পার্বত্য জেলার অল্প শিক্ষিত সহজ-সরল দরিদ্র তরুণীদের বিয়ের ফাঁদে ফেলছে চীনা নাগরিকরা। চীনে নিয়ে তিন থেকে চার মাস সংসার করার পর তাদের সেখানকার বিভিন্ন পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এসব কাজে বাংলাদেশ ও চীনে একাধিক শক্তিশালী চক্র জড়িত রয়েছে।
গত প্রায় ছয় মাস ধরে অভিনব কায়দায় এই নতুন রুটে নারী পাচার হচ্ছে। ম্যারেজ মিডিয়ার আড়ালে চক্রের সদস্যরা এরই মধ্যে বেশকয়েকজন মেয়েকে চীনে পাচার করেছে।
সম্প্রতি সুবর্ণ চাকমা নামের এক পাহাড়ি তরুণীকে পাচার করার সময় উদ্ধার করে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সঙ্গে গ্রেপ্তার হয় এক চীনা নাগরিকসহ ৩ জন। সেই সূত্র ধরে বিয়ে করে চীনে যাওয়া মেয়েদের খোঁজ নেওয়া শুরু করে তারা। তদন্ত উঠে এসেছে, ‘পাচার হয়েছে পাহাড়ি মেয়েরা।’
গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন: চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে বিয়ের পর চীনে নিয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পর তাদেরকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অন্ধকার জগতে বিক্রি করে দিচ্ছে। উন্নত জীবনের আশায় মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে পার্বত্য জেলার মেয়েরা পাচারের শিকার হচ্ছেন।
সুবর্ণ পাচারের বিষয়ে থানায় একটি মামলা করে তার পরিবার। পরে ডিবি অভিযান চালিয়ে উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের একটি বাসা থেকে তাকে উদ্ধার করে। গ্রেপ্তাররা জানায়: তারা এভাবে মারশী চাকমা, ইলা চাকমা ও হেলেনা চাকমাসহ বেশ কয়েকজন নারীকে চীনে পাঠিয়েছে।
অভিনব এই মানবপাচারের কৌশল নিয়ে তদন্ত করছেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মো. আরমান আলী। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: বাংলাদেশ থেকে চীনে যাওয়া পার্বত্য জেলার দুই তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দিনে কয়েক দফা তরুণীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইমো’তে ভিডিও কল করা ছাড়াও তদন্তের কৌশল হিসেবে ডিবির একজন কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে সকালে, দুপুরে, রাতে এবং মধ্যরাতে কথা বলেন।
পরে তদন্ত করে ডিবি জানতে পারে, বাংলাদেশের ম্যারেজ মিডিয়াগুলো এসব মেয়েদের তথ্য সংগ্রহ করে চীনা মিডিয়াগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকে তথ্য নিয়ে চীনা পুরুষরা বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশি ম্যারেজ মিডিয়ার মাধ্যমে ওই সব মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বিয়ে করে। এছাড়া পার্বত্য জেলার মানুষ কম শিক্ষিত, সহজ-সরল এবং নিম্ন আয়ের। চীনা যুবকদের ফাঁদে তারা সহজেই পা দেয়, চেহারা ও ধর্মের মিল থাকায় বিয়েতে তেমন জটিলতা হয় না। কোর্টের মাধ্যমে বিয়ে করে চীনা দূতাবাসে নিয়ে যাওয়া হয় এসব মেয়েকে। পরে দূতাবাসের অনুমতি নিয়েই নববধূ হিসেবে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিন থেকে চার মাস সংসার করে তাদের চীনের পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
এই কাজের সঙ্গে ১০টি ম্যারেজ মিডিয়ার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে ডিবি। সম্প্রতি একটি ম্যারেজ মিডিয়ার মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে ডিবিকে জানায়: চাইনিজদের সঙ্গে এসব মেয়েদের বিয়েতে তারা ৩০ হাজার টাকা করে আয় করে।
কয়েকজন চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে ডিবি জানতে পারে: সেদেশের পতিতালয়ে অধিকাংশ নারী নেপাল এবং মিয়ানমারের। তবে চীনা পুরুষরা একরাতের সঙ্গী হিসেবে চীনা মুখ বেশি পছন্দ করে। বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার মেয়েদের সঙ্গে চীনের মেয়েদের চেহারা মিলে যাওয়ায় তাদের চাহিদা বেশি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র প্রলোভন দেখিয়ে চীনে নারী পাচারের কাজ করছে। দেশের কয়েকটি ম্যারেজ মিডিয়া এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে দু’দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।







