৩০ আগস্ট, ২০১৪ শনিবার, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে যখন ল্যান্ড করলাম, তখন মনের ভেতর যে ধরনের আনন্দ উত্তেজনা থাকার কথা সেটি একেবারেই ছিলো না। বরং এক ধরনের বিষণ্ণতা নিয়ে জেএফকে এয়ারপোর্ট পা ফেলে এগিয়ে যেতে যেতে ইমিগ্রেশন ভিসার কাউন্টার খুঁজছিলাম।
যেহেতু প্রথমবার এবং তাও আবার ইমিগ্রেশন ভিসা; এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে যে একটু দেরী হবে তা জানা ছিলো। কিন্তু প্রথমে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না কোন কাউন্টারে যেতে হবে। ইতস্তত ঘোরাফেরার একপর্যায়ে একজন জিজ্ঞাসা করলেন ‘ইয়েলা প্যাকেজ’?
প্রথমে প্রশ্নটা না বুঝলেও পরে বুঝতে পারলাম আমার হাতে মুখবন্ধ হলুদ খামে ভরা ইমিগ্রেশনের দরকারী কাগজপত্রের কথাই বলা হচ্ছে। অবশেষে একটা রুমে বসানো হলো আমাদের। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ডাক পড়লো, আঙ্গুলের ছাপ ও ছবি নেয়া হলো। তারপর ব্যাগেজ সংগ্রহের পালা।
নির্ধারিত বেল্টে যেয়ে দেখলাম, ততক্ষণে সবযাত্রীরা চলে গেছে। তাই অন্যদের সামান্য মালপত্রের সাথে পড়ে আছে আমাদের ৯টি কার্টন এবং সুটকেসগুলো মোটামুটি এক জায়গাতেই রাখা আছে। লাগেজ নিয়ে ঢাকা এয়ারপোর্টের মতো কোনো ঝামেলা হলো না বলে স্বস্তি পেলাম। তা ছাড়া ইমিগ্রেশন অতিক্রম করার পর কিছুটা হালকাও লাগছিলো নিজেকে।
মালপত্রের দিকে আমাদের এগিয়ে আসতে দেখেই সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলো এক কালো তরুণ। একহারা গড়ন, পাতলা লম্বা চুলে ৮/১০টা বেণী করা। গায়ে বিশেষ পোশাক, বুকে কোম্পানির নামের সাথে নিজের নাম লেখা রয়েছে। অনেকক্ষণ ঘুরে আমাদের জন্য বড় একটা ট্রলি ডেকে নিয়ে এলো। এখানে এটাকে ‘স্কাইক্যাপ’ বলে চেনে সবাই। স্কাইক্যাপ-এ সব মালপত্র তুলে দিয়ে সেই তরুণ যখন অপেক্ষা করছিলো, তখন তার অপেক্ষার কারণ বুঝতে অসুবিধা হলো না।
জিজ্ঞাসা করলাম- তুমি কি কিছু বলবে? বিনীতভাবে তরুণের উত্তর, আমার কাজ শেষ, তোমাদের মালপত্র উনি (ট্রলির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে দেখিয়ে) নিয়ে যাবে, তুমি কি আমাকে বিদায় দিতে পারো। এবার ট্রলির লোকটা (সম্ভবত ভারতীয়) আমার দিকে তাকিয়ে বললাম, ওকে ছেড়ে দিন। কিছু দিতে হলে দিতে পারেন।
নিউইয়র্কে মিনিমাম টিপস কত তা জানা নেই। বুঝতে পারছিলাম না কত দিবো। তাই সেই কালো তরুণকে জিজ্ঞাসা করলাম, কত চাও? উত্তরে সে বললো, তোমার যা ইচ্ছা, না দিলেও অসুবিধা নেই। এটাই আমার কাজ। মনে মনে বাংলাদেশে ডলারের রেটটা মনে করার চেষ্টা করলাম। বাংলাদেশে ডলারের রেট অনেক দিন থেকেই সাধারণভাবে ১ ডলার সমান ৮০ টাকা। এবার এও ভাবলাম শহরটা নিউইয়র্ক।
কিন্তু এই শহরে আমি কে? আমাকে কে চেনে? এই কথাটা একবারও মাথায় এলো না। বরং বাংলাদেশী মধ্যবিত্তের প্রেস্টিজ জ্ঞানের বশবর্তী হয়ে তাকে ৫ ডলার দিলাম। মনে হলো তাতে সে অনেকই খুশি হয়েছে। অনেক মালামাল দেখে এবার ভারতীয় লোকটা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, আর ইউ মুভিং। উত্তরে আমি বললাম- হ্যাঁ। উত্তরে স্কাইক্যাপের লোকটা বলতে শুরু করলো- অনেক লাগেজ দেখে তাই মনে হলো, তা আপনি সব মালপত্র কার্টনে করে এনেছেন কেন, এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। নেক্সট টাইম কাপড়ের সুটকেস আনবেন, অনেক সুবিধা হবে উঠানামা করতে।
আমি মনে মনে বললাম- সুটকেস কেনার টাকা কি তোমার বাপ দেবে। তোমার তুলতে কষ্ট হয়েছে, তাই এত কথা। এবার স্কাইক্যাপ থামিয়ে লোকটা বললো, শুনুন, আপনাদের লাগেজে কোন সবজি নাই তো? কোন রান্না করা খাবার? আমি বললাম – না, শুধু ড্রাই ফুড।
ওখানে লাগেজ চেকিং এ ওরা এটা জিজ্ঞাসা করবে, আপনি আমাকে যা বলেছেন তাই বলবেন। আর যেহেতু আপনার সাথে ছোট ছোট কিডস আছে, ওদেরকে নিয়ে আমার সাথে সাথে থাকুন, কিডস দেখলে ওরা চেকিং নাও করতে পারে। যদিও এই কৌশল ও এই সব প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে আমাকে আগে থেকেই প্রশিক্ষণ দেয়া ছিলো। যা হোক, ট্রিক এ কাজ হয়েছে। দেড় বছরের পুত্রকে কোলে নিয়ে যেমন প্রশ্ন, তেমন উত্তর দিয়ে লাগেজ চেকিং এর ঝামেলা থেকে পার পেয়ে গেলাম।
বাইরে আত্মীয় পরিজনরা অপেক্ষা করছে। এয়ারপোর্টের পাবলিক এরিয়াতে আসতেই সবার সাথে দেখা হতে থাকলো। অনেক ভালো লাগলো কিন্তু মনে মনে অস্বস্তি হলো এই ভেবে যে, এই পরিবারটির ওপর আমরা এমনভাবে চেপে বসতে যাচ্ছি যে, ওনারা আমাদের সহসা ফেলেও দিতে পারবে না আর আমরাও চাইলেও ওনাদেরকে খুব দ্রুত চাপমুক্ত করতে পারবো না। এই ধরণের লেখায় ওনারা বিব্রতবোধ করবেন ভেবে ওনাদের পরিচয় উহ্য রাখলাম। তাছাড়া তাতে দায়সারা গোছের কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ পাবে। উল্লেখ্য ভারতীয় সেই স্কাইক্যাপারকে সম্ভবত ৩০ ডলার টিপস দিয়েছেন আমাদের সেই পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। আমেরিকাতে টিপস খুব প্রচলিত একটি বিষয়।
এ পর্যন্ত যে কয়েকটি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে সেগুলোর সবই এশিয়ার। কিন্তু ইমিগ্রেশন যাত্রা এবং দেশ ভ্রমণের মধ্যে যে বিস্তর তফাৎ, তা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছিলাম ও পাচ্ছি, যেমন ছবি তোলার ব্যাপারে আগ্রহ নেই। দর্শনীয় স্থান দর্শনের তাগিদ নেই। আগ্রহ নেই নতুন কোনো খাবার চেখে দেখার। কোনো কিছু কেনার তো প্রশ্নই আসে না। এ যেন বিবাগীর অপরিকল্পিত অনিশ্চিত যাত্রা।







