আবেগ, স্মৃতি আর ক্ষোভ মেশানো এক চিঠিতে ২০১৫ সালে দুর্বৃত্তের হাতে নিহত লেখক অভিজিৎ রায়কে স্মরণ করেছেন তার বাল্যবন্ধু শবনম নাদিয়া।
ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর নির্মম পাশবিকতায় অভিজিতের অকাল চলে যাওয়ার হতাশা আর আবেগ মিশ্রিত চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সুইডিশ পেন’ এর ডিসিডেন্ট ব্লগে।
অভিজিৎ রায়কে নিয়ে গত ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত শবনম নাদিয়া’র চিঠিটি ভাষান্তর করে প্রকাশ করেছে আজটুয়েন্টিফোর নামের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম।
চিঠিতে শবনম নাদিয়া লিখেছেন, “বইমেলার সেই জায়গা, যেখানে তারা তোকে হত্যা করেছে। নয় মাস হতে চলেছে। যারা বর্ষপূর্তি পালন করে, সেই দলে আমি কখনোই ছিলাম না। কিন্তু তুই চলে যাওয়ার পর এখনো আমি গুনে চলেছি, মাসের পর মাস, প্রতিটা মাস।”
দোস্ত আমার!
২০১৫ সাল, যে বছর তোকে হত্যা করা হয়েছে, প্রায় শেষ। আমি কখনোই ভাবিনি যে আমাকে এমন একটা বাক্য কোনোদিন লিখতে হতে পারে। কেউই ভাবে না। তোর হত্যাই যে এরকম খুনের প্রথম নজির, তা নয়, তোরটিই যে শেষ, তা-ও নয়।একটা সময় ছিলো যখন পত্রিকার পাতায়, আমার সোশ্যাল মিডিয়া ফিডে পরিচিত মুখগুলো দেখে খুশী হতাম। কারণ সেই মুখগুলো দেখা মানে তাদের কাজের, কাজের স্বীকৃতির কথা জানতে পারা। কারো হয়তো কোনো লেখা ছাপা হয়েছে অথবা কেউ একটা পুরস্কার জিতেছে বা কেউ তাদের কাজের ক্ষেত্রে অর্জন করেছে শ্রেষ্ঠত্ব।
কিন্তু এখন আমি পরিচিত মুখগুলো দেখে আতঙ্কিত হই। চেনা এক তরুণ প্রকাশক, তার নিজের অফিসে তার গলাকাটার সংবাদ পড়তে হয়; একজন তরুণী যার সঙ্গে আমার ফেসবুকে গল্প-কবিতা দেয়া নেয়া হয়, শুনতে হয় তার স্বামী হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে জীবন বাঁচাতে পাঞ্জা লড়ছে। এর মানে হচ্ছে তোর সঙ্গে আমার সুন্দর স্মৃতিগুলোর পাশাপাশি রক্ত আর মাংসের ছবিগুলোর পদচারণায়, অকল্পনীয় আতংকে পুরনো স্মৃতিতে ক্ষয় ধরেছে”।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে ছড়িয়ে থাকা দুই বন্ধুর অজস্র স্মৃতির টুকরো গল্প নাদিয়ার চিঠিতে যেনো এক দুঃখ-সুখের নস্টালজিয়া।
নাদিয়া লিখেছেন, “দুর্গা পূজার সময়টায় আমরা যেতাম পুরান ঢাকায়। আর পুরো ফেব্রুয়ারি মাসটা আমরা বইমেলা হেঁটে বেড়াতাম; শব্দ, বই, ভাবনাগুলোকে সতেজ রাখতাম। বইমেলার সেই জায়গা, যেখানে তারা তোকে হত্যা করেছে। নয় মাস হতে চলেছে। যারা বর্ষপূর্তি পালন করে, সেই দলে আমি কখনোই ছিলাম না। কিন্তু তুই চলে যাওয়ার পর এখনো আমি গুনে চলেছি, মাসের পর মাস, প্রতিটা মাস।প্রতি সপ্তাহেই বাংলাদেশে কিছু না কিছু ঘটে, যেটা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমরা সবাই মিলে গভীর থেকে গভীরতর কূপ খুঁড়ে চলেছি, নিজেদেরকে কিভাবে অন্ধ ও অজ্ঞ অসহিষ্ণুতার সেই কূপের দিকে ক্রমশ ঠেলে দিচ্ছি।
চরমপন্থীরা হত্যা করে, রাষ্ট্র কারাদণ্ডের হুমকি দেয়, তথাকথিত প্রগতিশীল সুশীল সমাজ নীরবতা বা সমর্থন দিয়ে সাড়া দেয়। তারা সতর্কতা অবলম্বন করে বলেন, হত্যা কোনো সমাধান নয়, কিন্তু। সেখানে সবসময়ই থাকে ‘কিন্তু’। এই শব্দটার আসল মানে হচ্ছে এই: মুখ বন্ধ রাখো। প্রশ্ন করো না। কৌতুহল দমিয়ে রাখো, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই।
আমি ভাবছি, কী বলতি তুই এসব নিয়ে এখন বেঁচে থাকলে? আমি ভাবছি, কত কঠোরভাবে তুই যুদ্ধ করতি। ঠিক যেমন মুক্তমনারা কঠোরভাবে এখন লড়ে যাচ্ছে। বাংলা একাডেমি থেকে টিএসসি, টিএসসি থেকে শাহবাগ— বছরের পর বছর এই রাস্তায় হেঁটেছি, বার বার, তোর সাথে, অন্য বন্ধুদের সাথে ।
আমি জানি বইমেলায় ঢোকার মুখে ঠিক কোন জায়গাটায় গাড়ি ঢোকা বন্ধ করতে ব্যারিকেডগুলো রাখা হয়। আমি জানি ঠিক কোন জায়গাটায় পুলিশ বক্স বসানো হয়, যেন তারা বইমেলা প্রাঙ্গন সুরক্ষিত করতে পারে, তবে সেটা আপাতদৃষ্টিতে। এত চেনা এসব জায়গা, যে ফেসবুকে একের পর এক ভয়ঙ্কর ছবিগুলো দেখে আমি ঠিক ধরতে পেরেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ফুটপাথের ঠিক কোথায় তোকে আক্রমণ করা হয়েছিলো, ঠিক কোথায় তুই রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েছিলি।
ড. হুমায়ূন আজাদ। তাকেও একই এলাকায় আক্রমণ করা হয়েছিলো, একইভাবে; একদল যুবক, হাতে উঁচু করে ধরা মাংসকাটা চাপাতি। সেই ঘটনার পর আমি সেই রাস্তাটা দিয়ে প্রায়ই হেঁটে গেছি । হুমায়ূন আজাদের রক্তমাখা সেই মুখ আমাদের স্মৃতিতে খোদাই হয়ে গেছে।
আর এখন, আমার স্মৃতির আরো গভীরে তোর জন্য জায়গা করতে হচ্ছে, সাথে আরো অনেকের জন্য। বন্ধু, সেই তালিকাটা যে শুধু বেড়েই চলেছে”।
দেশের বর্তমান উদ্বেগ-অবিশ্বাসের দমবন্ধ করা অনুভূতির কথা ফুটে উঠেছে এই চিঠিতে। সেখানে নাদিয়া লিখেছেন, “একদিন সন্ধ্যায় আমরা একটা স্কুটার থামালাম। স্মৃতি বড় মজার জিনিস, বন্ধু। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে ঠিক কোন জায়গাটায় আমরা দাঁড়ানো ছিলাম –টিএসসি আর চারুকলার মাঝামাঝি একটা জায়গায়। সেদিন স্কুটারের অপেক্ষায় আমরা মনে হয় চারজন ছিলাম। সেজন্যই পেছনে বসতে না পেরে ড্রাইভারের পাশে তুই বসতে গিয়েছিলি। ঠিক তখনই ড্রাইভার লাফ দিয়ে উঠলো, না, না, না! আপনার সাইজ বেশি বড়, ভাই! এবং ড্রাইভার তার দুই হাত দুইদিকে ছড়িয়ে দিলো দেখাতে যে তুই কতো বড়–তার এক হাত ঠেকলো চাংখারপুল আর এক হাত শাহবাগ ছুঁইছুঁই করছিলো। আর তুই কতো লম্বা, সেটা বোঝাতে সে একেবারে আকাশে হাত তুলে দিলো।
আমরা বাকিরা হেসে একাকার হলাম আর তোকে ইচ্ছামতো পচালাম (আমাদের কোন মায়াদয়া ছিলো না, তাই না রে!)। তুই তখন স্কুটারওয়ালাকে বকলি, অই মিয়া, অই মিয়া! তারপর আমরা গাদাগাদি করে কোনোমতে স্কুটারে উঠে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে ড্রাইভারও হাসছিলো, সেও আমাদের কাণ্ডকারখানায় মজা পেয়েছিলো।
তোর ওপর হামলার পর সেদিন যখন কেউ এগিয়ে আসেনি, একজন ফটোগ্রাফার তোকে আর বন্যাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গিয়েছিলো। আমি ফেসবুকে পড়েছি সে লিখেছে, তুই এত লম্বা, যে তোর পা দুইটা সিএনজিতে এঁটে উঠছিলো না। হঠাৎ পাশ থেকে কোনো গাড়ির ধাক্কা যেন না লাগে, সেজন্য ড্রাইভার সিএনজি ধীরে ধীরে চালাচ্ছিলো। মাঝেমাঝে নির্ঘুম রাতে আমি শুয়ে এদের কথা ভাবি। যারা তোকে হত্যা করেছে এবং যারা তোকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, তারা বন্যাকে তো বাঁচাতে পেরেছে। আমি ভাবি, আমাদের ভেতর কী থাকে যা কাউকে ঠেলে দেয় সাহায্য করতে, আর কাউকে ঠেলে দেয় কিছু দেখেও মুখ ফিরিয়ে নিতে। কোন আচরণটি যে মানবিক, সে বিষয়ে অবশ্য আমার কোনো অস্পষ্টতা নেই।
আমাদের সেইসব সন্ধ্যা–ঢাকা তখন একেবারেই অন্যরকম ছিলো। ঢাকা অবশ্য তখনই বদলাতে শুরু করেছিলো, কিন্তু সেটা আমাদের চোখে পড়েনি, তখনও বুঝিনি। সেই সন্ধ্যাটা ছিলো সেই সময়টার আরো আগে, যখন স্কুটারগুলো এক একটা ছোট্ট খাঁচায় পরিণত হওয়া শুরু করেনি—একটা খাঁচা ড্রাইভারের জন্য, একটা খাঁচা প্যাসেঞ্জারের। সামনে লোহার গ্রিল, এবং ছোট্ট গ্রিলের দরজা যেটা আটকানো যায়, পুরোটাই সবুজ, আমাদের নিরাপদ রাখে, আমাদের আলাদা রাখে।
আমি সেই স্কুটারগুলোর কথা ভাবি, আমি ঢাকার কথা ভাবি; কিভাবে ড্রাইভার এবং প্যাসেঞ্জার দুজনেই মনে মনে একে অপরের কথা ভাবে, ভয়ে থাকে, সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। আমি মাঝেমধেই ভাবি, এই সিএনজিগুলো আমাদের বেঁচে থাকার সঙ্গে কি দারুণভাবে মিলে যায়।
কতগুলো খাঁচা, কতগুলো বেড়া আমাদের নিরাপত্তার জন্য তৈরি করতে পারি? এই সংখ্যার হিসাবটা কি আমরা কোনোদিন মেলাতে পারবো”?







