মানব ভুবনে এই ২০১৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এক বিশেষ ‘কান্দন-আহাজারি’ দেখা গেলো একখানে। ঘটনাক্রমে, স্থানক্রমে ১৯৪৭ থেকে এটি হলো ‘পাকিস্তান’। সেখানটিতে যে ‘কান্দন’ দেখা দিয়েছে সেটির নাম দেয়া যেতে পারে ‘পাকিন্দন’। সেখানটিতে যে ক্ষিপ্ত-ক্ষুব্ধ নাচন দেখা দিয়েছে, তার নাম দেয়া যেতে পারে ‘পাকিচন’।
‘পাকিন্দন-পাকিচন’ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা তুললে যেতে হয় এসবের শিকড়ে। আমাদের উপমহাদেশটি হলো সনাতন ধর্মের প্রজনন ভূমি। সেই ধর্মের অনুসারীদের সামাজিক বিভক্তিতে গড়ে উঠলো বর্ণপ্রথা। নিম্নবর্ণের প্রতি উচ্চবর্ণের হিংস্র ঘৃণায় উপমহাদেশীয় সমাজ ভরে উঠলো তিক্ততায়। অসাম্য-বৈষম্যের বর্বরতায়। বর্ণনিপীড়িত মানুষগুলোর অনেকে উপমহাদেশের বাইরে থেকে আসা ধর্মপ্রচারকদের তুলনামূলক সমতার বানীতে খুঁজে পেলো বর্ণনিপীড়ন থেকে বাঁচার আপাত পথ। উপমহাদেশে কোটি কোটি ইসলাম ধর্মাবলম্বীর এই হলো পেছনের মোদ্দা কথা।
ক্ষমতাবিচারে শতধাভিক্ত ভারতে সম্পদলুণ্ঠনের বাসনায় ইংরেজ, ওলন্দাজ, ফরাসী, পর্তুগীজ প্রভৃতি শক্তি পাঞ্জা কষলো। জিতলো ক্লাইভের ইংরেজ। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭। দেশভাগে ইংরেজ উপমহাদেশ থেকে ভেগে বাঁচলো। কিন্তু যাবার আগে বাঁধিয়ে গেলো ল্যাঠা। উপমহাদেশের সমাজ হিন্দু-মুসলমানের ভিতর ধর্মীয় ভিত্তিতে সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে দেখেনি শত শত বছর। অথচ বিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে মুসলমান আমির-ওমরাও-অমাত্যবর্গের সাথে ইংরেজ শাসকদের গোপন বন্ধন হলো। সাম্প্রদায়িক বিভাজনে কলংকিত হলো উপমহাদেশ। হিন্দু-মুসলিম মিলনের অগ্রদূতদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো মুসলমানদের পৃথক বাসভূমি ‘পাকিস্তান’ দাবির সুনামি- তোড়ে।
না, বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চলের পশ্চিম পাকিস্তান অঞ্চলের কোথাও গণভোটে ‘পাকিস্তান-প্প্রস্তাব’ জেতেনি। বিপুল সংখ্যায় গণভোটে ‘পাকিস্তান’-এর পক্ষে ভোট দিলো পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলমান।
১৯৪৭-এ দেশভাগে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম। আমরা পূর্ব বাংলা থেকে পরিণত হলাম পূর্ব পাকিস্তানে। ভেবেছিলাম হাজার বছরের দারিদ্র্য, অবজ্ঞা, ঘৃণা, অন্যায়, অবিচার, অসাম্য থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেলো পূর্ব বাংলার ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ মুসলমানেরা।
উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণের সামাজিক আধিপত্য দেখেছি। কিন্তু তখনও ভাবিনি পাকিস্তানের পাঞ্জাবকেন্দ্রিক জমিদার-আমলা-ধণাঢ্য উচ্চবর্ণের মুসলমানরা বাস্তবে কতোটা কদর্য, হিংস্র,বর্বর, নিষ্ঠুর-নৃশংস! গোটা পাকিস্তানে আমরা বাংলার জনগণ ছিলাম ছাপান্নো ভাগ। অথচ আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতি-শিক্ষা সবকিছুতেই পাঞ্জাবি শাসকদের মহাদাপট। শুরুতেই ওরা আমাদের মায়ের ভাষা ‘কাইড়া’ নিতে চাইলো।
কিন্তু ওরা বাঙালির ‘বিদ্রোহের ইতিহাস’ অধ্যায়টি পড়েনি। হাজার বছরের শির উঁচু করা বাংলা প্রান্তরের অস্থি-মজ্জার খবর রাখেনি। পাকিস্তান সৃষ্টির ঊষাকালেই তাই পৃথিবীকে চমকে দেয়া ভাষা সংগ্রামে আমরা বাঙালিরা আত্মদানের অমর ইতিহাস গড়ে তুললাম। আজো একুশে আমাদের রক্তে স্পন্দন জাগায় মহাকালের।
ভাষা থেকে ভূমি। দ্রুত ভুল ভাঙলো অধিকাংশ বাঙালির। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগে কার্যত মঙ্গল হয়নি। এবার উচ্চবর্ণের পাঞ্জাবী শাসক আর তাদের বাঙালি চেহারাধারী অনুচরদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ভূমির স্বপক্ষে ধারাবাহিক সংগ্রাম। আমাদের মহাসৌভাগ্য। এমনি পরিস্থিতিতে আমাদের গভীর থেকে গড়ে উঠলেন একজন সাধারণ মানুষ, অসাধারণ যাঁর সাহস এবং নের্তৃত্ব। তিনি শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা।
এক দুনিয়া কাঁপানো মুক্তিযুদ্ধে আমরা সাধারণ বাঙালিরা সাহসের সুবর্ণরেখা আঁকলাম। পদ্মা-মেঘনা-যমুনাসহ শতনদী আর বঙ্গোপসাগরে বাঙালির রক্তধারা মুক্তিসংগ্রামের পবিত্র ইতিহাস গড়লো। এ সময়ে পাকিস্তানি দানবদের সঙ্গে বাঙালি চেহারার দানবদের সহযোগে যে হিংস্র- বর্বরতার রোমহর্ষক অধ্যায় সৃষ্ট হলো, তা-ও অবর্ণনীয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের পক্ষে ছিল মার্কিনি শাসকগোষ্ঠীসহ অনেকে। আমাদের পক্ষে ছিল ভারত-সোভিয়েতসহ পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ। দুঃখজনক হলেও সত্য, গণচীন, শ্রীলংকাসহ নানা দেশের সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিলো। গণচীনের বুলেটে বিদীর্ণ হয়েছে সহযোদ্ধাদের শরীর। হা! চেয়ারম্যান মাও সে তুং! হা!
মাত্র নয়মাসের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক পর্ব আমাদের তেমনভাবে বিশোধিত করতে সক্ষম হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে উপযুক্ত ভূমিকা পালনের সুযোগ হতে না হতেই মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল অংশ বিগড়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেলো। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে যারা দুশমনের চর হিসাবে কাজ করছিলো, তারা কিসিঞ্জার হেনরীর পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়ে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে অপহরণ করলো।
অপহৃত বাংলাদেশকে উদ্ধারের নবপর্বের জটিল লড়াইয়ে আমরা নিয়োজিত আছি। বুদ্ধিমান নানাপ্রকারের পণ্ডিতেরা হাজারো গালমন্দ দিতে পারেন আয়নায় নিজেদের চেহারা না দেখেই, বাস্তবে শত দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমাদের বর্তমান পর্যায়ের সংগ্রামের মূল নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যাই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের উপযুক্ত বিচারের দেশীয় অংশ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার আন্তর্জাতিক অপরাধীদের বিচার করার সাধ্য আমাদের নেই।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাণ্ডাদের বিচার আমরা শুরু করতে পেরেছি কতোকাল পর। দেশি যুদ্ধাপরাধীদের কিঞ্চিৎ বিচার আমরা করেছি। কিন্তু পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে যারা বেঁচে আছে তাদের বিচার করার সাধ্য আমরা আজো অর্জন করতে পারিনি। পাকিস্তানে আটকা পড়া বাঙালিদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু অনেক চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের পাকিস্তানে চলে যেতে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকিস্তান থেকে ন্যায্য হিস্যা এবং ক্ষতিপূরণ আমরা আদায় করতে পারিনি। সেসব পরিস্থিতি, সেসব পটভূমি বাছবিচার না করে অনেকে এখন নানা ফুড়ংন-ফাড়ং বক্তব্য দিতে পারেন, বঙ্গবন্ধু নের্তৃত্বকে খাটো করার জন্য কতো রকম বয়ান দিতে পারেন, এসব আবর্জনা-বক্তব্য ইতিহাসের ধোপে কখনোই টিকবেনা।
১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধু হত্যা উত্তর বাংলাদেশে দুই জেনারেলের আশ্রয় প্রশ্রয়ে, প্রণোদনায়, প্রযোজনায় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আলবদর-রাজাকার-শান্তি কমিটিওয়ালাদের পুনঃসামাজিক রাজত্ব সৃষ্টি হয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেল চকচক কাঞ্চনে গড়ে উঠে ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তির বিরাট সাম্রাজ্য। এমনি কঠিন বাস্তবতায় যে এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করা সম্ভব হবে, তা ছিল অভাবনীয়, অকল্পনীয়। ওরাতো মনে করেছিলো, আমাদের দেশটিকে ওরা ‘বাকিস্তান’-এ পরিণত করে ফেলবেই।
আসলে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধটি চলছে, চলবেই। ১৯৪৭ এর দর্শন ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের’ যে প্রভাব ও ভিত্তি তাকে দুর্বল করা এতো সহজ ছিলো না, সহজ নয়। মানুষের মনের ভিতর ধর্মের সুঁড়সুড়ি এখনো যেভাবে কাজ করে চলেছে, তা ভাবাই যায় না। দ্বিজাতিতত্ত্ব বিচারে এখন উপমহাদেশে তার জয় জয়ডংকা। এমনি পরিস্থিতিতেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির রায় কার্যকর করা কতটুকু কঠিন, তা এদেশের সংগ্রামের সাথী অনেকেই বুঝতে পারেননা। সব দাবী ওই হাসিনার কাছে, সব দোষ বুঝি হাসিনারই!
সম্প্রতি যে দু’জন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হলো, তাদের একজনকে ‘তুচ্ছতা প্রদর্শনকারীর মুখভঙ্গীর’ প্রতিযোগিতায় বিশ্বসেরা পুরস্কার দেয়া যেতো। নিষ্ঠুরতায়, হিংস্রতায়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রদর্শনে, বেয়াদবিতে, রুচিবিচারে এমন দ্রব্য আসলে পৃথিবীতেই দুষ্প্রাপ্য। সে ছিলো এদেশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের এক নম্বর খুঁটি। আর দ্বিতীয় জনতো আলবদরীয় হিংস্রতার অণুপরমাণুতে ভরপুর এক বেলেহাজ প্রবর। এসব ‘যুদ্ধাপরাধ-ফুদ্ধাপরাধ কোথায় উড়ে যাবে’ এমন ছিলো তার দম্ভোক্তি। দু’জনেরই একই সময়ে একই প্রযুক্তিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার বিষয়টি অনেকের কাছেই ‘বিস্ময়কর’ এবং ‘সাহসী দৃঢ়তার পরিচায়ক’ বলে মনে হয়েছে।
এবার চাঁদ (মুন) জাতিসংঘ থেকে বিষন্ন বার্তা দেয়নি। এবার কেরী মিয়া ‘টেলিফোনে-বাঁধা’ সৃষ্টি করেনি। বলতে গেলে কেউ কিছু বলেনি। না, সৌদি আরবও না।
এবার ‘পাকিস্তান আদর্শের দুই মহান সিপাহসালার’-এর এমন ‘যুগপৎ মহাপ্রস্থানে’ খোদ পাকিস্তানে বয়ে গেছে, মহাকান্দন, মহাবেদন আর ক্ষুব্ধতার ক্ষিপ্ত নাচনের কান্ড। ওদের প্রতিক্রিয়া এমন পর্যায়ে গেছে যে, এক সময়ে ওরা বলেছে, ১৯৭১-এ ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ কোনরকম ‘গণহত্যাই’ হয়নি।
আসলে এমন কথা বলছে যারা, ওদের বক্তব্যের পশ্চাদ্দেশ উন্মোচন করে ইতিহাসের চাবুক দিয়ে এমন কষে আঘাত হানা প্রয়োজন যেন ওদের কান্দন আর নাচন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
পৃথিবী থেকে তাহলে ‘পাকিন্দন’ আর ‘পাকিচন’ ব্যাপার দু’টি চিরতরে অবলুপ্ত হয়ে যেতো!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







