প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।
চিমনির মুখে শোনো সাইরেন-শঙ্খ,
গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে,
তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য
জীবনকে চায় ভালবাসতে।
প্রণয়ের যৌতুক দাও প্রতিবন্ধে,
মারণের পণ নখদন্তে;
বন্ধন ঘুচে যাবে জাগবার ছন্দে,
উজ্জ্বল দিন দিক্-অন্তে।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পুরো কবিতা যেনো নেমে এসেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি তখন সদ্য বেকার বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে একটি এফএম রেডিও’র চাকরি ছাড়তে বাধ্য হই। সুলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকি। সবাই জানে আমিও একজন সাংবাদিক। যদিও আমি জানি বেকার সাংবাদিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেনাবাহিনীর সাথে শিক্ষার্থীদের বাতচিত হয়েছে। তুচ্ছ ঘটনাটি এতবড় বিপ্লবে রূপ নেবে ভাবতে পারেননি অবিমৃষ্যবাহিনীর সদস্যরা।
আমি তখন চ্যানেল আইতে যাওয়া আসা করছি তৎকালীন সম্পাদক সাইফুল আমিনের কাছে। যদি তিনি আমার বেকার জীবনের ইতি ঘটিয়ে আমাকে খেয়ে পরে ঢাকা শহরে বেচে থাকার সুযোগ করে দেন। তার হাত ধরেই রেডিও টুডেতে আমার আনুষ্ঠানিক ইলেকট্রনিক মিডিয়া সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিলো। এক বছরের মাথায় তিনি চ্যানেল আইতে যোগ দিলে আমরা তার লোক এই অভিধায় অভিযুক্ত হয়ে ষড়যন্ত্রের শিকার হই। যাই হোক সে অন্য গল্প।
চ্যানেল আইয়ের তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক নাজমুল হোসেন (বর্তমানে যমুনা টেলিভিশনের রিপোর্টার)। আমি চ্যানেল আইতে যাওয়ার জন্য রোকেয়া হলের সামনে আসি। সেখানে তার সাথে দেখা। দেখি হলের গেটে একটি সেনা সদস্য ভর্তি কনভয়। নাজমুল ক্যামেরাম্যানকে শট নিতে বললেন। ক্যামেরাম্যান শট নেয়া শেষ করার আগে দেখি অপর পাশের কনভয়টি আমাদের দিকে আসার জন্য ঘুরছে। শনির দশা বুঝতে পেরে আমরা ছোট ক্রু গাড়িতে ছুট দেই। ওরা আমাদের বেশ কিছুক্ষণ ফলো করে। ড্রাইভারের বুদ্ধিমত্তায় অলি গলিতে গাড়ি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত সেনা সদস্যদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম।
আমি তখন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় আন্দোলন দেখেছি শামসুন্নাহার হলে পুলিশ প্রবেশের ঘটনা। তখন ছিলাম ২য় বর্ষের ছাত্র। ঐ আন্দোলনের সাথে এই আন্দোলনের পার্থক্য ছিলো বিরাট। তখন ছিলো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার। সেই আন্দোলন ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
২০০৭ সালের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশ শাসন করছিলো সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেনা সদস্যদের দোর্দন্ড প্রতাপ দেশজুড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তাদের ঘাঁটি। দেশের কোথাও কোন আন্দোলন নেই। মাইনাস টু ফর্মূলা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর অনির্বাচিত সরকার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে অন্তরীণ করে রেখেছে। এমনি এক ভীতিকর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে অপমান করে এবং মারধর করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
ঘটনাটি খুব বড় হয়তো ছিলো না কিন্তু সেনাবাহিনী তাদের ক্ষমতার আস্ফালন দেখাতে চেয়েছিলো নিরীহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর। বাহিনীর সদস্যরা বুঝতেই পারেনি শান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরতে পরতে ঢাকা থাকে জলন্ত মাইম। এই তুচ্ছ ঘটনা অভিমানী শিক্ষার্থীদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো। দলে দলে শিক্ষার্থীরা নেমে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পথে। আগুন জ্বলে ওঠে টিএসসি, শাহবাগ, নীলক্ষেতসহ সবগুলো মোড়ে। অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে খেলার মাঠের সেনা ক্যাম্প। প্রথম দিন ক্ষমতা দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে সেনাবাহিনী ও সরকার। কিন্তু ততক্ষণে শিক্ষার্থীদের জ্যাত্যাভিমানের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। এই আন্দোলনে কোন নেতা ছিলেন না। যেন সবাই নেতা, সবাই কর্মী। বাংলাদেশের ইতিহাসের রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ববিহীন এমন সফল আন্দোলন আর দেখা যায়নি। যদিও এই আন্দোলনের মাধ্যমে অনেকেই নিজেদের রাজনীতির ক্যারিয়ার গুছিয়ে নিতে পেরেছিলেন পরবর্তীতে। এই ঘটনায় ককটেল ছুড়ে তো একজন বড় একটি ছাত্র সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
২২ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে সরকার নমনীয় হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেনা ক্যাম্প সরানো, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনাসহ শিক্ষার্থীদের দাবি মানার ব্যাপারেও একমত হয়। তবে ২৩ তারিখ সবখানে আন্দোলন থেমে গেলেও ভিসি চত্বর থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকে। আমি জহুরুল হক হলের ভেতর দিয়ে এফ রহমান হলের সামনে এসে দেখি ছেলেরা নীলক্ষেতের পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পাটকেল ছুড়ছেন। এফ রহমান হলের উপর থেকে ছেলেরা পাথর ছুড়ছেন। ওদিক থেকে পুলিশ ছুড়ছে কাদুনে গ্যাসের গোলা। এই হলের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষিপ্ত, কারণ আগের রাতে তাদের হলে রেইড দেয়ার চেষ্টা হয়েছে।
দুপুর গড়িয়ে যায়। এখানকার সংঘর্ষ থামে না। বিশ্ববিদ্যালয প্রশাসন জরুরি সভা ডাকে। আমি তখনো স্পটে। হঠাৎ আমার কাছে খবর আসে আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে এখানে একটি লাশ ফেলা হবে। উড়ো তথ্য। কোন নির্ভরযোগ্য সোর্স নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তখন আকা ফিরোজ আহমদ। ঠাণ্ডা মাথার দারুণ প্রশাসনিক মানুষ। আমার প্রতি তার ভালোবাসা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতার কাল থেকে। সাংবাদিকতার গণ্ডি পেরিয়ে সেই সম্পর্ক তখন ব্যক্তিগত পর্যায়েও গড়িয়েছিল। তাকে ফোন করে বললাম, স্যার খবর পেলাম নীলক্ষেতের এখানে একটি লাশ ফেলা হবে। কিছু একটা করেন। স্যার বললেন, থ্যাঙ্কু ইউ ফর ইউর ইনফরমেশন, চেক করে দেখছি এবং ব্যবস্থা নিচ্ছি। স্যার সত্যি সত্যি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।
দেখলাম, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা এলো হল খালি করতে হবে। এ খবর পাওয়ার পর দ্রুত হলে ফিরলাম। প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তখনো জানি না কোথায় যাবে। শেষ পর্যন্ত সমাধান একটা হয়েছিলো তখন সাইন্স ল্যাররেটেরিতে কাজ করেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ইসমাইল ভাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে পাঠ শেষ করে তখন সিনিয়র রিসার্চার ছিলেন। আমার বাড়িও চট্টগ্রাম হওয়ায় পরিচয় ছিলো পূর্বেই। এলিফ্যান্ট রোডে তার সরকারি ব্যাচেলর কোয়ার্টারে গিয়ে উঠলাম। ভাগ্য সহায় ছিল। না হলে অন্যদের মতো যারা আপতত থাকার জায়গা হিসেবে শাহবাগে আজিজ কোঅপারেটিভ বিল্ডিংয়ে উঠেছিলেন তাদের সেনাবাহিনীর সদস্য দ্বারা লাঞ্চিত হতে হয়েছিলো। যেখানে হয়তো আমিও থাকতাম। অনেকেই বাড়ি যাওয়ার পথে বুটের লাথি খেয়েছিলেন।
অবশ্য এরই মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনা হয়ে পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিলো। ডেইলি স্টারের শেষপাতায় একজন উর্দি পরিহিত বাহিনীর পশ্চাদদেশে এক শিক্ষার্থীর ফ্লাইং কিক মারা ছবি। এ ঘটনায় রেশ অনেক দিন পর্যন্ত ছিলো। এ ঘটনা লাইভ করে বিপদে পড়েছিল সিএসবি টেলিভিশন ও ইটিভি। শেষ পর্যন্ত সিএসবির লাইসেন্স বাতিল হয়েছিলো। চার জন শিক্ষককে চোখ বেঁধে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। অনেক শিক্ষার্থী এখনো সেই সময়ের নির্যাতনের ব্যাথা নিয়ে জীবনযাপন করছেন।
পাদটীকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে পাস হয়ে ২১-২৩ আগস্ট এই সময়ের কোন একদিন কালো দিবস পালন করে কর্তৃপক্ষ। টিএসসিতে কালো দিবসের আলোচনায় ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূর দাবি করে, যৌক্তিক দাবি হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয প্রশাসন ও সরকার কখনো কখনো কেনো যেনো ষড়যন্ত্র, বিরিয়ানি আন্দোলন নাম দিয়ে আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে চায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫২ থেকে এখন পর্যন্ত যত আন্দোলন হয়েছে তার সিংহভাগের উৎপত্তিস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তারপরও কেন যেন ইতিহাস ভুলে গিয়ে কখনো দলবাজ শিক্ষক, কখনো দলবাজ প্রশাসন কিংবা পক্ষীয় সরকার সেনাবাহিনীর আচরণ দেখিয়ে ছাত্রদের আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে চান। তবে শেষ পর্যন্ত জয় হয় অকুতোভয় শিক্ষার্থীদের। কারণ তারা বুঝে যায়,
শতাব্দীলাঞ্ছিত আর্তের কান্না
প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;
মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না –
পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।
প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য
চিনে নেবে যৌবন-আত্মা।।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








