেষের ঘোষণা দেন সাহানা। শান্তিনিকেতনের সাহানা। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাহানা বাজপেয়ী। জীবনের খোলা হাওয়া ভাসা সাহানা। তিনি বলেন, অনেক অল্প বয়সে লেখা গান। গাইতে লজ্জাই করে তবু গাইব এখানে। গাওয়ার আগে আরো বলেন সাহানা নগর বাউল জেমসের উদ্ধৃতি দিয়ে, যদি একই পথে থাকি তবে আবার দেখা হবে। তারপর মন দোলানো সুরে কথায় ‘একটা ছেলে মনের আঙ্গিনাতে/ সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে।’
টানা দুই ঘন্টার মন্ত্রমুগ্ধতা। ১৭টি গান। এর মাঝে দুটি গান করেন তার সঙ্গে গীটার বাজানো কোলকাতার সমর। কীভাবে যে সময় কেটে যায় সাহানার সঙ্গীত সংস্পর্শে বোঝা যায়না।
তিনি আবারো আসবেন, বারবার আসবেন। যেহেতু কেটে গেছে অভিমানের বাহানা। কেবল গাইতে নয় রোহিনী-গ্যারেটকে নিয়েও আসবেন কিন্তু সাহানা!








