ব্যবসায়ি মাকসুদুল হক স্বপ্নেও কি ভেবেছিলেন সম্পত্তি সংক্রান্ত একটি সিভিল মামলা লড়ে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবেন? অথবা যে সামরিক শাসকের যুগে তার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার হরণ হয়েছিল সেই শাসক জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি’র পুনরায় শাসনের সময়ে, তারই স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, তাদেরই ভীত নাড়িয়ে দেবেন তিনি?
বলছিলাম, ঢাকার মুন সিনেমা হলের মালিক মাকসুদুল হকের কথা। তার মামলার রায়েই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন বিচারপতি এবি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। যুগান্তকারী এ রায়ের সময় বিএনপি- জামাত জোট ক্ষমতায় ছিল।
পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আদেশ দেন। এ রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের জারি করা ফরমান, আদেশ ও ক্ষমতা দখল অবৈধ ও সংবিধান লঙ্ঘন বলে ঘোষণা করা হয়।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২’ এর মূল সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের পাশাপাশি অবৈধ ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসনকে বৈধতা দেয়া হয়।
দেশে প্রতিদিনই নতুন নতুন ঘটনার জন্ম হয়। আলোচনা বা আলোড়ন সৃষ্টিকারী নিত্য নতুন ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে যায় ক’দিন আগের ঘটনাগুলো। প্রায় এক যুগ আগে হাইকোর্টের দেয়া পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা ও অর্ধযুগ আগের আপিলের রায় যখন স্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই সরকারের একটি কমিটি আলোচিত মামালাটিকে আবার সামনে নিয়ে এলো সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক প্রত্যাহারের সুপারিশের মাধ্যমে। বিতর্কের সূত্রপাত এখান থেকে।
মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানকে ঘিরেই বিএনপির রাজনীতি। স্বাধীনতা সংগ্রামে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে অন্যান্য সেক্টর কমান্ডারদের মত, অস্বীকার করার উপায় নেই। তার অবদানের স্বীকৃত স্বরূপ বঙ্গবন্ধু সরকার তাকে বীরউত্তম খেতাবও প্রদান করেছে। বিএনপির এতে সন্তুষ্টি নেই। যে করেই হোক জিয়াউর রহমানকে জাতির পিতার সমান্তরাল দেখাতেই হবে, তা না হলে স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের স্থপতি, শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে একই সাথে পদক দেয়ার অর্থ কি ছিল? বিএনপি এটাকে জায়েজ করতে উদারতা দেখানোর কথা বলতে পারে। আসলে কি উদারতা নাকি হীনমন্যতা তার বিচারের ভার জনগণের উপর ছেড়ে দেয়া যায়। তবে ইতিহাস সচেতন কারো কাছে হীন রাজনৈতিক স্বার্থে দুজনকে একই কাতারে নেয়ার অপচেষ্টা ছাড়া অন্য কিছু ভাবার কারন থাকতে পারে কি? তখনকার বিরোধী দল ও বঙ্গবন্ধুর পরিবার এ পদক প্রত্যাখ্যান করেছিল বিএনপির চতুরতা বুঝতে পেরেই। জাতির জনকের পরিবার পদকটি প্রত্যাখ্যান করায় দুটি পদকই জাতীয় যাদুঘরে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্তে পদক দেয়ার আসল উদ্দেশ্য আরো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা। যেমনটি করেনি জিয়াউর রহমানকে। না হয় জিয়াউর রহমানকে বংবন্ধুর সমান্তরাল করার অপচেষ্টার মাত্র দু বছরের মধ্যে কানের পাশ দিয়ে যাওয়া সাংবিধানিক আলোচনা একেবারে টেনে নিয়ে আসবে কেন মাথাকে? যার মাধ্যমে ম্লান হয় জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে পাওয়া স্বীকৃত সকল অর্জন। এ রায়ের পর দেশের মানুষের কাছে জিয়াউর রহমান একজন অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং আদালত স্বীকৃত এটা চিরন্তন সত্য মেনে নিয়ে বিএনপিকে আগামী দিনের পথ চলতে হবে। 
এই সত্য নিয়েই জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক বাতিলের সুপারিশে বলেছে, সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের শাস্তি পাওয়া উচিত। যা দেখে ভবিষ্যতে কেউ যেন সংবিধান লঙ্ঘন করার সাহস না পায়। সংবিধান লঙ্ঘন কারিকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে উল্লেখ করে কমিটি আরো বলেছে, ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৯ সালের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্র বা দেশ পরিচালিত হয়েছে সংসদ ছাড়া যা সুস্পষ্টভাবে একনায়কতন্ত্র। আর ওই সময়ের বাংলাদেশের একনায়কতন্ত্র সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
কমিটির এ সুপারিশ এখনো চূড়ান্ত নয়। এতে সরকার প্রধানের সিদ্ধান্ত লাগবে। সেজন্য সুপারিশটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হচ্ছে বলেও সংবাদ মাধ্যমের খবরে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক বাতিল করা হতে পারে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে তার দল বিএনপিতেও প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সরকারীভাবে ঘোষণার আগেই সংবাদপত্রের প্রতিবেদনকে ভিত্তি ধরে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির জরুরী সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে হুশিয়ার করেছেন। এ পদক প্রত্যাহারের মাধ্যমে জাতিকে বিভক্ত না করতে আহবানও জানিয়েছেন তিনি।
বিপরীতে সরকারী দল আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ণ দু’জন নেতা সংবাদ মাধ্যমের সাথে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, একটা ভুল সিদ্ধান্তকে সংশোধন করলে জাতি বিভক্ত হবে, এমনটি ভাবার কোন সুযোগ নেই।
জাতির বিভক্তি প্রশ্নে আলোচনা দীর্ঘ না করে শধু এটুকু অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ- বিপক্ষ শক্তির মধ্যে বিভিক্ত অসত্য নয় যার একদিকে প্রতিনিধিত্ব করছে আওয়ামীলীগ আর অন্য দিকে আছে জামাতকে সাথে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি। আর এই বিভক্তি তৈরিতে বিএনপির ভূমিকা কতটুকু তা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে।
আওয়ামীলীগ ও বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়ার ধরনে সচেতন যে কারো ধারণা করা অমুলক নয় যে, সরকার সহসাই এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। অফিসিয়ালি ঘোষণাটা প্রদান সময়ের ব্যাপার মাত্র। সম্প্রতি সরকারী দলের কয়েকজন নেতা জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার দাবি করায় পদক বাতিলের সিদ্ধান্তকে আরো তরান্বিত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যা অপ্রত্যাশিত নয়।
যারা জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচারের দাবি তুলেছেন তারা হয়তো জানেন না যে মৃত ব্যাক্তির বিচারের ক্ষমতা কারোর নেই। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোন অপরাধীর বিচার কাজ চলাকালীন সময়ে মৃত্যু হলে তার নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়ার যুক্তি হচ্ছে, একজন অপরাধীর মৃত্যুর সাথে তার অপরাধেরও মৃত্যু ঘটেছে। এ বিধানটি মেনে চলা হয় বলে আইনজ্ঞদের অভিমত। সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের দায়ে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বিচারের সুযোগ নেই একারনে।
পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা হওয়ায় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের দায়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের পাশে আছেন এরশাদ। সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষনায় হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদও সমানভাবে অভিযুক্ত। দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সংবিধান লঙ্ঘন কারীদের যদি শাস্তি দিতেই হয় ভবিষ্যতে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করার জন্য, অথবা এমন অপকর্ম করার সাহস যাতে কেউ না করে সে জন্য, তাহলে মরহুম জিয়াউর রহমানের পদক বাতিলের পাশাপাশি এরশাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার দাবি ওঠা কি প্রাসঙ্গিক নয়?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








