একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের নেতা-কর্মীরা কি শপথ নেবে? হ্যাঁ বলছি দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের কথা।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল, সময়ের স্রোত পেরিয়ে সেই দল এখন ৬৯ বছরের পুরনো দলই বটে। যদিও সেই দলের হাতেই আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব। সেই দল যখন সরকার পরিচালনা করছে , তখনই মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পৌঁছেছে। আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের এবং উন্নত দেশ গড়ার সংগ্রামের কথা আমরা অহরহ শুনছি আওয়ামী লীগ নেতাদের কণ্ঠে। মাত্র কদিন পরেই সত্তরে পা দিবে আওয়ামী লীগ। একটানা দশ বছর ধরে দেশের শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী আওয়ামী নেতারা। এবছর অবশ্য নির্বাচনের বছরও। পরপর দুটি নির্বাচনে জয়লাভ (২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও) করার কৃতিত্ব আওয়ামী লীগ দাবি করতেই পারে । তবে তৃতীয়বার বিজয় নিশ্চিত করতে হলে দলটির নেতা-কর্মীদের অনেক কিছুই ভাবতে হবে বৈকি?
দেশ স্বাধীন করার কৃতিত্ব নিয়েই স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও ভেবেছিলেন সাধারণ মানুষের মন জয় করার কথা। উদ্ধৃত করতে চাই ১৯৭২ সালে ৯ এপ্রিল ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সভাপতি হিসেবে দেয়া জাতির জনকের ভাষণ। তিনি বলেছিলেন ” বিরোধীদলে থাকা এক রকমের আর সরকারের পক্ষে রাজনীতি করার জন্য পন্থা এবং সেখানে গঠনমূলক কাজের দিকে মানুষকে এগিয়ে যেতে হবে। অত্যাচার-অবিচার যেন না হয় । জুলুম যেন না হয়। লুটতরাজ যেন না হয়। দেশের মানুষকে সেবা করে মন জয় করতে হবে।……..।”
আমরা আশা করতেই পারি ২০০৯ সাল থেকে একটানা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আওয়ামী আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশবাসীর মন জয় করার চেষ্টায় ব্রতী হতে শপথ নিবে ২৩ জুনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একজন তাত্ত্বিক রাজনৈতিকের মতই বলেছিলেন ” রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চারটি জিনিষের প্রয়োজন এবং তা হচ্ছে নেতৃত্ব, ম্যানিফেস্টো বা আদর্শ, নিঃস্বার্থ কর্মী এবং সংগঠন ।” বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশের সবচেয়ে বেশী সময় যার সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সেই জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে । দলের অন্য নেতারা ভেবে দেখবেন তারা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন কি না ?

নিশ্চয় দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের সময় সত্তর বছরের দলটি ঠিক ঠিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হলো কি না তার আত্মবিশ্লেষণ করবেন দলটির নেতারা। কর্মীদের পরিচালনার দায়িত্বও তাদের। আমরা শুধু চাই আওয়ামী লীগ তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বজায় রাখুক , সাধারণ মানুষের যে দলটি স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল,যে দলের এখনো লাখো-কোটি সাধারণ কর্মী আছেন,যারা সকল লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে ,তাদের দিকে তাকিয়ে হলেও বেশি দিন ক্ষমতায় থাকার কারণে ” দুর্বৃত্ত ” হয়ে ওঠা ” হাইব্রিড ” নেতারা নিজেদের সামলিয়ে নেক।আমরা আশা করি জাতির জনকের যোগ্যতম কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা যে ” অসমাপ্ত আত্মজীবনী শেখ মুজিবুর রহমান ” এবং ” কারাগারের রোজনামচা শেখ মুজিবুর রহমান ” আমাদের উপহার দিয়েছেন, সেই দুটি গ্রন্থ যেন আওয়ামী নেতা-কর্মীদের অবশ্য পাঠ্য হয়। শত সমালোচনার মুখে থেকেও যেন আওয়ামী নেতা-কর্মীরা এই দুটি বই আত্মস্থ করে।
১৯৪৯ সালে দল গঠন,দলের নাম পরিবর্তন করে অসাম্প্রদায়িক দল করা এবং দেশ স্বাধীনের কৃতিত্ব থাকা সত্যেও জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে । ছয় বছর পর ১৯৮১ সালে সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ১৫ বছর সংগ্রাম করে দলের প্রতিষ্ঠা দিবসেই প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুনের পর দেশে প্রথমবারের মত সরকারের মেয়াদ পূরণ শেষে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথম নজিরও স্থাপন করেছিলেন তিনিই।কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাকেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল দলের মধ্যেই। সব কিছু অতিক্রম করেই শেখ হাসিনা এখন সবচেয়ে বেশি সময়ের সরকার প্রধান। এবছর যখন তিনি সত্তুর বছর বয়সী দলের প্রধান হবেন,তখন তার সামনে চ্যালেঞ্জ থাকবে একটানা তৃতীয়বার সরকার গঠনের।তিন মেয়াদে ১৫ বছর সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা সত্যেও একটানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেয়াটা যে সহজ হবে না, এটা আওয়ামী লীগের সবাই স্বীকার করবেন। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই একটু ভিন্নধরণের শপথ নিতে হবে দলের সর্বস্তরের নেতাদের। আগামী ডিসেম্বরে সম্ভাব্য ভোটের আগে সময় কম। কিন্তু তার আগেই সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে , বিশেষ করে যারা সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেছেন তাদেরকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার পদ্মাসেতু করছেন , ঢাকার অসহনীয় যানজটে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসীর সামনে মেট্রো রেল উকি দিচ্ছে, পারমানবিক বিদ্যুতের দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ , উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছেছে দেশ , কিন্তু আপনি এলাকায় কি সুনাম কুড়িয়েছেন ? আপনার সাঙ্গ-পাঙ্গরা কি চাঁদাবাজিতে ওস্তাদ ? আপনার নেতারা কি টেন্ডার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ? তারা কি সংখ্যালঘু-দুর্বলদের কাছে ত্রাস হিসেবে চিন্তিত? প্রশ্ন আরও অনেক কিছুই উঠবে আগামী ভোটের আগে।তাই আগামী ২৩ জুন শপথ নিন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা । বারবার পাঠ করুন জাতির জনকের দেয়া নানা ভাষণ ।১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি কুমিল্লার সামরিক একাডেমিতে শেখ মুজিব দৃপ্তকণ্ঠেই বলেছিলেন ” যদি আমরা সোনার ছেলে তৈরি করতে পারি,তাহলে ইনশাল্লাহ আমার স্বপ্নের সোনারবাংলা একদিন অবশ্যই হবে। আমি হয়তো দেখে যেতে পারবো না। কিন্তু তা হবে।আজ বাংলাদেশের সম্পদ কেউ লুট করে নিতে পারবে না । বাংলার মাটিতেই তা থাকবে,
তিনি বলেছিলেন ” আমি প্রতিজ্ঞা করেছি বাংলাদেশের মাটি থেকে ঘুষখোর,দুর্নীতিবাজ,মুনাফাখোর আর চোরাচালানকারীদের নির্মূল করবো ।” একই বছর ১৫ জানুয়ারি ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ” আপনারা একবার আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা করুন আমরা দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকবো।”
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের সময় বারবারই বলছি জাতির জনকের নানা ভাষণের কথা। কারণ কখনও কখনও মনে হয় উন্নয়ন করে,ডিজিটাল বাংলার শ্লোগান দিয়ে একটানা ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কি অল্প হলেও ” আত্ম অহংকারী ” হয়ে উঠছে ? দলীয় প্রধান রাতদিন পরিশ্রম করছেন, অর্থনৈতিক সূচক-পরিসংখ্যান বলছে রাষ্ট্র হিসেবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে,তাহলে কেন সমালোচনাও শুনতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে? কেন ছাত্রলীগ-যুবলীগের নামে এত অভিযোগ ? কেন ” বিচার বহির্ভূত হত্যার ” দায় নিতে হচ্ছে ? কেন কথায় কথায় বলা হয় ” সব ঠিক আছে কিন্তু সুশাসনের অভাবে ম্লান হচ্ছে শেখ হাসিনার সাফল্য ? ” দেশের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আর বেশি সময়ের সরকার পরিচালনায় থাকা আওয়ামী লীগকেই এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে , কারণ ক্ষমতায় থেকে ৬৯ বছর পেরিয়ে ৭০ তম বছরে পদার্পণের জয়তিলকতো তাদের মুকুটেই !
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








