দেশ জুড়ে এখন টানটান উত্তেজনা। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কতটুকু কারচুপি বা জালিয়াতি হলো, বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা নাশকতার পরিকল্পনা করতে গিয়ে ধরা পড়লেন, এখন তার কি হবে, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে কি হবে না-এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাথা ঘামানোর তেমন কোনো আগ্রহ বাঙালির আপাতত নেই। এখন তারা ব্যস্ত বিশ্বকাপ নিয়ে। ইতিমধ্যে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়েছে গতবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। এই দলের সমর্থকরা এতে যারপরনাই আহত হয়েছে। তবে জার্মানভক্ত তুলনামূলক কম হওয়ায় মাতমটাও একটু কম। বাঙালির সব আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। ঠিক যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি! এর বাইরে তেমন কারো প্রভাব নেই। প্রথম ম্যাচে খারাপ করার পর অনেক দোলাদোলের মধ্যে থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাঙালির প্রিয় দুই দল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। আজ থেকেই শুরু হয়ে যাবে এই দুই দলের বিশ্বকাপের পরের রাউন্ডে যাওয়া না-যাওয়ার মিশন।
প্রিয় দল শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে কি না, নাকি জার্মানির পথ ধরবে-এ নিয়ে দেশের ফুটবল অনুরাগীদের এখন দুশ্চিন্তার কোনো শেষ নেই। বাঙালির কাছে তো বিশ্বকাপ মানে আবেগের ঝড়। বিশ্বকাপ খেলা দেশগুলির থেকে খেলার মানে পিছিয়ে থাকলেও, আবেগ এবং ভালোবাসায় যে বাঙালি কোনও অংশে কম নয়। এখানে দলের সমর্থকদের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি এমনকি খুনোখুনি পর্যন্ত হয়। ফিফার সর্বশেষ র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় তলানিতে। তবে খেলার মান নিয়ে করা এই তালিকার পাশাপাশি যদি খেলা সমর্থন নিয়ে একটি তালিকা করা যেত, তাহলে বোধ হয় বাংলাদেশের নাম ওপরের দিকেই থাকতো। চ্যাম্পিয়ন হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকতো না। সেই বিবেচনায় বিশ্বকাপ আসলে আমাদের! যারা বিশ্বকাপ ফুটবলকে ধারণ করে, মনেপ্রাণে ভালোবাসে, এর আবেগে মথিত হয়, এমনকি জীবন পর্যন্ত কেড়ে নেয়, সেই খেলা আমাদের নয় তো কী?
বিশ্বকাপের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তার আগমনীর সুর শোনা গিয়েছিল ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায়, বাড়ির ছাদে, গলির মোড়ে প্রিয় দলের পতাকা টাঙানোর হিড়িক দেখে। দোকানে দোকানে সাজানো নানা দেশের পতাকা, জার্সি থেকে এই বিশ্বকাপের জন্য নির্দিষ্ট বলও। খুদে থেকে প্রৌঢ় সবার মধ্যেইে আগ্রহ তাদের পছন্দের দেশের পতাকা বা জার্সি কেনার। যদিও এই জার্সি বা পতাকার চাহিদা সীমিত থেকেছে ৩২টার মধ্যে ৫-৬টা দেশের মধ্যেই। বাঙালি ফুটবল প্রেমী প্রতি ৪বছর অন্তর তাদের প্রিয় আওয়ামী লীগ বিএনপি ভুলে বিভক্ত হয় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন, নেদারল্যান্ড, ইতালি এবং পর্তুগালে।
যদিও দুঃখের বিষয় এই যে ইতালি এবং নেদারল্যান্ড ২০১৮ বিশ্বকাপের মূল পর্বে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তাই এইবারের বিশ্বকাপে বাঙালির সেরা পাঁচ বাজি হলো ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন এবং পর্তুগাল।
ফুটবল প্রেমিদের চিরকালীন তর্কের বিষয় ‘পেলে বনাম ম্যারাডোনা’, সেরকম বেশ কিছু বছর ধরে আরও এক তর্কের সৃষ্টি হয়েছে ‘মেসি বনাম রোনাল্ড’। কিন্তু এই দুই তর্কের অনেক পার্থক্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হল পেলে এবং ম্যারাডোনা দুজন দুই সময়ের খেলোয়াড়। এদিকে মেসি আর রোনাল্ড দুজনেই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই গত দুই, তিন বারের বিশ্বকাপের মতো এবারও সমর্থকদের মধ্যে এই নিয়ে শুরু হয়ে গেছে যুক্তিতর্কের খেলা। অনেকে আবার নেইমারকে সামনে টেনে আনছেন। তুলনা চলছে মেসি ও রোনাল্ডোর সঙ্গে নেইমারেরও।
বাঙালির যাবতীয় হুজুগ আপাতত বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে। ডিজিটাল যুগে এসে যাবতীয় উত্তেজনা সবাই ঢেলে দিচ্ছে ফেসবুকে কিংবা ব্লগে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। নিজেকে আদি এবং অকৃত্রিম বাঙ্গালি মনে করি। আপাততঃ আমিও ফুটবল নিয়েই আছি। কারণ ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আছে গোটা দেশ। যেখানেই যাই সেখানেই ফুটবল নিয়ে আলাপ কিংবা বিলাপ। বিশ্বকাপের ফুটবলের একটা মজার দিক আছে। সেটা হলো সবাই এই খেলাটা বোঝে। সবাই কোনো কোনো না দলের সমর্থক।
আমাদের দেশের মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে একটু বেশিই মাতামাতি করে। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে অনেক মানুষেরই ধ্যান-জ্ঞানে পরিণত হয় বিশ্বকাপ। বিশেষ করে যুবসমাজ পুরাই মত্ত হয়ে পড়ে। তেমন একটা পুরনো কাহিনী। তখন ব্রাজিল দলে সক্রেটিস নামে এক খেলোয়ার ছিল। বিশ্বকাপ খেলার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌখিক পরীক্ষায় শিক্ষক এক ছাত্রকে বললেন,
-সক্রেটিসের নাম শুনেছ?
-জ্বী স্যার!
-বল তো তিনি কেন বিখ্যাত ছিলেন?
-স্যার সক্রেটিস পেশায় একজন ডাক্তার এবং লিংকম্যান!
-মানে কি?
-মানে হলো সক্রেটিস ব্রাজিল দলে খেলতেন।
-কি খেলতেন?
-সক্রেটিস ব্রাজিল দলে ফুটবল খেলতেন এবং তার পজিশন ছিলো লিংকম্যান, পেশায় একজন ডাক্তার।
-এই উত্তর শুনে তো শিক্ষকের আক্কেল গুড়ুম!
বাংলাদেশ কত সালে স্বাধীন হয়েছে, তাজ উদ্দীন আহমেদ কে ছিলেন-এসব প্রশ্নের উত্তর না জানলেও এখনকার তরুণতরুণীরা প্রিয় দলের খেলোয়ারদের নাম কি, তারা কে কোন ক্লাবে কত টাকার বিনিময়ে খেলেন, কার রেকর্ড কি, এসব প্রশ্নের জবাব গড়গড় করে বলে দিতে পারেন। ঘুমকাতুরে কিশোরটিও এখন রাত জেগে মগ্ন হয়ে খেলা দেখে। ফেসবুকে নিয়মিত স্ট্যাটাস দেয়। কোনো ক্লান্তি নেই। ঘুমও নেই। বিশ্বকাপ যেন এক টনিকের নাম! বিশ্বকাপ এসে কত আলোড়ন যে উৎপাদন করেছে! প্রথমত, সমাজে ঝাঁক-মানসিকতার জয়জয়কার চলছে। যার কোনও কালে ফুটবলের প্রতি ন্যূনতম উৎসাহ ছিল না, তাকেও মুখরক্ষার জন্য অহরহ খোঁজ নিতে হচ্ছে, আর্জেন্টিনা কী করল, ব্রাজিলেরই বা কী দশা। যিনি সিরিয়াল নিয়ে দিব্যি আহ্লাদে আছেন, তিনিও টিভি-মগ্ন সন্তানকে জিজ্ঞেস করছেন, সাদা রঙের জার্সি পরা দেশটার নাম কিরে? কে জিতছে, তোর দল না অন্যরা? তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে থাকবার অধিকার রয়েছে এবং নিজ ইচ্ছে অন্যের উপর চাপিয়ে দেবার অধিকারও কারুর নেই, কিন্তু বাস্তব প্রায়ই তত্ত্বের ধার ধারে না। স্বতন্ত্র থেকে অধিকাংশ মানুষই স্বস্তি লাভ করে না, কোনও না কোনও স্তরে তার স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়। তাই ভান করে হলেও দলে মিশে যেতে পারলে, সকলের সঙ্গে সমান চিৎকার করে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ প্রমাণ করতে পারলে, মানুষ বিশেষ তৃপ্তি পায়। হয়তো তার সাধনা অনন্য নয়, নিছক অন্য হয়ে থাকা। এর পর আসে সমর্থনের প্রধান দল বেছে নেয়ার দায়। কেউ যদি বলে, কে জিতল তা নিয়ে কী আসে যায়, খেলা কেমন হল সেটাই আসল— তবে তাকে নিতান্ত বেরসিক ধরা হয়। আমাদের দেশে আবার ঐতিহ্য রয়েছে, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার প্রবল পক্ষ নেবার। এমন একটি ধারণা আমাদের দেশে প্রচলিত, ল্যাটিন আমেরিকার দলগুলির খেলায় শিল্পের স্পর্শ সমধিক, ইউরোপীয় দলগুলি নান্দনিকতা অপেক্ষা কার্যকারিতার প্রতি মনোযোগী। তাই যে জাতি চিরকাল বিজয়ী হওয়ার পরিবর্তে সৌকর্য ঝলকে হারিয়া যাওয়াকে মহিমান্বিত করেছে, সে ল্যাটিন আমেরিকার দলকেই সমর্থনের জন্য বাছবে, এ আর আশ্চর্য কী?
সীমার মাঝে অসীমের ব্যাপারটিও গুরুত্বপূর্ণ। সকলে জানে, ফুটবল দলগত খেলা, এগারোজন খেলোয়াড় মিলে মাঠে যুদ্ধ করতে হয়, রণকৌশল নির্ণয়ে ভূমিকা থাকে কোচ ও তার সহকারীদেরও। কিন্তু কৃতিত্ব বা দোষারোপের ক্ষেত্রে, চিরকাল বেছে নেয়া হয় একটি মুখকেই। সাধারণত যে কোনও বৃহৎ কাণ্ড ফলবতী বা নিষ্ফলা হয় বহু মানুষের অবদানে ও পারস্পরিক সহায়তার ব্যাকরণে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে কোনও আন্দোলন, কোনও খেলা, কোনও গোষ্ঠীবদ্ধ প্রয়াসের বিশ্লেষণ ধারণায়ত্ত হয় না, যতক্ষণ না একটি বা দুটি ব্যক্তিকে সে গতিবিধির জন্য দায়ী করতে পারছে। যদি আর্জেন্টিনা হারে, তার জন্য একা মেসি দায়ী, যদি বিপ্লব সফল হয় তার জন্য একা লেনিন কৃতিত্বাধিকারী। নিঃসন্দেহে একটি বা দুইটি ম্যাচে এক জন ফুটবলার একাই রং ঘুরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু বিশ্বকাপটিকে যখন মারাডোনা পেলে বা রুমেনিগের বিশ্বকাপ বলে চিহ্নিত করা হয়, তার মূলে থাকে ইচ্ছাকৃত খণ্ডদর্শন। আবার, প্রতিষ্ঠিত মহানায়ককে ছেড়ে যখন কেউ অন্যদের অবদান বিষয়ে সরব হন, তিনিও বেছে নেন এক জন বা দুই জন ‘কাব্যে উপেক্ষিত’কেই। আসলে, সেতু বাঁধবার কৃতিত্ব রামেরই হবে, তাজমহল গড়বার গৌরব শাহজাহানেরই থাকবে, তন্নিষ্ঠ কাঠবিড়ালি বা নকশাকার কারিগর শ্রমিকদের কথা কেউ মনে রাখবে না। এর নেপথ্যে অবশ্য কোনও চক্রান্ত নেই, এই মনোভাবের মূলে আছে নায়কপূজার প্রকাণ্ড ঈপ্সা, আর সিন্ধু দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বিন্দুর মধ্য দিয়ে তাকে বুঝবার প্রয়াস।
তবে বিশ্বকাপের মূল উপযোগিতা হলো, এই কয়েক দিন সকল দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দেওয়া। এই ধরনের যে কোনও হুজুগই মানুষকে বাস্তব ভুলিয়ে রাখে। তার দেশের দুরবস্থা, বন্যার প্রকোপ, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল, সকল কিছুকে ছাপিয়ে বিশ্বকাপের সানন্দ কলরব কিছু দিনের জন্য আকাশ-বাতাস ভরে রাখে। ক্রীড়া ও নানা উৎসবের আরোপিত আনন্দের উদ্দেশ্যই তা: নিজের চোখকে বন্ধ রেখে দৈনন্দিন গ্লানি থেকে মুক্তি। কখনও ক্রিকেট, কখনও ফুটবল, কখনও নিউ ইয়ার, কখনও ভ্যালেন্টান ডে এই রকম নানা হুল্লোড় এসে বিবিধ অন্যায়দীর্ণ এই দেশে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলিকে ক্রমান্বয়ে ঢেকে দিতে থাকবে। আমরাও আনন্দে বগল বাজিয়ে যাব।
তবে আমরা এটাও জানি যে, ফুটবল হলো এক অসাধারণ কূটনীতি কিংবা মানূষকে ভালোবাসার নাম। যা গোটা পৃথিবীকে এক সুতোয় বেঁধে নেয়। এখানে কোনো ভাষা কিংবা শিক্ষা না থাকলেও হয়। কারণ ফুটবলের রয়েছে এক নিজস্ব ভাষা। ফুটবল আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে পরাজিত হয়েও আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






