মাকে নিয়ে স্মৃতিকথার ডায়েরি সবারই অনেক বড়। তা বলে বা পড়ে শেষ করা যাবে না, শেষ করা যায় না। এর মধ্য থেকেই কিছু স্মৃতি সন্তানকে তাড়িয়ে বেড়ায় সারাটা জীবন। সেটা মা জীবিত হউক কিংবা না থাকা অবস্থাতেও। এমনি কিছু স্মৃতিকথা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেছেন গুণী চার তারকা।

সৈয়দ হাসান ইমাম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
মা আমার ২১ বছর বয়েসেই স্বামীহারা হন। তারপর আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে মায়ের বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু হয়। মা আমাদের আগলে রেখে বড় করে তুললেন। তবে ভালো কাজে কখনোই বাঁধা দেননি বরং এগিয়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে আমার কি সাহস তারচেয়ে বেশি সাহস ছিল মায়ের। জীবন চলে যেতে পারে তারপরেও মা বলেননি থেমে যাও। ১৯৪৮ সাল, তখন আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। আমরা তখন ভারতের বর্ধমানে থাকতাম আমার মামাবাড়িতে। মামারা সবাই কমিউনিষ্ট পার্টিতে সক্রিয় ছিল। এ সময় সরকার কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতি বন্ধ করে দেয়। সব মামা তখন আত্মগোপন করে। কেবল মেজো মামা গ্রেফতার হলেন। জেলের ভেতর মামা খুব অসুস্থ। মামার জন্য প্রতিদিন বর্ধমান থেকে কলকাতা এসে ওষুধ কিনে সেগুলোর জেলে পৌছে দিতাম। তখন চারদিকে গন্ডগোল চলছিল। এর মধ্য দিয়ে প্রতিদিন আমি একাজটা করে চলেছি। মা কখনো বলেনি তুই যাসনে। মা সাহস দিয়েছে বরং। তিনি জীবনে শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে কেবল সাহস দিয়ে গেছেন প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াইয়ে জেতার জন্য। নব্বই দশকে যখন বিএনপি ক্ষমতায়। আমি তখন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহবায়ক। আমার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে সরকার। সকাল–বিকাল বাসায় এসে হুমকি ধামকি দিয়ে যায়, কখনো সরকারি বাহিনী কখনো রাজনৈতিক কর্মী। একদিন বেশ কয়েকজন বাসায় আসে। মা ও আমার ভাইপো আসে তাদের সঙ্গে কথা বলতে। তারা আমার মা ও ভাইপোর বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে বলে, যদি আমাকে না পায়, তবে তাদেরকে গুলি করে মারবে। আমি সে সময় ছিলাম শহীদ জননী জাহানারা ইমামে বাসায়। ঘটনাটি মা আমাকে কখনো বলেনি। যদি আমি দূর্বল হয়ে পড়ি। আমি অবাক হয়ে যাই ৮০ বছরের এই মহিলার সাহস দেখে। শেষ দিকে আমাকে দেশ ছাড়তে হয় বিএনপির সরকারের কারণে। আমি তাদের শাসনামলে আর দেশে ফিরতে পারিনি। এই সময় আমার মা মারা যান। আমার কত সাধনার এই মাকে আমি শেষ দেখা দেখতে পাইনি তাদের জন্য। এটা আমার আমরণ একটা কষ্ট হিসেবেই রয়ে যাবে।

শর্মিলী আহমেদ, নাট্যভিনেত্রী
মা দিবস কী, তা বোঝাতে অনেক বেগ হতে হয়েছিল আমাদের। আমাদের মানে ৫ বোন ও এক ভাইয়ের। যখন মা বুঝতে পারেন, তখন বেশ মজা পেয়েছিলেন তিনি। তারপর থেকে মা বিশেষ এ দিবসটাতে চাইতেন আমরা সবাই তাকে একসঙ্গে সময় দেই। কিন্তু হয়ে উঠত খুব কমই। এ দিবসে মাকে স্পেশাল কিছু রান্না করে খাওয়াতাম। গিফট দিতাম। মা অনেক উপভোগ করতেন বিষয়টা। ১০ কি ১২ বছর আগের দৃশ্য এটি। এর মধ্যে দশ বছর হয়ে গেল আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মা। তার সঙ্গে কত কত স্মৃতি আমার। মা আমাদের ক্রুশকাটা সুই–সুতার দিয়ে জামা তৈরি করে দিত। সেটি পরে আবার বন্ধুদের বলতাম ‘কী, এমন জামা তোদের আছে?’ আহ! কী মধুর স্মৃতি। আমাদের সময়ে ঈদের সালামীর প্রচলন ছিল না। মা বলতেন, ‘সালাম করে এ সময় দোয়া নিতে হয়।’ আমরা তা–ই করতাম। মা অনেক মজার পায়েস করতেন। এই পায়েস খাবার লোভে আত্মীয়স্বজন এমনকি আশেপাশে মানুষ আসতেন এ দিনটায়। এজন্য মা প্রতি ঈদে বড় হাড়িতে বেশি করে পায়েস রান্না করতেন। এখন পায়েস খাই মাঝে মাঝে, কিন্তু সেই স্বাদ কি আর আর আছে? আর পাবো না।

আলী যাকের, নাট্যব্যক্তিত্ব
মা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম শব্দ। কত স্মৃতি আছে মাকে নিয়ে, তা বলে শেষ করা যাবে না। তবে একটি স্মৃতি কখনোই ভোলা যাবে না। এটা আমার কাছে যেমন কষ্টের তেমনি মধুরও। আমি তখন অনার্স পরীক্ষা দিচ্ছি। মায়ের তখন ক্যানসারের অ্যাডভান্স স্টেজ চলছে। আমি তো কিছুতেই ঢাকায় আসব না পরীক্ষা দিতে। মা তখন অনেক বোঝালেন আমাকে। কথা দিলেন পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি না আসা পর্যন্ত তিনি জীবিত থাকবেন। অসুস্থ মায়ের পীড়াপীড়িতে রাজি হই। ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেই। পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরে মাকে দেখি। মায়ের চোখে মুখে সেকি আনন্দ। তার একসপ্তাহ পর মা আমাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। মা তার ছেলের কাছে কথা রেখেছিলেন।

চম্পা, অভিনেত্রী
মার চেয়ে বেশি মধুর আর কোনো শব্দ পৃথিবীতে নেই। মায়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ হতে পারে না। আমি তো ছোটবেলায় মা হারিয়েছি। মনে পড়ে মা আমাকে কোলে করে ‘চাঁদের বুড়ি’র গল্প শোনাতেন। কী করতে হবে, কী করতে হবে না—এসব শেখাতেন। মা যেগুলো শিখিয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো সময়ে সময়ে বাস্তবায়ন করেছি। আমার জীবনের পুরো সময়টা আমি মাকে পাইনি, এ নিয়ে আমার কষ্টে শেষ নেই। আমার জীবনে এমন হলেও সবার তো হয় না। তাদেরকে বলব মাকে অবহেলা করো না। তাকে সময় দিও। সারা জীবন সে তোমাকে সময় দিয়েছে। বয়স হলে পড়ে মা আর বাবা দুজনই শিশু হয়ে যায়। তখন সে কথা বলার লোক খুঁজে। চায় সন্তান তাকে সময় দিক। আমি বলব, কাজ শেষে ঘরে ফিরে মোবাইলে ব্যস্ত না হয়ে মাকে সময় দাও।
ছবি : সংগৃহীত








