আমাদের দেশে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এমনিতেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কোনো শেষ নেই। এর কতটা অধিক প্রত্যাশাজনিত, কতটা অসহায়তা-সঞ্জাত আর কতটা চিকিৎসকের অবহেলা বা ‘কসাই’-আচরণজনিত, সেটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি মোটেও ইতিবাচক নয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামে চিকিৎসকের অবহেলায় এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা, সেই ঘটনা-পরম্পরায় বিভিন্ন বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন এবং এর প্রেক্ষিতে এক রিটের প্রেক্ষিতে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট বলেছেন, দেশে ডাক্তারি পেশা দুর্বৃত্তের পেশায় পরিণত হয়েছে। ডাক্তাররা নিজেরা ভুল করে তা ঢাকতে ধর্মঘট ডেকেছেন যা অন্যায়।
কতিপয় দুর্বৃত্তের কর্মকাণ্ডের কারণে চিকিৎসা সেবার সুনাম নষ্ট হচ্ছে বলেও আদালত মন্তব্য করেছেন। আদালতের এই মন্তব্য চিকিৎসকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাকেই আরও উস্কে দিয়েছে। আদালতের এই রায়ের পর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও উচ্চকিত হয়েছে। সেই তাদের বিরুদ্ধে একহাত নিচ্ছেন!
উল্লেখ্য, গত ২৯ জুন চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে এক সাংবাদিক কন্যা আড়াই বছরের শিশু রাইফা খানের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকের অবহেলায় রাইফার মৃত্যুর অভিযোগ উঠে। বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার প্রেক্ষিতে জেলা সিভিল সার্জনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সের অবহেলায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করে। এর পর গত ৮ জুলাই হাসপাতালটিতে অভিযান চালায় র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে হাসপাতালের ড্রাগ লাইসেন্স নবায়ন না করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত হাসপাতালটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে। এ ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের সব বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে সেবা বন্ধ ঘোষণা করে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতি নামে একটি সংগঠন।
চট্টগ্রামের ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তবে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। এ ধরনের ঘটনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়ই ঘটছে। তাৎক্ষণিক আবেগে ভেসে না গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আসলে গভীরভাবে ভেবে দেখার দরকার। চিকিৎসকের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হওয়া, তাদের এক রকম ভিলেন বানানোটা মোটেও শুভবুদ্ধির পরিচায়ক নয়। আমাদের দেশে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। গড়ে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোগীর জন্য একজন চিকিৎসক রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ ভুলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এই চিকিৎসকের মধ্যে দুই একজন কর্তব্যে গাফিলতি করতে পারেন, অপরাধও করতে পারেন, কিন্তু তার জন্য ঢালাওভাবে সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা মোটেও উচিত কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদেরও এগিয়ে আসা দরকার। শুধু পেশাগত ঐক্য ও সহানুভূতি না দেখিয়ে যদি শতকরা ৯৫ জন চিৎিসকই ভালো হন, তবে তাদের উচিত বাকি ৫ জনকে বয়কট করা, যাতে তাদের সুনাম অক্ষুন্ন থাকে। তা না হলে অল্প কয়েকজনের দুর্বৃত্তপ্রবণ মানসিকতার কারণে পুরো কমিউনিটিকে কলঙ্কের দায়ভার নিতে হবে। যা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়।
আরেকটি কথা, কোনো পরিস্থিতেই ডাক্তারদের ধর্মঘটের মতো কর্মসূচিতে যাওয়া উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, অসুস্থ, রোগজর্জর মানুষকে সেবা-সুশ্রুষার মাধ্যমে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার মহান ব্রত তারা পালন করছেন। এখানে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের মতো রাগ-ক্ষোভ-মোহের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু করা তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। তবে তাদের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে, দাবি-দাওয়াগুলো তুলে ধরতে একটা কার্যকর প্লাটফরম চাই। সরকারকেই এদিকটা ভেবে দেখতে হবে।
এ ব্যাপারে সরকারের অনেক কিছুই করার আছে। সরকারই আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে সরকারি ও বেসরকারি-এই দুইভাগে ভাগ করে ফেলেছে। বেসরকারি ব্যবস্থার মধ্যে আবার রয়েছে দাতব্য ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। কিছু দিন পর পর বাণিজ্যিক বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা বার বার খবরে উঠে আসে। ‘ব্রেকিং নিউজ’-এ দেখা যায় কখনও উত্তপ্ত, কখনও অসহায় কিছু মুখ। কিন্তু আড়ালে থেকে যাচ্ছে কিছু অপ্রিয় সত্য।
চিকিৎসা সকলের অধিকার, তা মানা হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার সময়েই। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হল, আজ বাংলাদেশে প্রায় সত্তর শতাংশ চিকিৎসা হয় বেসরকারি ক্ষেত্রে। কারণ, চিকিৎসার চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি সরকারি ব্যবস্থা। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে যে অবকাঠামো আছে, তা-ও যথেষ্ট নয়। জনসংখ্যার অনুপাতে হাসপাতাল শয্যা এবং চিকিৎসক কত প্রয়োজন, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সূচক মানলে বলতে হয়, এ দেশে চাই অন্তত দুই লক্ষ শয্যা এবং দেড় লক্ষ ডাক্তার। রয়েছে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র ৯০ হাজার শয্যা, এবং ৮১ হাজার কর্মরত ডাক্তার। এঁদের বড় জোর বিশ শতাংশ সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে স্থায়ী চাকরি করছেন। আশি শতাংশই ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ নামক দিনমজুরি করছেন। কারণ, যথেষ্ট হাসপাতাল নেই।
বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তার আটকে আছেন সরকারি নীতির দোটানায়। সরকার এখনও নিশ্চিত নয়, চিকিৎসা পণ্য না সেবা? বেসরকারি হাসপাতাল বাণিজ্যিক হারে, লভ্যাংশের কথা ভেবে বিল বানালে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট হন। অথচ একশো শয্যার একটা হাসপাতাল তৈরি করতে লাগে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা, মাসিক খরচ দুই-তিন কোটি টাকা। এর উপর ওষুধ, যন্ত্রপাতি। এই টাকা আসার একটা ন্যায্য উপায় চাই। কিন্তু সরকারিভাবে তেমন কোনো নীতি বা গাইডলাইন এখনও প্রণয়ন করা হয়নি। আর যতটুকু যা বিধান রয়েছে, তা-ও কার্যকর নয়।
এই অনিশ্চয়তার ধাক্কা অনেকটাই পড়েছে ডাক্তারদের উপর। অনেক হাসপাতাল চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট বেতন না দিয়ে ‘ফি ফর সার্ভিস’ বা রোগী অনুসারে পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রথা চালু করছে। চিকিৎসকদেরও কেউ কেউ মনে করেন, রোগী-পিছু বা অপারেশন-পিছু পারিশ্রমিকের ব্যবস্থাটাই ভালো। তাতে নাকি পরিশ্রম ও দায়িত্বের বোঝা কিছুটা কম। বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন চিকিৎসা-সম্পর্কিত আইনের যা দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে একাধিক জায়গায় ছুটে বেড়ানো ডাক্তারদের পক্ষে বেশ ঝুঁকির ব্যাপার। আইনের চোখে ‘ভিজিটিং’ ডাক্তারদের দায়বদ্ধতা ‘হোলটাইম’ ডাক্তারদের থেকে কোনও অংশে কম নয়।
দেড়শো বছর আগে পশ্চিমে ‘ফি ফর সার্ভিস’ প্রথার প্রচলন ছিল। কিন্তু উন্নত দেশগুলি দেখেছিল, এতে চিকিৎসার মান খারাপ হয়। অদরকারি ওষুধ, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার চিকিৎসার খরচ বাড়ায়। জীবিকা বজায় রাখা, বা রোজগার বাড়ানোর তাগিদে চিকিৎসকেরা নানা অনৈতিক কাজ করেন। তাই ১৯৪০-এর দশক থেকে ইউরোপের প্রায় সব দেশ এই প্রথাকে বর্জন করে চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন একটা পাঁচমিশালি ব্যবস্থা ছিল। ২০১০ সালে ‘ওবামাকেয়ার’ যখন স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা শুরু করল, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ডাক্তারদের একটা স্থায়ী পারিশ্রমিক পরিকাঠামোয় (স্টেবল কমপেনসেশন সিস্টেম) নিয়ে আসা। প্রায় তিন হাজার পাতার এই পরিকল্পনার অনেকটাই হল ডাক্তারদের রোগী-প্রতি টাকা নেওয়ার ব্যবস্থাটা বন্ধ করা।
আমাদের বেসরকারি হাসপাতালগুলি এই বিষয়গুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি, স্বল্পমেয়াদি লাভ নিয়ে বেশি চিন্তা করেছে। এক দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক খরায় কবলিত হয়ে থাকার যে পরিস্থিতি, তার জন্য তারা নিজেরাই অনেকটা দায়ী। একে অপরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে, মেকি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা এতটাই মগ্ন, পায়ের তলার জমিটা যে আলগা হচ্ছে, তা বোধ হয়নি হাসপাতালের কর্তাদের। বেসরকারি হাসপাতালগুলি যদি নিজেদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ-ভিত্তিক একটি ছবি সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারত, এবং সরকার সেই অনুযায়ী নির্দেশনা দিত, তা হলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যেত।
আজ যে প্রায় ৮১ হাজার ডাক্তারের উপর সাড়ে ষোল কোটি মানুষ নির্ভর করে রয়েছেন, তাঁরা অধিকাংশই এক অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিনমজুর। তাদের কাছে আমরা প্রত্যাশা করি অনেক বেশি, কিন্তু তাদের পরিস্থিতিকে কখনও বিবেচনায় নিই না। আমরা হাসপাতাল-ক্লিনিকে ডাক্তার ও নার্সদের কাছে অনেক ভালো সেবা ও ব্যবহার পাব- সেটাই আশা করি। কিন্তু তার যোগ্য ব্যবস্থা কই? সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ প্রবল, তাই দায় বর্তাবে বেসরকারি হাসপাতালের উপর। তারা সরকার-নির্দিষ্ট দরে চিকিৎসা দিতে পারবে কি? না পারলে সেই ধাক্কার অনেকটাই ফের ডাক্তারদের বুক পেতে নিতে হবে।
ডাক্তার কখনও ক্ষিপ্ত জনতার হাতে প্রহৃত, কখনও আদালতের মন্তব্যে জর্জরিত। অথচ সদর্থক চিকিৎসার জন্য যত শয্যা, যে অবকাঠামো চাই, তা বেসরকারি ডাক্তারদের দেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের নিধিরাম সর্দার করে রাখলে দেশ কি উন্নত, স্বচ্ছ হতে পারবে?
আবার একথাও ভুলে গেলে চলবে না যে, একটা সহানুভূতি, একটা মানবিক মূল্যবোধ চিকিৎসক-নার্স, বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকেও চর্চা করতে হবে। মানুষ হাসপাতাল-ক্লিনিক নার্স-ডাক্তারের কাছে আসেন নিদানের জন্য, অনন্যোপায় হয়ে। তখন তাদের কাছে সর্বোচ্চ কর্তব্য ও সহানুভূতিশীল আচরণই কাম্য। সরকারি হাসপাতালের উদাসীনতায় আর বেসরকারি ক্লিনিকে বিজ্ঞাপনের জাঁকজমকে ‘চিকিৎসা’ নামক বস্তুটি আজ আর সেবার পর্যায়ে নেই, বরং পণ্যে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল বা ক্লিনিক এখন আর রোগ নিরাময়ের জায়গা নয় বরং চিকিৎসক, নার্সদের হৃদয়হীনতায়, অপরিচ্ছন্নতায় আর লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা বিলে আরও বেশি বেশি করে অসুস্থ হয়ে পড়ার জায়গায় পরিণত হয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ কীভাবে মিলবে? কে দেবে?
বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








