স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচিত যুগ্মসচিব আব্দুস সবুর মণ্ডলকে অভিযুক্ত করার মত যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি।
তবে ফেরিটি দেরিতে ছাড়ার জন্য ফেরি ঘাটের দায়িত্বরত তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়ী করেছে অতিরিক্ত সচিব মো. রেজাউল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি।
তিতাসের ঘটনা তদন্তে আদেশ প্রদানকারী হাইকোর্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে বৃহস্পতিবার এই তদন্ত প্রতিবেদন এসেছে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেছেন, অবকাশের পর এই প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে যে তিনজনকে দায়ী করা হয়েছে তারা হলেন- ঘাট ম্যানেজার মো. সালাম হোসেন, প্রান্তিক সহকারী মো. খোকন মিয়া এবং উচ্চমান সহকারী ও গ্রুপ প্রধান ফিরোজ আলম।
এ তদন্ত প্রতিবেদনে যুগ্মসচিব আব্দুস সবুর মণ্ডলকে অভিযুক্ত করার মত যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘তিনি (যুগ্মসচিব) জানতেন না যে মুমুর্ষ রোগী অপেক্ষা করছে।’
অন্যদিকে এই তদন্ত প্রতিবেদনে সাত দফা সুপারিশ রাখা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-
১. ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া ও পৌঁছানোর সময় মাষ্টারকে অবশ্যই স্থায়ী লগ বুক/রেজিস্টারের সময় লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।
২. ফেরি ঘাটে ভিড়িয়ে ফেরির র্যাম্প উঠিয়ে কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য কোনোক্রমে অপেক্ষা করা যাবে না।
৩. নীতিমালা অনুযায়ী ভিআইপি সুবিধা চেয়ে কেউ ফেরি পারাপার হতে চাইলে তাকে অবশ্যই তার সরকারি ভ্রমণ বিবরণী পূর্ব হতে ফেরি কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠাতে হবে। তবে জরুরী প্রয়োজনে পূর্বে যোগাযোগ সাপেক্ষে ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এ নিয়মের শিথিল করা যেতে পারে।
৪. অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স/গাড়ী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে ফেরিঘাটে পারাপারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. প্রত্যেক ঘাটে ও ফেরিতে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে গাড়ী ও ফেরি পারাপারের বিষয় সমূহ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৬. ফেরিঘাট ও ফেরিতে কর্মরত সকলের নাম ট্যাগসহ নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করতে হবে।
৭.ফেরিঘাট ও ফেরিতে জরুরী গুরুত্বপূর্ণ মোবাইল নাম্বার সমূহ প্রদর্শন করতে হবে।
এর আগে তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় নিয়ে করা রিটের শুনানি নিয়ে গত ৩১ জুলাই বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের রুল সহ আদেশ দেন। হাইকোর্ট তার রুলে তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে কেন ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না তা জানতে চান।
সেই সাথে তিতাসের মৃত্যুর ঘটনাটি একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশ দেন। তবে হাইকোর্টের এই নির্দেশের আগেই এ ঘটনা তদন্তে কমিটি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেই প্রতিবেদনই হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে।
গত ২৫ জুলাই রাতে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি এক নম্বর ফেরিঘাটে সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আব্দুস সবুর মণ্ডলের গাড়ির অপেক্ষায় প্রায় তিন ঘণ্টা ফেরি বসে থাকায় ঘাটে আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্সে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যু হয় বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিতাসের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
তিতাসের মারা যাওয়ার বিষয়ে তার বড় বোন তন্নীসা ঘোষ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখে দ্রুত ঢাকায় পৌঁছাতে অর্ধলক্ষ টাকায় ভাড়া করা হয় আইসিইউ সংবলিত অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সটি ঘাটে এসে থামে ওইদিন রাত আটটার দিকে। পরে ঘাটে ফেরি পারাপারের জন্য তাঁরা ঘাট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য, এমনকি জরুরি সেবা ৯৯৯ ফোন করেও সাহায্য চান। কিন্তু কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি। তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকার পরে রাত পৌনে ১১ টার দিকে ভিআইপি সাদা রঙের একটি নোয়া মাইক্রোবাসটি ফেরিতে ওঠার পরে ফেরিটি ছাড়া হয়। ফেরিটি ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই মাঝ নদীতে মারা যায় তিতাস।’
এরপর মানবাধিকার সংগঠন লিগ্যাল সাপোর্ট এন্ড পিপলস রাইটস’র চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জহিরুদ্দিন লিমন তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করেন। সেই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি এফআরএম ন্যায্যমূল্য আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল সহ আদেশ দেন।








