‘সুরক্ষা’ অ্যাপে নিবন্ধন করতে না পেরে যারা করোনাভাইরাসের টিকা পাচ্ছিলেন না, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে তাদেরকে নিকটবর্তী কেন্দ্র থেকে টিকা নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। জানানো হয়েছিল, ৭ আগস্ট এক সপ্তাহে সারাদেশে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু প্রস্তুতির অভাব-সহ নানান সীমাবদ্ধতায় সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বেশ কিছু কেন্দ্র বাদ দেওয়ার পাশাপাশি তা ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে ঠিক করা হয়।
গতকাল শনিবার ছিল সেই গণটিকাদান বা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের প্রথম দিন। যাতে বিপুল উৎসাহ এবং আগ্রহে গ্রাম এবং শহরের টিকা নেওয়ার জন্য মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। আর এতেই বিড়ম্বনা বাড়ে তাদের। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি এবং নারীদের সমস্যায় পড়তে হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি, ভিডিও এবং প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও টিকা পাননি অনেকেই। অনেক কেন্দ্রে আবার টিকার স্বল্পতায় ফিরে যেতে হয়েছে বহু মানুষকে। কোনো কোনো কেন্দ্রে আবার দলীয় পরিচয়ে দেওয়া হয়েছে টিকা।
এ শুধু প্রথম দিনের চিত্র নয়, দ্বিতীয় দিনেও একই ঘটনা ঘটেছে। এমন আরও অনেক অব্যবস্থাপনার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যে চিত্র উঠে এসেছে, তা হলো স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্ববিধি না থাকার বিষয়টি। এতে করে যেমন নতুন সংক্রমণের ভয় বাড়াচ্ছে। তেমনি ভিড় আর হুড়োহুড়িতে বয়স্কদের অসুস্থ হয়ে পড়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত স্বাস্ব্য বিশেষজ্ঞরাও।
আমাদের প্রশ্ন, এত এত প্রস্তুতি নিয়েও কেন এমন হলো? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই তো বলেছিল, শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র দেখালেও টিকা নেওয়া যাবে। নিবন্ধনের দরকার নেই। তাদের এমন ঘোষণায় কেন্দ্রে কেন্দ্র ভিড় হবে, সেই ধারনা তাদের ছিল না? কেন সেই পরিস্থিতির কথা পরিকল্পনায় নেওয়া হলো না? আবার নানা অনিয়মের মধ্যে প্রথম দিনে ২৮ লাখের বেশি ডোজ টিকা দেওয়ার পর দ্বিতীয় দিনে কেন আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?
দেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের পর চিকিৎসা থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা আমরা বার বার দেখেছি। মানুষকে ডেকে এনে এমন ভিড় করার দায় কার? আরও অনেক সহজভাবেই তো বিষয়টা শেষ করা যায়। বিশেষ করে বয়স বা খানা ভিত্তিক তালিকা ধরে ধরে ইপিআই বা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমেও এটা করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। মানে এত বড় একটা কাজের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলেই এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়েছে।
গণটিকা নিয়ে এই যখন পরিস্থিতি, তখন আবার কর্তৃপক্ষ পরামর্শ দিচ্ছে, এসএমএস বা ক্ষুদেবার্তা না পেয়ে কেউকে টিকা কেন্দ্রে না যেতে। স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মুখপাত্র ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলামের দাবি, ‘এসএমএস না পেয়ে অনেকেই টিকাদান কেন্দ্রে ভিড় করছেন। তাতে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’
কিন্তু এটা কি স্ববিরোধিতা নয়? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই তো বলছে; যারা নিবন্ধন করতে পারে না তাদের জন্য এই আয়োজন। আবার সেই অধিদপ্তরের মুখপাত্র বলছেন, এসএমএস পেয়ে তবেই টিকা কেন্দ্রে আসতে! আমরা জানি, নিবন্ধন করলেই কেবল টিকা পেতে এসএমএস আসে। তাহলে যাদের জন্য (নিবন্ধন করতে না পারা ব্যক্তিদের) এই গণটিকার আয়োজন, তারা কি করবে?
আমরা মনে করি, টিকা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনায় ঘাটতি আছে। মানুষকে হয়রানির মুখে না ফেলে কিভাবে আরও সহজে টিকা দেওয়া যায়; সেই কর্মপন্থা খুঁজে বের করতে হবে তাদেরকে। কারণ যত দ্রুত মানুষকে টিকা দেওয়া যাবে, তত তাড়াতাড়ি দেশ করোনামুক্ত হবে।








