রাষ্ট্রযন্ত্রের সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সেবার বিপরীতে অনিয়ম আর ভোগান্তির শিকার হয়নি এমন মানুষের সংখ্যা গুনেও শেষ করা যাবে না। ভোগান্তির সেই তালিকায় বিদ্যুৎ বিভাগের অবস্থান সব সময় উপরের দিকেই থাকে।
প্রান্তিক মানুষের মতে, বিদ্যুৎ অফিস এমনি একটি অফিস, যে অফিস ভবনের ইট-বালু-সিমেন্টকেও সমীহ করে চলতে হয়। আর তা না চললেই পদে পদে বিপদ। প্রতিষ্ঠানের ইট-বালু-সিমেন্টই যদি হয় এতো ক্ষমতাধর, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তি কতোবড় ক্ষমতাধর হতে পারে?
তেমনি একজন ক্ষমতাধর সখীপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদত আলী। গত বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে টাঙ্গাইলের সখীপুরের বড় চওনা হাইস্কুল মাঠে চ্যানেল আই’র ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ আয়োজিত ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ অনুষ্ঠানের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
অনুষ্ঠানে তৃণমূল কৃষকরা তাদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগের বেশির ভাগ ছিলো বিদ্যুত নিয়ে। মন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রায় পাঁচ শতাধিক কৃষক নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদত আলীর হয়রানীমূলক কর্মকাণ্ড তার প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম চিত্র জোরালো ভাবে তুলে ধরেন আলোচনায়।
সেই অনুষ্ঠানে বিদ্যুত এবং মিটার সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, এসব সমস্যার শতভাগ সমাধান করতে না পারলেও অন্তত ৭০ ভাগ সমাধান করা সম্ভব।
কিন্তু মন্ত্রীর ষোষণার পরে ৭ ভাগ সমস্যারও সমাধান হয়নি। উল্টো বহাল তবিয়তে আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদত আলী।
অথচ ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে যারা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে ছিলেন সেইসব গ্রাহকগণ পড়েছেন দ্বিগুন ভোগান্তিতে। এই শাহাদত আলী ও তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের হাতে বন্দি টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার হাজারো বিদ্যুৎ গ্রাহক। সবচেয়ে বড় থাবাটি পড়েছে সখীপুর উপজেলার কুতুবপুরের আবেদ নগর গ্রামের কৃষক আন্তাজ আলীর ওপর। যিনি ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে তীব্রভাবে তুলে ধরেছিলেন বিদ্যুৎ অফিসের অনিয়মের চিত্র।
গত ৩ বছর বিদ্যুৎ ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই দরিদ্র কৃষক আন্তাজ আলীর বসত ভিটায় তবুও তার নামে বকেয়া বিল পাঠানো হয়েছে ১০ লাখ ১০ হাজার ৬শ ৯০ টাকার।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের ওই কাগজ হাতে পান তিনি। গত এক সপ্তাহ ধরে বিলের কাগজ হাতে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। বিলের কাগজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি। ২৩ ফেব্রুয়ারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদ্যুৎ বিভাগ তার বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ভূক্তভোগী কৃষক।
আন্তাজ আলী চ্যানেলআই অনলাইনকে বলেন, আমি ২০০২ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একটি আবাসিক সংযোগ নেই। যার হিসাব নং ৫২৪৬ ও গ্রাহক নং ৭৪৭১৭৫৩৯। ২০১২ সাল পর্যন্ত নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে আসলেও ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ৪৪ হাজার টাকার একটি বিদ্যুৎ বিল দেয়। বিষয়টি নিয়েে আমি সখীপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে বিলটির সংশোধনের আশ্বাস দেয়।
এ নিয়ে পুনরায় অভিযোগ করলে ঘূর্ণন পরীক্ষার জন্য ওই গ্রাহকের মিটার খুলে আনা হয়। এরপর থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকলেও কিছুদিন পর তাকে আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার আরেকটি বিল পাঠানো হয় বলেও জানান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সখীপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই গ্রাহকের মিটারটি এনালগ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমাসে ২০০ ইউনিটের গড়বিল করা হয়।
এরপর মিটার রিডিং ১৫২১৫ ইউনিট দেখিয়ে বকেয়া সমন্বয় করতে শুধুমাত্র ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ৫৫৪০ ইউনিটের বিল করা হয়। যা গড়বিল ২০০ ইউনিট থেকে ৫৩৪০ ইউনিট বেশি।
এমতাবস্থায় দীর্ঘদিন কোনো বিলের কাগজ না দেয়া হলেও গত বৃহস্পতিবার তাকে ১০ লাখ ১০ হাজার ৬ শ’ ৯০ টাকার একটি বকেয়া বিল পাঠানো হয়েছে। যা চলতি মাসের ২৩ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করতে বলা হয়।
আন্তাজ আলী বলেন, ‘তিন বছর আগে নতুন মিটার দেয়ার কথা বলে আমার মিটারটি খুলে নেয়। পরে আমাকে আর মিটার দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমার নামে ১০ লাখ টাকার বিলের নোটিশ আসে।
বিষয়টি সমাধানের জন্য সখীপুরের বিদ্যুৎ অফিসে গেলে নিবার্হী প্রকৌশলী শাহাদত আলী বাজে ব্যবহার করে লাইনম্যানের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
লাইনম্যান ‘বাদল’ এর সাথে কথা বললে সে ১ লাখ টাকা ঘুষ চায়। ৪০ হাজার টাকা দিতে রাজী হলেও এক লাখ টাকার কমে কাজটি করে না। তবে, ঘুষ না দেওয়ায় ১০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করতে না পারায় মামলার ভয়ে বাড়ী ছাড়া আছেন বলে জানান আন্তাজ আলী।
সখীপুরের বড় চওনা এলাকার আর একজন বিদ্যুৎ গ্রাহক আজহার আলী চ্যানেলআই অনলাইনকে বলেন, অনিয়মের কথা বলে শেষ করা যাবে না। অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই মামলা হয়। অনিয়মের প্রতিবাদ আর ভুতুরে বিলের কারণে সখীপুরের প্রায় সাড়ে ৪শ মানুষ মামলার শিকার হয়েছে।
সখীপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদত আলী চ্যানেলআই অনলাইনকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। বাদল নামে আমাদের কোন লাইনম্যান নেই। আন্তাজ আলীর সমস্যাটি আমার আগের সময়ের। এটি কম্পিউটার সেকশনের ভুল। আমরা একটি কমিটি করে তার বিষয়টি সমাধান করে দিবো।







