সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে কালাচাঁদপুরের একটি বাড়িতে গারো সম্প্রদায়ের ২ নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয় ২ নারীকে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করে পুলিশ জানিয়েছে মূলত পারিবারিক কারণেই এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। অর্থাৎ ভিক্টিম এবং অভিযুক্তরা একে অন্যের সাথে পরিচিত ছিল। এমনিভাবে বাংলাদেশে পারিবারিক কারণে নিয়মিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, অনেক সময় অনেক ঘটনাই সংবাদ মাধ্যমে আসে না। কিন্তু হত্যাকাণ্ডগুলো সমাজে ব্যাপকভাবে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশে সাধারণত দু ধরণের হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে- ১. পারিবারিক কারণে হত্যাকাণ্ড ২. রাজনৈতিক কারণে হত্যাকাণ্ড। তবে পারিবারিক শত্রুতার জের ধরেই বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে। এর থেকে সুরাহার জন্য পারিবারিক মূল্যবোধ ও প্রকৃত শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।
হত্যাকাণ্ড হচ্ছে সমাজের জন্য মারাত্মক এবং জঘন্য সমস্যা এবং পৃথিবীর অন্যান্য সমাজের মতই বাংলাদেশেও হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। হত্যাকাণ্ডের সমস্যা অনুধাবনের জন্য সমাজের ভিত্তি কিংবা সমাজের আর্থ-সামাজিক সম্বন্ধে জানা অবশ্য কর্তব্য। অপরাধের মধ্যে সব থেকে ঘৃণিত এই মারাত্মক অপরাধটি অভিযুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক ভিক্টিমকে সাধারণত পূর্ব শত্রুতা এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে সংঘটিত করে থাকে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ৩০০ নং ধারায উল্লেখ রয়েছে: সেসব ক্ষেত্রসমূহ বা কর্ম সম্পাদন করলে উক্ত কার্যটি খুন হিসেবে অভিহিত হবে তা হল: যদি সেই কাজটির ফলে মৃত্যু সংঘটিত হয় সে কাজটি মৃত্যু সংঘটনের অভিপ্রায়ে হয় কিংবা, যদি কাজটি এমন দৈহিক আঘাত করার অভিপ্রায়ে সম্পাদিত হয়, যা যে ব্যক্তিকে আঘাত করা হয়েছে তার উক্ত আঘাতে মৃত্যু ঘটতে পারে বলে অপরাধকারীর জানা থাকে অথবা যদি কোন ব্যক্তিকে দৈহিক আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে কাজটি করা হয় এবং যদি যে দৈহিক আঘাত দেয়ার অভিসন্ধি করা হয়েছে সেই আঘাতটি যদি আসলেই স্বাভাবিক গতিতে মৃত্যু ঘটাবার জন্য যথেষ্ট হয় অথবা যদি যে ব্যক্তি কাজটি সম্পাদন করে সে ব্যক্তি যদি জানে যে, কাজটি এমন বিপজ্জনক যে এটি খুব সম্ভবত মৃত্যু ঘটাবে অথবা এরকম দৈহিক আঘাত ঘটাবে যা মৃত্যু ঘটাতে পারে এবং মৃত্যু সংঘটনের পূর্বোক্ত জখম ঘটাবার ঝুঁকি নেয়ার অজুহাত ছাড়াই অনুরূপ কাজ সম্পাদন করে।
সাধারণভাবে পূর্বপরিকল্পিত, উদ্দেশ্যমূলক, পূর্বশত্রুতা এবং ঘটনাস্থলে অবিবেচকের মতো মারাত্মকভাবে আঘাতের কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে। পাশাপাশি ভিক্টিম এবং অপরাধের দোষে অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে পূর্বপরিচয়ের রেশ ধরেই স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে পেশাগত কিলারের মাধ্যমে ভাড়ার ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের সাথে ভিক্টিমদের পূর্বপরিচয়ের সম্ভাবনা কম থাকে, কিন্তু অন্যান্য হত্যাকাণ্ডে পূর্বপরিচয়ের সম্ভাবনা থাকে।
বাংলাদেশ পুলিশের এক গবেষণা তথ্যসূত্রে, টাঙ্গাইল জেলার ৫ বছরের হত্যাকাণ্ডের (থানায় নথিভুক্ত) সংখ্যা ৪৮০টি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাত্র ৮৮ টি হত্যাকাণ্ডে দেখা যায় ভিক্টিম এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি একে অপরের অপরিচিত এবং বাকিগুলোতে দেখা যায় ভিক্টিম এবং অভিযুক্ত নিজেদের মধ্যে পরিচিত এবং অনেকাংশেই দেখা যায় আত্নীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। ভারতে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ৫০ শতাংশ হত্যাকাণ্ডে ভিক্টিম এবং অভিযুক্ত একে অপরের পরিচিত। অস্ট্রেলিয়াতে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ৫২ শতাংশ হত্যাকাণ্ডে ভিক্টিম এবং অভিযুক্ত একে অপরের নিকট পরিচিত।
বাংলাদেশে কেন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকে তার কার্যকারণ নির্ণয়ের জন্য বাইরের কয়েকটি দেশের আলোচনা নিবন্ধটিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। পেনসালভেনিয়ায় পরিচালিত একটি গবেষণায় জানা যায়, জঘন্য অপরাধের মধ্যে হত্যাকাণ্ড একটি অন্যতম ব্যয়বহুল অপরাধ। এ অপরাধের পিছনে বাৎসরিক ৩.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। কাজেই হত্যাকাণ্ডকে একটি ব্যয়বহুল অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা সিরিয়াল কিলার তাদের দীর্ঘকালিন ক্যারিয়ারে মদদদাতা হিসেবে অনেকেই উদ্বুদ্ধ করে থাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পিছনে।
আমেরিকায় পরিচালিত একটি গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়, হত্যাকাণ্ড হচ্ছে আইনবহির্ভূত উপায়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপরাধ সংঘটিত করা। প্রকৃতপক্ষে, শতকরা ২০ ভাগ হত্যাকাণ্ড পরিবারের সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে। আমেরিকাতে আরও দেখা যায়, ৪ জনের ১ জন মহিলা তাদের স্বামী কিংবা বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে থাকে। এফবিআই এর সমীক্ষণে দেখা যায়, আমেরিকাতে দৈনিক ৪৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

অন্য একজন গবেষক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, হত্যাকাণ্ড যে কোন সভ্য দেশের জন্য মারত্নক হুমকিস্বরূপ। হত্যাকাণ্ডের সাথে বৈষম্য আর দারিদ্রতার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।বিশেষত: আমেরিকা এবং জার্মানির নিম্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে হত্যাকাণ্ডের হার ও ভয়াবহতা তীব্র পরিমাণে দেখা যায় উচ্চ অর্থনৈতিক অঞ্চলের তুলনায়।
বাংলাদেশে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, পূর্বশত্রুতা, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক মতবিরোধ, অবৈধ সম্পর্ক ইত্যাদি কারণে সাধারণত হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে। এসব হত্যাকাণ্ড অধিকাংশই পূর্বপরিকল্পিতভাবে হয়ে থাকে এবং পারিবারিক কারণে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো বাড়ি এবং এর আশেপাশে হয়ে থাকে এবং অভিযুক্ত এবং ভিক্টিম পরস্পরের পরিচিত হয়ে থাকে। হত্যাকাণ্ডগুলো দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে।
হত্যাকাণ্ডগুলোকে দূরীকরণের জন্য পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাতৃত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের নেতিবাচকতা নিয়ে সকলের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জীবনবোধ, মূল্যবোধ, সততা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ হত্যাকাণ্ড রোধকল্পে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি পুলিশের সাথে কমিউনিটির সহযোগিতার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলেই হত্যাকাণ্ড নামক মারাত্মক ব্যাধি থেকে সমাজের মানুষকে দূরে রাখা যাবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








