শত্রুতা প্রকাশ দ্বিপাক্ষিক হওয়া লাগে না, অনেক সময় একপাক্ষিক হতেও পারে- এমন এক অবস্থা চলছে দেশজুড়ে। শুরুটা আইনি হলেও একে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে কুশীলবেরা ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। ফলে একতরফা আক্রমণ চলছে। বলছিলাম, ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায় নিয়ে, যেখানে রাষ্ট্রপক্ষের আইনি পরাজয়ে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা হারিয়েছে সংসদ। এ ক্ষমতা এখন সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের।
আপিলের রায় ঘোষণা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সরকারদলীয় নেতাকর্মী, মন্ত্রীদের একতরফা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বিরাগের বশবর্তী হয়ে শপথ ভঙ্গের, অপসারণের দাবি জানিয়েছেন একাধিক মন্ত্রী। এ রায় একটা ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক ড্রাফট করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন একজন সাংসদ। অশিষ্ট আচরণে তুমি সম্বোধনে ছিঁচকে উকিল সম্বোধন করে অনেকটা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছেন একজন মন্ত্রী। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিও একইভাবে অভিযোগ করেছেন শপথভঙ্গের; এছাড়াও আছে রায়ে অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য দানের অভিযোগ হ নানা জনের নানা অভিযোগ।
এমন অবস্থায় অনেকটা একপাক্ষিক আক্রমণের কেন্দ্রে প্রধান বিচারপতি। যারা আক্রমণ করছেন তাদের অনেকেই নিজেরাও সাংবিধানিক পদে আসীন, কিন্তু নিজেদের অবস্থানে থেকে ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স বা পদমর্যাদাক্রম ভেঙে আক্রমণ করে যাচ্ছেন। প্রধান বিচারপতির এ নিয়ে বলার সুযোগ কম, কারণ তার অবস্থান তাকে জনসমক্ষে সব কথা বলতে কিছুটা সীমাবদ্ধ করে দেয়।
চলমান সমালোচনার মধ্যে আরেক ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধান বিচারপতি, এটা আদালতে পাকিস্তান উচ্চারণের কারণে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণবিধি নিয়ে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যকার চলমান টানাপোড়েনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘পাকিস্তানের আদালতে তো অনেক কিছুই হয়ে গেল,… সেখানে ঝড় ওঠেনি। আপনারা মিডিয়ায় অনেক কথা বলবেন, এটা ঠিক নয়। আপনারা ঝড় ওঠাচ্ছেন; আমরা বিচার বিভাগ ধৈর্য ধরছি। যথেষ্ট ধৈর্য ধরছি।’
আর যায় কোথায়? আদালতে পাকিস্তান উচ্চারণ করেছেন, মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। রায়ের কারণে হঠাৎই আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাছে শত্রুসম হয়ে যাওয়া প্রধান বিচারপতিকে তুমুল সমালোচনায় ভাসিয়েছেন তারা। কেবল পাকিস্তান শব্দ উচ্চারণে তার মধ্যে পাকিস্তানপ্রেমের প্রমাণ পেয়ে গেছেন! অনেকেই আবার একাত্তরে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ আবার এর মাধ্যমে পাকিস্তানের পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে অবৈধ ঘোষণার বিষয়টিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হুমকি হিসেবেও দেখেছেন। অথচ তারা ভাবেননি বা ভাবতে চাননি প্রধান বিচারপতির এ উদাহরণ রায় নিয়ে নয়, এটা ছিল রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেলকে করা প্রশ্ন ও মন্তব্য।
অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানিয়েছেন, ‘একটা আনস্টেবল সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে।’ তখন প্রধান বিচারপতি সেই ‘আনস্টেবল সিচুয়েশনের’ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সবটা নিয়েই আমি বিব্রত।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা ঝড় তুলছেন। আমরা কোনও মন্তব্য করেছি?’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘না, আপনারা করেননি।’
বিষয়টি এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রায় সকলেই এ নিয়েও অযৌক্তিক সমালোচনা করছেন। অথচ তাদের ভাবা দরকার ছিল প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে অযোগ্য ঘোষণার রায় সম্পর্কে না বলে জানতে চেয়েছেন প্রতিক্রিয়া নিয়ে। অনুযোগ করেছেন সরকারের সমর্থনে এখানে ওঠা ঝড়ের। অ্যাটর্নি জেনারেলও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে অনেকটা একমত হয়ে জানিয়েছেন বিচারপতিরা এ নিয়ে কথা বলেননি।
আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ উঠার কারণে অনেক মিডিয়া এ বক্তব্যকে খণ্ডিত উপস্থাপনে টুইস্ট করেছে। তারা পাকিস্তান শব্দটি শিরোনামে নিয়ে এসে পাঠককে বিভ্রান্ত করেছে। আর এ সময়ের পাঠকদের অধিকাংশই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন সংবাদ পড়ার চাইতে শিরোনাম পড়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ফলে ভেতরে কোন কিছু থাক বা নাই থাক, সমালোচনা আর আক্রমণের রসদ পেয়ে যায় অনেকেই। এখানে মিডিয়ার দায়িত্বশীলতার ঠিক পাশে যে বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন পড়ে যায় সে খবর কজন সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক রাখেন- এ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়!
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের এ রায়ের পর সরকার ও আওয়ামী লীগের ‘অলআউট’ আক্রমণ অনেকটাই একপাক্ষিক। সাংবিধানিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংবিধানের বাইরে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব না বলেই বিচারপতিরা বাইরে প্রতিক্রিয়া জানাননি, জানাবেন না বলেও জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। ফলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একতরফা দোষারোপ আর আক্রমণে বিদ্ধ হচ্ছেন সাংবিধানিক পদক্রমের চতুর্থ স্থানে থাকা প্রধান বিচারপতি। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে আওয়ামী লীগ আপিলের ‘আদেশ (Order)’ নিয়ে কথা বলছে না, বলছে কেবল পর্যবেক্ষণ নিয়ে; কিন্তু পর্যবেক্ষণের ঠিক কোন বাক্য-অনুচ্ছেদে তাদের আপত্তি রায় প্রকাশের তিন সপ্তাহ পরেও জানাতে পারেনি।
তারা অভিযোগ করছে, রায়ের পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অবমূল্যায়নকর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ঠিক কোন পাতায়, কোন বাক্য, কোন অনুচ্ছেদে বঙ্গবন্ধুকে উচ্চারণ করে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে এ নিয়ে জানাতে পারেনি দলটি। ফলে ধরেই নেওয়া যায়, ইস্যুবিহীন সময়ে একটা ইস্যুকে চাঙ্গা রাখতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। কিন্তু চাঙ্গা রাখতে গিয়ে তারা অশিষ্ট আচরণে আক্রমণ করে যাচ্ছেন সাংবিধানিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে। আর এর মাধ্যমে তারা নিজেরা ছোট হওয়ার পাশাপাশি অবমাননা করেই চলেছেন সাংবিধানিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে এ নিয়ে সরকার ভাবিত নয়, অথবা বলা যায় অনেকটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতেই চলছে এ অবমাননা।
এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে বিশ্ব ইতিহাস। পৃথিবীর কোন দেশেই কোন রাজনৈতিক দল আজীবন ক্ষমতায় থাকে না, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় হওয়ার কথা না। এখন যে তারা অদৃশ্য চাপাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে বিচার বিভাগের সামনে, সেই তারাই একদিন ‘মাই লর্ড’ উচ্চারণে ন্যায়বিচারের আকুতি জানাবে হয়তো সে বিচার বিভাগের কাছেই, এবং এটাই তো স্বাভাবিক।
প্রধান বিচারপতি কিংবা আপিল বিভাগের এ বেঞ্চও আজীবন থাকবে না; কিন্তু থেকে যাবে বিচার বিভাগ ও তাদেরকে নিয়ে ক্ষমতাসীনদের অন্যায়, অশিষ্ট আচরণের ইতিহাস। এটা আমাদের জন্যে হতে যাচ্ছে দুঃখ আর হতাশার আরেক অধ্যায়। আমরা চাইলেও ভুলতে পারব না সেটা, ভুলতে চাইলে বার বার মনে করিয়ে দেবে ইতিহাস!
কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো? আদতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনি যে পরাজয় হয়েছে সেটাকে তারা রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে বলেই বিপত্তি। হাই কোর্টের রায়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হয়েছিল, আপিলের রায় হাই কোর্টের রায় বহাল রেখেছেন- এখানে রাষ্ট্রপক্ষের আইনি দুর্বলতার বিষয়টি আলোচনায় আসার দরকার ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। উল্টো রাষ্ট্রপক্ষের আইনি ব্যর্থতা ঢাকা হয়েছে রাজনৈতিক পরাজয়ের ছকে। উদ্দেশ্যবিহীন ও অনুল্লেখ্য অভিযোগ এনে আক্রমণের বিষয়বস্তু করা হয়েছে প্রধান বিচারপতিকে। অথচ সরকারের এটা জেনে নেওয়ার দরকার ছিল এখনও তাদের আইনি পথ খোলা ছিল। তারা বলছেনও রিভিউ করবেন, কিন্তু একইভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন আক্রমণাত্মক বক্তব্য।

প্রধান বিচারপতি আদালতে পাকিস্তানের উদাহরণ টেনেছেন বলে যারা এরমধ্যে ‘পাকিস্তানপ্রেম’ দেখেছেন তাদের অনেকেরই হয়ত জানা নাই এক দেশের বিচারিক ঘটনা অন্য সকল দেশের বিচারিক ঘটনার সাথে তুল্য হতে পারে। আমাদের দেশের অনেক রায়ে ভারত-পাকিস্তানসহ অনেক দেশের রায়ের ইতিহাস এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবেই। এখানে কোন বিশেষ দেশের প্রতি প্রেম কিংবা বিরাগের বিষয় নয়; এটা অনেকটা রীতি। এখানে অপ্রাসঙ্গিক, অহেতুক সমালোচনা নিজের অজ্ঞতা প্রকাশের উপকরণ ছাড়া আর কিছু নয়।
হ্যাঁ, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র একাত্তরে আমাদের প্রতি তাদের নৃশংসতাসহ তাদের নীতি এবং অন্য অনেক কিছুর কারণে ঘৃণিত; এটা আমাদের আবেগও। আমরা অনেক সময় তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কচ্ছেদেরও দাবি জানিয়েছি। আমাদের আবেগে সরকার সাড়া দেয়নি, তারা বাস্তবতায় থেকেছে, তাই সম্পর্ক চলমান। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতও আমাদের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, সরকারি সংবাদ সংস্থা, টেলিভিশনও সে সংবাদ প্রকাশ-প্রচার করে। অর্থাৎ সম্পর্ক স্বাভাবিকই। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা সরকার ও সরকার প্রধানের এমন কার্যক্রমকে যদি ‘পাকিস্তানপ্রীতি’ হিসেবে না ভেবে স্বাভাবিক হিসেবেই ভাবে তাহলে প্রধান বিচারপতির প্রতি এ বৈষম্য কেন? ‘যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা’ এ প্রবাদ বাক্য তবে কি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়ে গেল?
এসব করে আদতে লাভ নাই। আখেরে দেশের ক্ষতি। অনেকেই জানে সেটা, তবু মানে না। কারণ তারা যে দলের কাছে নিজেদেরকে দায়বদ্ধ ভাবে তারা তাদের অবস্থান পাল্টালে হয়তো এরাও পাল্টে যাবে।
প্রধান বিচারপতি ‘পাকিস্তান’ শব্দ উচ্চারণে ‘পাকিস্তানপ্রীতি’ দেখিয়েছেন; তিনি নওয়াজ শরিফের পরিণতি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করেছেন এমন অপপ্রচারে মত্ত যারা তাদের অনেকেই হয়তো কবি শামসুর রাহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতা পড়েছেন। ওই কবিতায় কান চিলে নিয়ে গেছে বলে যে ধুন্ধুমার কাণ্ড লেগেছিল ‘ছোট এক ছেলের’ কথায় সবাই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দেখেছিল কান যেখানে ছিল সেখানেই আছে। আফসোস, রাজনীতি যেখানে জড়িয়ে যায় সেখানে আমরা চিল দেখি কেবল, ‘ছোট ছেলে’ খুঁজে পাই না, আর কানের অবস্থানে কান খুঁজি না!
রাজনীতিবিদ ও রাজনীতি-অনুকরণ প্রিয়দের বাস্তবে ফেরাতে আমাদের পণ্ডশ্রমের সেই এক ‘ছোট ছেলে’ দরকার! কোথায় পাব সে ‘ছেলে’?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








