বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের খুব গভীর সম্পর্ক ছিল বলে শোনা যায়। জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদরা প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে আসতো, শিক্ষকদের সাথে সময় কাটাতো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে মূল্যবান মতামত চাইতো। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রাষ্ট্র যখন সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতো তখন আরো বেশি যাওয়া-আসা থাকতো তাদের। জাতীয় পর্যায়ের সকল নেতাই এই বিষয়টি অনুসরণ করতো। এমনকি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখতেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ভিন্নভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজ-খবর নিতেন।
সময়ের পরিক্রমায় এখন পরিবর্তন এসেছে। রাজনীতিবিদরা এখন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবে আসে না, আসার প্রয়োজনও হয়না। কেননা, বেশিরভাগ শিক্ষকই জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের কাছে যাওয়া-আসা করে। ফলে, আলাপ-আলোচনা থাকলে সেখানেই সেরে ফেলে। যেসব শিক্ষক রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ রাখেন- কোন সুযোগ-সুবিধা আসলে তারাই আগে পাবেন- এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু এখনও তো কিছু শিক্ষক আছেন যারা এ পথ অনুসরণ করেন না। তারা এখনও মনে করেন, তাদের কাজ এটা নয়। তাদের কাজ প্রতিনিয়ত জ্ঞান সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা। যে শিক্ষকগণ এই আদর্শ অনুসরণ করেন তারা তো কখনই রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ রাখবেন না এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার জন্য কারো কাছে ধরণা দেবেন না। কারণ, তাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদের দরকার নেই। এরূপ শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করলেও, রাষ্ট্রের প্রয়োজন আছে এ ধরনের শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর। কেননা, এই শিক্ষকগণই পারে তাদের জ্ঞান ও দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা দিয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনও শিক্ষকদের সাথে তার বাবার মতই যোগাযোগ রাখেন। কিন্তু, কেন যেন প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বস্ত সকল শিক্ষককে এক এক করে তার কাছ থেকে খুব কৌশলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ও অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান স্যারের কথা বলা যায়। এই দুই শিক্ষকই তাদের সততা, জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা দিয়ে মন জয় করেছেন বাংলাদেশের কোটি মানুষের।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের সকল সংকটকালীন সময়ে তার জ্ঞান ও দূরদর্শী চিন্তা-চেতনা দিয়ে দলটিকে সহযোগিতা করেছেন। সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমান সরকার পদ্মা সেতুর বিষয়টি নিয়ে যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা চাপের মুখে তখন তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে ধারণা দিয়েছিলেন পদ্মা সেতু বাংলাদেশের নিজের টাকাতেই করা সম্ভব। এই বিষয়টি হয়ত আমরা অনেকেই জানি না এবং জানার কথাও না। কেননা, এই মানুষগুলো আত্ম-প্রচারে বিশ্বাসী নয়। আর এই সুযোগেই অন্যরা তাদের অর্জিত বিষয়গুলো নিজের নামে চালিয়ে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালীন আবুল বারকাত ব্যাংকটিকে ভিন্ন একটি জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের প্রভাবশালী কোন এক মন্ত্রীর সাথে তার চিন্তা-ভাবনার মিল না থাকায় তিনি সেখানে থাকতে পারেননি। রাষ্ট্রের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকায় অধ্যাপক বারকাতের কোন ক্ষতি হয়নি। তিনি আগের মতই তার বাসার চিলে-কোঠায় বসে প্রতিনিয়তই গবেষণা করে চলেছেন। আর অবসর সময়গুলো তার বাসার ছাদের প্রিয় জয় বাংলা উদ্যানের গাছগুলোর সাথে কাটাচ্ছেন। তিনি তো খুব ভালোই আছেন। কেননা, তিনি এখন সময় নিয়ে তার গবেষণায় মনযোগ দিতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র তার সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে। আর হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির লাভ হয়েছে।
একই ভাবে অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম বিশ্বস্ত একজন শিক্ষক। প্রধানমন্ত্রী তাকে বিশ্বাস করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কঠোর সংগ্রাম করে লেখাপড়া করা এই শিক্ষক প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছিলেন। তিনি অধ্যাপক বারকাতের মত বাংলাদেশ ব্যাংককে অনেক উপরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার জ্ঞান, সততা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে তিনি কোটি বাঙ্গালির মন জয় করেছিলেন। কিন্তু সরকারের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির মন তিনি জয় করতে পারেননি। তাই তাকেও অধ্যাপক বারকাতের মত কৌশলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে না থাকায় ব্যক্তিগত ভাবে তার কোন ক্ষতি হয়নি। তিনি আবার তার প্রিয় ক্লাসরুমে ফিরে এসেছেন অধ্যাপক বারকাতের মতই। তারা দু’জনেই ভাল আছেন। কিন্তু, ক্ষতি হয়েছে এই দেশটির। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে যেদিন অধ্যাপক আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন সেদিন যত ব্যক্তি কষ্ট পেয়েছিল, তার মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও ছিলেন। কিন্তু আর কোন উপায় ছিল না।
তাই কেন যেন মনে হয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংকটকালীন সময়ে তার পাশে থেকে যেসকল শিক্ষক তাকে সহযোগিতা করেছিলেন- এমন বিশ্বস্ত সকল শিক্ষককে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একে একে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন?
সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নাম। প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালে যখন তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব দেন, তখন থেকে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি দিনের জন্যও রাজনৈতিক বা অন্য কোনো দ্বন্দ্বে বন্ধ হতে দেয়নি। বিভিন্ন মহলের শত বিরোধীতার মাঝেও তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। তার পুরো সময়টাকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা যখন দুর্নীতির দায়ে ক্যাম্পাসে আটক থেকেছেন, সেখানে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক এসবের বাইরে। বলা হয়, দেশ কেমন চলবে তা অনেকটাই নির্ভর করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেমন চলবে তার ওপর। কেননা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে রাজনীতির আঁতুর ঘর।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সেই সংকটপূর্ণ সময়ে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক এক মুহূর্তের জন্যও এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল হতে দেয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শান্ত থাকার কারণে স্বভাবতই দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শান্ত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর অস্ত্রের মহড়া নেই, সেশন জট নেই, যা কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সহ্য করতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী তাকে বিশ্বাস করে যে দায়িত্বগুলো দিয়েছিলেন, আজ তার সবই বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু অধ্যাপক বারকাত এবং অধ্যাপক আতিউর রহমানের মতো একইভাবে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিককেও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অধ্যাপক বারকাত, অধ্যাপক আতিউর রহমান, অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিকের মত ব্যক্তিগণ রাষ্ট্রের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকলে তাদের ব্যক্তিগত কোন ক্ষতি হবে না। কেননা, তাদের মতো যেসকল মহৎ ব্যক্তি রয়েছেন তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। তাইতো এত বড় পদে থাকার পরও তাদের সততা নিয়ে কেউ কোনোরূপ প্রশ্ন তোলার সাহস পর্যন্ত দেখায়নি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার প্রয়োজনে এসকল সৎ, দক্ষ, আত্ম-ত্যাগী ও দেশপ্রেমী ব্যক্তিকে যথাসম্ভব সম্মান প্রদান করার কোনো বিকল্প নেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







