মানুষ কতটা সভ্য?
উত্তরটা নির্ভর করছে কে প্রশ্নটা করছেন তার ওপর; কিংবা কাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে তার ওপর। যদি প্রশ্নটা করা হয় বাংলাদেশের পেশাদার বিজ্ঞানবক্তা আসিফকে, তাহলে তার উত্তর হবে, ‘আত্মধ্বংসের বোঝা নিয়ে ছুটে চলা’ মানুষের এ সভ্যতা ‘কোনো জাতের মধ্যেই পড়ে না’।
সর্বশেষ বিজ্ঞান বক্তৃতায় এ নিয়েই নিজের চিন্তা দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করেছেন আসিফ। ১ অক্টোবর ঢাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে আয়োজিত ‘মহাজাগতিক এ আসর’ উপভোগ করেছেন শতাধিক বিজ্ঞান-সংস্কৃতি সচেতন ব্যক্তি। দেড় ঘণ্টা দীর্ঘ এ বক্তৃতার শিরোনাম ছিলো, ‘ওরা কেন আসেনি’। একই শিরোনামে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় একটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে ডিসকাশন প্রজেক্টের সহ-উদ্যোক্তা আসিফের।
আসিফ যেমন তার বইতে পাঠককে, তেমনি শনিবারের বক্তৃতায় শ্রোতা-দর্শককে সোভিয়েত জ্যোতির্বিদ নিকোলাই কার্ডাশেভের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক এই গবেষক সভ্যতাকে তিনভাগে ভাগ করেছেন; শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং মহাকাশে গড়া উপনিবেশ মাত্রার ওপর ভিত্তি করে।
যদি কোনো বুদ্ধিমান প্রজাতি নিজ গ্রহের ওপর আছড়ে পড়া নিজ নক্ষত্রের আলোকে (কেউ কেউ বলেন ‘শক্তির স্রষ্টা’কে) সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে তাহলে তার সভ্যতা প্রথম জাতের (টাইপ ওয়ান)। যদি নক্ষত্রটার পুরো আলোকেই সে কব্জা করতে সক্ষম হয় তাহলে তা টাইপ টু সভ্যতা। আর যদি ছায়াপথের সবটুকু আলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে তাহলে সে সভ্যতা হবে টাইপ থ্রি, লেখক আসিফ যাকে বলেছেন, ‘সুপার সিভিলাইজেশন’ বা মহাসভ্য। আত্মধ্বংসের প্রবণতা এড়িয়ে এদের টিকে থাকার সম্ভাবনা শতকরা ৯৯ ভাগ।

আলো নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি মহাশূন্যে ভ্রমণের ক্ষমতার প্রশ্নেও বিশাল তারতম্য রয়েছে তিন জাতের সভ্যতার। আসিফ তার বক্তৃতায় যেমন বলেন, ‘টাইপ ওয়ান সভ্যরা গ্রহ থেকে গ্রহে পাড়ি জমাতে পারবে, সহজেই। আরও সভ্য হলে, মানে টাইপ টু হলে, নিমিষেই এক নক্ষত্র থেকে আরেক নক্ষত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারবে তারা। আর যদি হয় সুপার সিভিলাইজেশন, তাহলে তারা এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সিতে ভ্রমণ করতে পারে দিব্যি। পুরো গ্যালাক্সিতে একই সময়ে অস্তিত্ববান হয় মহাসভ্য এমন প্রাণীরা!’
‘তার মানে দাঁড়াল’, মন্তব্য আসিফের, ‘যে যত সভ্য, সে ততই যাযাবর।’
তাহলে মানুষ কোন পর্যায়ের সভ্যতায় রয়েছে?
আসিফ- এক শব্দের এই নামেই যিনি পরিচিত- বলেন, ‘আমরা তো সূর্যের আলো সরাসরি ব্যবহার করতে পারি না। পুরো নির্ভর করছি উদ্ভিদের ওপর। আমাদের চলছি জীবাশ্ম জ্বালানী দিয়ে। এজন্য কেউ কেউ মানুষের সভ্যতাকে ‘টাইপ জিরো’ বলে অভিহিত করেছেন।’
বর্তমান সময়ের প্রথিতযশা পদার্থবিজ্ঞানী মিচিও কাকু বলেছেন, মানবজাতি ১০০ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে টাইপ ওয়ান সভ্যতায় পৌঁছতে পারে। টাইপ টু সভ্যতায় পৌঁছতে লাগবে হাজার বছর আর টাইপ থ্রি সভ্যতায় পৌঁছতে লাগবে লাখো বছরের বেশি।
কিন্তু যারা নাকি মহাসভ্য, তারা কেন আসেনি আমাদের শ্যামল এ পৃথিবীতে? কেন তারা কার্ল সাগানের ‘নীলাভ মলিন বিন্দু’ এই গ্রহটিকে উন্মোচন করেনি? নাকি তারা এসেছিল, আমরা টের পাইনি? কিংবা তারা আছে আমাদেরই আশেপাশে, কিন্তু আমরা অনুভব করতে পারছি না?
আসিফ তার বক্তৃতায় কী উত্তর করেছিলেন, খানিকটা তুলে ধরেছি এই লেখার তৃতীয় ধাপে।

২. বক্তৃতার সময় আমি ছিলাম আসরের বাইরের নিরাপত্তার দায়িত্বে। যে কারণে বক্তৃতার পুরোভাগ আামি উপভোগ করতে পারিনি। তবে মাঝে মাঝেই উঁকি মেরেছি। স্বচ্ছ কাঁচের দেওয়াল, তার ওপর ডোরা কাটা দাগ। ফলে ওই দেওয়ালটা আমার কাছে একটা জানালার মতো মনে হয়েছিল। দুটো দাগের ফাঁক দিয়ে আসিফকে কথা বলতে দেখছিলাম। পাশেই মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শন হচ্ছে, যার দায়িত্বে ছিলেন ডিসকাশন প্রজেক্টের বিজ্ঞানকর্মী যোয়েল কর্মকার। কখনও কখনও কাঠের দরজাটা আলতো ঠেলে দিয়ে হাওয়া বের হতে দিয়েছি। আর শুনেছি ওই হাওয়ার ভর করে বেরিয়ে আসছে আসিফের চিন্তা, তারারাজিদের গুঞ্জন, প্রকাণ্ড মহাব্রহ্মাণ্ডের হৃদস্পন্দন; সে হাওয়ায় ভেসে আসছিল রবীন্দ্রনাথের ‘আকাশভরা সূর্য তারা’, মোজার্টের প্রাণচঞ্চলা মূর্ছনাও। বক্তৃতায় সুর সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন সুমনা বিশ্বাস, যিনি ঢাকা সিটি কলেজের ইংরেজির শিক্ষক। ডিসকাশন প্রজেক্টের দীর্ঘ ২৪ বছরের পথচলার গল্প শোনান সংগঠনের সহ-উদ্যোক্তা খালেদা ইয়াসমিন ইতি।
প্রশ্নোত্তর পর্বে আমার দায়িত্ব ছিল, দর্শকদের প্রশ্নগুলো সংগ্রহ করা। সেখানে বিচিত্রসব প্রশ্ন দেখা গেছে। খেয়া নামে এক শিশুর প্রশ্ন ছিল, ‘স্পেস কত্ত বড়, এর শেষ কোথায়?’ বক্তা সব প্রশ্নের জবাব দেননি, সময়প্রশ্নে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের ইচ্ছে রয়েছে, দর্শকরা যা যা প্রশ্ন করেছেন সেদিন, শিগগিরই একটা প্রতিবেদনে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব আমরা। নিয়মমাফিক ওইদিন আসিফকে আমি কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ‘ওরা কেন আসেনি’ প্রকাশিত হওয়ার পর লেখককে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘যদি ওরা আসত, এবং সাক্ষাৎ করা যেত, তাহলে আপনি কোন প্রশ্নটা ওদের প্রথমেই করতেন?’
আসিফ বলেছিলেন, ‘সক্রেটিসের সঙ্গে দেখা করতে অ্যাথেন্সে কেন গিয়েছিলেন ডেমোক্রিটাস (আদি পরমাণুবাদের জনক)? আর দেখা না করেই বা কেন তিনি ফিরে গিয়েছিলেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর কি আছে ‘মহাসভ্য’ নাক্ষত্রিক প্রাণীদের কাছে? কী সেই উত্তর?

৩. আসিফ তার বক্তৃতায় কার্ল সাগান ও উইলিয়াম নিউম্যানকে উদ্ধৃত করেন। এ বিজ্ঞানীদ্বয় ‘হিসাব করে দেখেছেন, যদি ১০ লাখ বছর আগে এবং দুই’শ আলোকবর্ষ দূরে অল্প জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার-সম্পন্ন নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ঘুরে বেড়ানো কোনো উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটতো এবং তাদের যাত্রাপথ বরাবর অনুকূল গ্রহগুলোতে উপনিবেশ স্থাপন করে বিস্তার ঘটাতো, তাহলে তাদের অনুসন্ধানী নক্ষত্রযান আমাদের সৌরজগতে প্রায় এখন প্রবেশ করতো। কিন্তু ১০ লাখ বছর হলো সময়ের এক দীর্ঘ পথ। যদি নিকটবর্তী সভ্যতাটি এর চেয়েও নবীন হয়, তাহলে তারা এখনও আমাদের এখানে পৌঁছাবে না। দুই’শ আলোকবর্ষ ব্যাসার্ধের একটি গোলকের মধ্যে ২ লাখ সূর্য (নক্ষত্র) আছে এবং সম্ভবত প্রায় সমসংখ্যক উপনিবেশ স্থাপনের অনুকূল জগৎ আছে। পরিস্থিতির স্বাভাবিক ধারানুক্রমে, প্রায় ২ লাখ জগতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উপনিবেশ স্থাপনের পর তারা বুদ্ধিমান প্রাণী অধ্যুষিত আমাদের এই সৌরজগৎকে হঠাৎ করে হয়তো আবিষ্কার করে ফেলবে।’
আমি যে বিষয়টি এখানে আলাদা করে বলতে চাই, তা হলো, বিজ্ঞানবক্তা আসিফের দর্শন। স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিজ্ঞানী সতর্ক করে দিয়েছেন, যেন ভুল করেও মানুষ ভিনগ্রহীদের কাছে নিজেদের উপস্থিতি, ঠিকানা বলে না দেয়। বিশেষ করে যেসব ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা পৃথিবীর মানুষের চেয়ে প্রাযুক্তিকভাবে বেশি ক্ষমতাধর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত এ বিজ্ঞানী।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আক্রমণ করলে স্থানীয় আদিবাসীরা যেমন বিপাকে পড়েছিল, হকিং বলছেন, যদি অধিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ভিনজাতির সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, তাহলে পরিণতি হবে একই।

কিন্তু আসিফ যিনি তার শৈশব থেকে ‘দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধানে’ কথামালা নিয়ে ছুটে চলেছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, তিনি এমন ধারণা পোষণ করেন যে, ‘দুটি পৃথক গ্রহ থেকে আসা দুটি বিস্তারমান সভ্যতার নিজস্ব প্রয়োজনাদি ভিন্নই হবে। তারা পরস্পরের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। তাদের এই অসম বিস্তার প্রক্রিয়া সংঘাতময় না হয়ে বরং নির্বিবাদী সহ-অবস্থানমূলক হবে। হয়তো গ্যালাক্সির একটি অঞ্চল পর্যবেক্ষণের জন্য তারা একে অপরকে সহায়তা করবে।’
এই মহাজগতে মানুষ ও তার গ্রহ পৃথিবীর অবস্থান নিয়েও আসিফের আগ্রহ আকাশসমান। যে কারণে তিনি সাগানের ‘কসমিক ক্যালেন্ডার’ ফেরি করেছেন হাজার হাজার দর্শকের কাছে। ‘ওরা কেন আসেনি’ এই প্রশ্নের জবাবে তার বক্তৃতায় বক্তা বলেছেন, ‘এমনকি এও হতে পারে যে, কাছাকাছি অবস্থানরত সভ্যতাগুলো ওইরূপ কোনো উপনিবেশ স্থাপনে পৃথক অথবা যৌথ উদ্যোগে লাখ লাখ বছর কাটিয়ে দেবে, আমাদের এই ক্ষুদ্র অদৃশ্যপ্রায় সৌরজগৎটির অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞাত না হয়েই।’
আসিফ প্রশ্ন রাখেন, ‘এটা কি হতে পারে সভ্যতাগুলোর উন্নতির কোনো বিশেষ স্তরে নক্ষত্র অভিযানের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়? তা-ই যদি হয়, আমাদের চেয়ে ১০ লাখ বছরের এগিয়ে থাকা সভ্যতা কি উপনিবেশ স্থাপন অথবা আন্তঃনাক্ষত্রিক অভিযানে আগ্রহী হবে?’
মহাসভ্য ভিনগ্রহীদের নিয়ে আরেকটি অনুমান করেন আসিফ। বলেন, ‘এমনও হতে পারে, তারা আমাদের পাশে এবং অন্তরালেই আছে; কিন্তু বিকাশ উন্মুখ সভ্যতার আপন গতিকে বিঘ্নিত না করার কোনো গ্যালাকটিক বিধি মেনে চলে।’

৪. ‘ওরা কেন আসেনি’ বইটিই ডিসকাশন প্রজেক্টের নতুন ধারার এক বক্তৃতার পথ খুলে দিয়েছে। যেখানে রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি- সবকিছুই উঠে এসেছে বার্তা হিসেবে। ওই বইতে লেখকের ‘শৈশবের মহাকাশ’, ‘বেড়ে ওঠার জল-বাতাস’ এবং ‘মহাজাগতিক জীবনবোধ’ও বিধৃত হয়েছে, সহজ কথায়। এখানে ঠাঁই পেয়েছে নরসিংদীর পাঠান পরিবারের আবিষ্কার প্রাচীন বাণিজ্যনগরী উয়ারি-বটেশ্বর যা আদি বাংলাকে যুক্ত করেছিলো সুদূর রোমের সঙ্গে।
গ্রন্থের মতো বক্তৃতায়ও তিমিদের শৈশব নিয়ে আসিফের ভাবনা মনে দাগ কাটার মতো। বাংলাদেশের ‘প্রকৃতিপুত্র’ দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে জলপথে দক্ষিণভ্রমণের সময় তার আলাপচারিতাও উঠে এসেছে ‘ওরা কেন আসেনি’ বইতে।
সেই দ্বিজেন শর্মাকে দেখা গেল ৬৫তম ওপেন ডিসকাশন ‘ওরা কেন আসেনি’তেও। মূল্যায়ন পর্বে তিনি আসিফের বক্তৃতা নিয়ে এবং তার দীর্ঘ দুই যুগের ভিন্নধর্মী বিজ্ঞান আন্দোলন নিয়ে তার মূল্যবান মত তুলে ধরেন। মূল্যায়ন পর্বে আরও অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আলী আসগর।
বিজ্ঞানচিন্তক আসিফ ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে দর্শনীর বিনিময়ে বিজ্ঞানবক্তৃতা করে আসছেন। এ পর্যন্ত তিনি ১০টি গ্রন্থ লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন আরও ১০টি। তার প্রথম গ্রন্থ ‘এক মহাজাগতিক পথিক’ (সাহিত্য প্রকাশ ২০০১)। তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত ‘বিবর্তনের পথে ইতিহাসের বাঁকে’ গ্রন্থের জন্য বাংলা একাডেমি থেকে হালিমা-শরফুদ্দীন বিজ্ঞান পুরস্কার (১৪২০-১৪২১) পান আসিফ।
ছবি: সুশান্ত সুমিত।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








