২৫ মার্চের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিদের্শনা অনুয়ায়ী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন অনেকেই। ছিলেন শোবিজের তারকারাও। অনেকে জীবনের মায়া ভুলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কেউ কেউ অংশ নিতে না পারলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। শুধু তাই নয় অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পাশাপাশি কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের সময় কিংবা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন তাদের কাজের মধ্য দিয়ে। এমনই কজন তারকার সঙ্গে কথা বলেছে চ্যানেল আই অনলাইন। তাদের জবানীতে নিয়ে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
আমি প্রথমত একজন মুক্তিযোদ্ধা, তারপর নির্মাতা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। একটি ‘গেরিলা’, অন্যটি ‘একাত্তরের যীশু’। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি হচ্ছে একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়াটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা। ২৬ মার্চের পরই আমি আগরতলায় চলে যাই প্রশিক্ষণ নিতে। তারপর দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, দ্বিধাহীন মুক্তিযোদ্ধা।

ফারুক, মুক্তিযোদ্ধা ও অভিনেতা
২৫ মার্চের রাত ছিল ভয়াল কালোরাত। যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দেখেনি, সে স্বাধীনতাযুদ্ধ দেখেনি। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বরে দেখা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। তিনি সবাইকে জানিয়ে দিলেন যার যার জায়গায় চলে যেতে।
এরই মধ্যে পাকসেনারা রোকেয়া হল, পুলিশ লাইন তছনছ করে ফেলেছে। নির্বিচারে গণহত্যা করছে। বিভিন্ন হল থেকে সিনেমা দেখে যারা বের হয়েছে, তাদের অধিকাংশকেই মেরে ফেলা হয়েছে। এ সময় আমরা মনোবল হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ি। কিন্তু তারপরও মনে জেদ চেপেছিল যে, শেষ দেখব। কারণ নেতাকে কথা দিয়েছি। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় তখন আমরা ছিলাম ক্ষুদিরাম, আমরা ছিলাম সূর্যসেন।
ইংলিশ রোডের নিশাত ফাঁড়ির সব আর্মস নাদেরকে দিয়ে দেওয়া হয়। তারা বাঙালি ছিল বলে স্বেচ্ছায় সব আর্মস দিয়েছিল। অবশ্য স্বেচ্ছায় না দিলে আমরা অস্ত্র লুট করতাম। ২৫ মার্চের পর টাকা পয়সার সঙ্কট দেখা দেয়। অস্ত্র, খাদ্য কেনার জন্য নাদের একটি ব্যাংক ডাকাতি করতে বাধ্য হয়। নাদের বলেছিল, খাওয়ার জন্য ব্যাংক ডাকাতি করিনি, করেছি যুদ্ধের জন্য অস্ত্র কিনতে হবে তাই। সে আরও কিছু অপারেশন করেছিল। সেই অপারেশনগুলোতে আমাকে নেয়নি। সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতো, আমি মরে গেলেও তুই যেন বেঁচে থাকিস।
আমি কম করে হলেও ২০০ ইপিআরকে বাঁচিয়েছি। আরও অনেক স্মৃতি আর ইতিহাস আছে মুক্তিযুদ্ধের। যেটুকু বললাম এটুকু অতি সামান্য অংশ।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ধ্বংসযজ্ঞের পর ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে আমি বাইসাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, পলাশী ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ, রোকেয়া হল ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের চারদিকে ঘুরে অসংখ্য লাশ দেখে ভেতরটা কেঁপে উঠে। তখনই সিদ্ধান্ত নেই, প্রতিশোধ নেব।
২৭ মার্চ বিকেলে এক বিহারির বাসায় ঢুকে বন্দুক ছিনতাই করি। তারপর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ছোট একটি দল গঠন করি। সজীবকে করি সেই দলের প্রধান। আমাদের এই দলটি কয়েকজন বিহারির বাসা থেকে কিছু অস্ত্র ছিনতাই করে জিঞ্জিরায় প্রথম ক্যাম্প গঠন করে। কিন্তু সেখানে হামলা করে পাকিস্তানি সেনারা। টিকতে না পেরে জায়গা পরিবর্তন করে পইট্টায় চলে যাই।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আমি দলছুট হয়ে ভারতের আগরতলা হয়ে মেলাঘরে চলে যাই প্রশিক্ষণ নিতে। সেখান থেকে আবার ঢাকায় এসে সেখানে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় ফিরে সজীব বাহিনীতে যোগ দেই। তারা তখন লালবাগ এলাকায় কাজ করতো।
২৯ অক্টোবর আমি আবারও সহযোদ্ধা মানিক, মাহবুব ও সারোয়ারকে নিয়ে ভারতে যাওয়ার সময় কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝামাঝি চেকপোস্টের কাছে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ি। আমাদেরকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে তিন ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালায়। পরে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে আলাদা করে ফেলা হয়। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন আলী রেজার কাছে। আলী রেজা অকথ্য ভাষায় গালাগাল দেন। পরে আবার চারজনকে একত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে পাঠানো হয়।

রাইসুল ইসলাম আসাদ, মুক্তিযোদ্ধা ও অভিনেতা
১৯৭১ সালে আমি ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ করেছি এটা আমার জন্য বড় কিছু নয়। আমি দায়িত্ববোধ থেকে যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধের পরপর আবার নিজের কাজে যুক্ত হয়ে গিয়েছি। আমি মুক্তিযোদ্ধা এবং অভিনেতা। আমার এর চাইতে বেশি কিছু চাওয়ার নেই।

কবরী সারোয়ার, অভিনেত্রী
মুক্তিযুদ্ধের সময়টা আমার কাছে খুবই বিভীষিকাময় আবার গৌরবের। মুক্তিযুদ্ধের আগেই বিভিন্ন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মঞ্চায়ন হওয়া বিভিন্ন নাটকে অংশ নিয়েছিলাম। আমার জন্য ওই সময়টা খুব উত্তেজনাকর ছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছে ছিল খুব কিন্তু পরিবারের কারণে পারিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৯ এপ্রিল পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যাই। সেখান থেকে ভারত চলে যেতে হয়। কলকাতা গিয়েও কিন্তু আমি চুপ হয়ে যাইনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি।
ছবি : সংগৃহীত








