রাসেল মাহমুদ: অপেক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে। আগামী জুনেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন কর্তৃপক্ষ। এখন চলছে সেতুর নামফলক, ম্যুরালসহ রাস্তার মার্কিং করার কাজ।
মূল সেতুর কাজ ইতোমধ্যে ৯৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে ৪০ ফুট উচ্চতার দু’টি ম্যুরাল নির্মিত হচ্ছে। দু’টি ম্যুরালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি থাকবে। মাওয়া প্রান্ত থেকে সংযোগ সেতুর বাকি অংশের কার্পেটিংয়ের প্রস্তুতিও চলছে জোরেশোরে।
পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আগামী মাসে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের জন্য আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এখন চলছে বিশেষ প্রস্তুতি। এছাড়া সেতুর নামফলক, ম্যুরাল এবং অন্যান্য যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো খুবই ছোট কাজ। যা আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে সব শেষ হয়ে যাবে। এখন পর্যন্ত মূল পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ। আর সার্বিক অগ্রগতি সাড়ে ৯৩ শতাংশ।’
পিচ ঢালাইয়ের কাজের অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মূল সেতুর ওপরে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। সেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচলের জন্য এখন সেতু পুরোপুরি প্রস্তুত।’
কবে নাগাদ উদ্বোধন হতে পারে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জুনের শেষে উদ্বোধনের জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এখন সরকার যখন ঘোষণা দেবে আমরা তখনই সেতু বুঝিয়ে দিবো।’
সেতুতে বাতি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে গত মাসেই। এখন চলছে ল্যাম্পপোস্টে বিদ্যুৎসংযোগ দেওয়ার কাজ। এই কাজও এই সপ্তাহে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। শুধু বাকি আছে লাইনে মিটার বসানো আর সংযোগ দেওয়া। এই মাসের শেষের দিকেই সেতু আলোকিত হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যদিও এখন কোথাও কোথাও টেস্ট চলছে।
আরও জানা গেছে, সেতুতে এখন বাকি আছে সাইন, সংকেত ও মার্কিং বসানোর কাজ। এটা ২০ মে থেকে শুরু হবে। আর সেতুর সীমানা দেয়ালের ওপর স্টিলের রেলিং বসানোর কাজও বাকি আছে। এটাও ২০ মে থেকে শুরু হবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকায় সেতুতে রেল চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদিও এখনও রেললাইন বসানো শুরু হয়নি। পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চালু হওয়ার পর সেতু কর্তৃপক্ষ রেল লাইন বসানোর জন্য রেল কর্তৃপক্ষকে সেতুটি বুঝিয়ে দেবে। আগামী জুলাইতে রেল কর্তৃপক্ষকে সেতু বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আর সেতুর ওপর রেললাইন বসাতে মাস ৬ এর মতো সময় লাগবে বলে জানা গেছে।
সেতু বিভাগ থেকে পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচলের জন্য টোল চূড়ান্ত করা হয়েছে। মোটরসাইকেল পারাপারে টোল দিতে হবে ১০০ টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ৭০টাকা), কার ওজিপের টোল দিতে হবে ৭৫০ টাকা (ফেরিতে যা বর্তমানে ৫০০ টাকা), পিকআপ পারাপারে টোল দিতে হবে ১২০০ টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ৮০০ টাকা), মাইক্রোবাস পারাপারে টোল দিতে হবে ১৩০০ টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ৮৬০ টাকা), ছোট বাস পারাপারে টোল দিতে হবে ১৪০০ টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ৯৫০ টাকা), মাঝারি বাস পার হতে টোল দিতে হবে ২০০০ টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ১৩৫০ টাকা), বড় বাসের টোল দিতে হবে ২ হাজার ৪০০ টাকা (ফেরিতে যা এখন ১৫৮০ টাকা), ছোট ট্রাকের টোল দিতে হবে (৫টন পর্যন্ত) ১৬০০ টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ১০৮০ টাকা), মাঝারি ট্রাকের টোল দিতে হবে ২১০০ টাকা (ফেরিতে বর্তমানে ১৪০০টাকা),মাঝারি ট্রাক (৮-১১ টন টোল দিতে হবে ২৮০০ টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ১৮৫০ টাকা) আর ট্রাক ( ৩ এক্সেল পর্যন্ত) টোল দিতে হবে সাড়ে ৫ হাজার টাকা (বর্তমানে ফেরিতে ৩৯৪০ টাকা।
পদ্মা সেতুর (মূল সেতু) দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। দুই প্রান্তের উড়ালপথ (ভায়াডাক্ট) ৩.৬৮ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯.৮৩ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চালের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন হবে। মাওয়া ফেরি ঘাট এবং দৌলদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটে মানুষের দুভোর্গ কমবে।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। এরপর পর একে একে ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়েছে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর।
মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদী শাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। দু’টি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হয়েছে সেতুটি।








