খুব সৃজনশীল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক আবু সাইয়ীদ। অসম্ভব মেধাবী এক মানুষ। সীমিত সাধ্যের মধ্যে অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। আর জীবিকার জন্য টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করেছেন অনেক।
আমাদের ঈষৎ অগ্রজ বন্ধু তিনি। আড্ডা অন্তপ্রান। প্রচুর লেখাপড়া করেন। প্রচুর পরিমাণে দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র দেখেছেন। নিত্য নতুন পরিকল্পনা তার মাথায়। সৃজনশীলতার অস্থিরতায় তিনি চঞ্চল। সারাক্ষণ নতুন কথা। আর জ্ঞান ভান্ডার তিনি। রাজনীতি থেকে অর্থনীতি সমাজনীতি থেকে নতুনত্ব, সেক্স থেকে ইতিহাস- সব সম্পর্কেই তার কিঞ্চিত জানাশোনা আছে।
খুব আড্ডাপ্রিয় তিনি। বন্ধুত্বের মূল্য তার কাছে অনেক বড়। আড্ডায় বহুবার পানরত অবস্থায় তার সঙ্গে হাতাহাতি পর্যায়ের ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু সে সব তিনি মনে রাখেন না। পরমুহূর্তেই বন্ধুত্বের গাঢ় বন্ধনে তিনি আবিষ্ট করে রাখেন। এক আশ্চর্য মানুষ তিনি। বামপন্থী চিন্তাধারার মানুষ। সাইয়ীদ ভাই খুব সাধারণভাবে জীবন যাপন করেন। পোশাকি আড়ম্বর নাই। নিজের সফল কর্ম নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেন না। অকারণ অহংকার নাই তার। প্রাণখোলা এক মানুষ। সাইয়ীদ ভাইয়ের সঙ্গে চ্যানেল আইতে কিংবা আমার অসংখ্য আড্ডার স্মৃতি এই মুহূর্তে মনে পড়ছে।
আবু সাইয়ীদ সবকিছু খুব পরিমিত। পান করবেন মাপ মতো। ভোজনের ব্যাপারে খুব বিশুদ্ধবাদী। এখন তিনি পুরোপুরি নিরামিষভোজি। সামান্য ডাল ভাত হলেই তার আহার সমাপ্ত হয়। তিনি শ্রোতা হিসাবে যেমন তুখোড়, তেমনি বক্তা হিসাবেও দুর্দান্ত। শোনেন বেশি বলেন কম। প্রকৃত জ্ঞানীর লক্ষণ। তার সৃজনশীলতা নিয়ে অনেক ক্লাসনোট লেখা যায়। যেমন তিনি সংযোগ নামে একটা প্রজেক্ট চালু করেন। এক হাজার টাকা দিয়ে একটা কুপন কিনতে হবে। আর যারা বেশি অর্থ দেবে তাদেরও সংযুক্ত করা হবে। সেই অর্থ দিয়ে জনগণের অংশগ্রহণে একটা ফিল্ম নির্মাণ করবেন। সাধারণ মানুষেরকাছ থেকে টাকা তোলা কতোটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। কিন্তু সাইয়ীদ ভাই অসম্ভব ধৈর্যশীল, স্বপ্নবান এবং কর্মিষ্ঠ মানুষ। তার উদ্যোগ সফল হয়েছে। দুটো ছবি নির্মাণ করে ফেলেছেন।
সাইয়ীদ ভাইয়ের গত পাঁচ বছর ধরে একটাই অভীষ্ট লক্ষ্য রাস্তার যানজট মুক্ত করতে হবে। তিনি চলমান রাস্তার আইডিয়া করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে তার এই প্রজেক্ট গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ সরকারও খুব গুরত্বের সঙ্গে চলমান রাস্তার বাস্তবতা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। সাইয়ীদ ভাই এই প্রজেক্টের খাঁটি বিজ্ঞানী। যদি বলি তবে বেশি বলা হবে না। তিনি এই প্রজেক্ট করতে যন্ত্র প্রকৌশল পড়েছেন। তিনি এখন পুরোদস্তুর প্রকৌশলী। লক্ষ লক্ষটাকা খরচ করে ধোলাইখালে ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস দোকানে দৌড়াদৌড়ি করে যান্ত্রিক মডেল তৈরি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই চলমান রাস্তার মডেল দেখার ইচ্ছে পোষণ করেছেন। সাইয়ীদ ভাই খুব ধৈর্যশীল মানুষ। আমরা হয়তো পরিহাস করেছি। কি মিয়া চলমান রাস্তা নিয়া পাগলামি করছেন। ছাড়েন এইসব।
সাইয়ীদ ভাই সব শুনে মৃদু হাসলেন। বললেন, ব্যাপারটা না বুঝেই চিল্লায়েন না। বাঙালির এই এক স্বভাব দোষ। না বুঝেই খালি খালি মনগড়া কথা বলে। তারপর শুরুহয় সাইয়ীদ ভাইয়ের যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনা। তার যুক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হই। সাঈয়ীদ ভাইয়ের স্বপ্নের কোনো শেষ নেই। চলচ্চিত্রের তিনি পূর্ণাত্মা। চরিত্রের মধ্যে ষোল আনা চলচ্চিত্রকার যে কোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন। রাত জেগে নেশাখোরের মতো কাজ করেন। কাজে তার ক্লান্তি নেই। ফিল্মের কাজও প্রায় একাই সামলান। সহকারির উপর তার কোনো আস্থা নাই। সাইয়ীদ ভাইয়ের একটা খুব ভালো গুণ হচ্ছে তিনি খুব আপ টু ডেট। কারা ভালো নাটক বানাচ্ছে, কারা ভালো সম্ভাবনাময় চিত্রনির্মাতা, কোন তরুণী ভালো লিখছে, কে গান ভালো গাইছে। কারা ভালো অভিনেতা, অভিনেত্রী, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সমাজ বদলের অনুষঙ্গ, মঞ্চ নাটক, শিক্ষা ব্যবস্থা- সব তার নখদর্পনে।
নিয়মিত হলে গিয়ে ছবি দেখেন। অবসরে টেলিভিশন দেখেন। বই পড়েন মনোযোগ দিয়ে। এক পুত্র সন্তানের জনক তিনি। স্ত্রী তার ছায়াসঙ্গী। সাইয়ীদ ভাই নিজে গাড়ি চালান। সৌখিন রাঁধুনী। সাইয়ীদ ভাই চলচিত্র বোদ্ধা। দুর্দান্তভাবে ভালো ছবি বুঝতে পারেন। দেশে বিদেশে অনেক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছেন। বিনয় তার সহজাত অঙ্গভূষণ। নিরন্তর তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র। জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি: রূপান্তর। ছলচ্চিত্র ছাড়াও অসংখ্য টিভি নাটকের নির্মাতা তিনি। তারই দু একটা আলোকণা দেখে নেয়া যাক। মাধুরী ও অন্যান্য, ওংকার, ওথেল, মন্থন। এক সন্ধ্যায় মত্ত আড্ডা চলছে বাসায়। সাইয়ীদ ভাইকে আমরা মজা শুরু করলাম। সে যা বলে আমরা তার বিরোধিতা করি। একসময় সাইয়ীদ ভাই উত্তেজিত হয়ে গেলেন। সাইয়ীদ ভাই শুরু করে দিলেন যুক্তিপূর্ণ আলোচনা। জহির রায়হান কেন কিংবদন্তী হয়ে বসে আছেন? তিনি কোনো বড় মাপের পরিচালক বা লেখক নন।
আমরা তার সাথে একমত হলেও তর্কের খাতিরে বললাম, এসব বইলেন না। মূর্তি নাই, যা দু একটা আছে ভাঙার চেষ্টা কইরেন না। সাইয়ীদ ভাই এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, দুর মিয়া আপনে ফিল্সের কি বুঝেন? লেখেন তো দুই লাইনের ছড়া। আবার বড় বড় কথা কেন?
আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। দু লাইনের ছড়া লিখলেও কথা কইতে তো অসুবিধা নাই। তর্ক জমে উঠল। আড্ডায় ছিল গোলাম রব্বানী বিপ্লব, এনামুল কবির নির্ঝর, আহমাদ মাযহার প্রমুখ। ঝগড়া যখন চরমে হঠাৎ করেই সাইয়ীদ ভাই শান্ত হয়ে গেলেন। তারপর আমার সাথে হাত মিলিয়ে বললেন, মনে কিছু কইরেন না আমীরুল। মতপার্থক্যই আমাদের শক্তি। সব বিষয়ে যে মত পার্থক্য আছে তা নয় সাইয়ীদ ভাই। আমাদের মতৈক্য ও আমাদের শক্তি। যেমন আপনার বাংলা ভাষার প্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। আমিও বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ভক্ত। সাইয়ীদ ভাই হা হা করে হেসে উঠলেন। হাঁ- আমাদের মতামতই আমাদের শক্তি। এই বলেই আমাদের গ্লাসে গ্লাসে টোকা দিলাম। জয় হোক আমাদের বন্ধুত্বের।








