জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল হোসেন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির কথা বার বার ‘ভুলে যাচ্ছেন’। সিলেটের জনসভার পর রাজধানীর আলোচনা সভায়ও বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবির কথা বলতে ভুলে গেছেন তিনি। দুই পর্যায়ে বিএনপি নেতারা তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর তিনি জানিয়েছেন মুক্তির দাবি; একই সঙ্গে বলছেন, ‘এটা বলার কী আছে, আমাদের মূল দাবিতে এটা তো আছে’!
ড. কামাল হোসেন বর্ষীয়ান আইনজীবী, রাজনীতিবিদ। এই ৮১ বছর বয়সে তার কোনোকিছু ভুলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তবে এই বয়সেও তিনি রাজনীতির মাঠে ফের সক্রিয় হয়েছেন। এবং সেখানে তার জোটের দাবি ও লক্ষ্য যথাক্রমে সাত আর এগারো। চলমান কর্মসূচিগুলো তাদের সাত দাবিকে সামনে রেখে। দাবির সংখ্যার দিকে তাকালে এগুলো খুব বেশি কিছু নয় এবং অতি অবশ্যই মূখ্য দাবি যা বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটাই হচ্ছে এবং বার বার হচ্ছে ড. কামাল হোসেনের ক্ষেত্রেই।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রথম দাবির মধ্যে রয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সহ সকল ‘রাজবন্দির’ মুক্তির দাবি। প্রথম দাবির মধ্যে আরও আছে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন’। সাধারণত দাবির ক্রমিক নির্ধারিত হয় দাবির গুরুত্বকে নির্দেশ করেই। এক্ষেত্রে প্রধান দাবি খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট। এরপরের দাবিগুলোর মধ্যে আছে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ইভিএমের বিরোধিতা, বাক, সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট, জনসম্পৃক্ততা বিভিন্ন আন্দোলনে গ্রেপ্তারদের মুক্তির দাবি, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন, তফশিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মামলা বিষয়ক।
সাত দাবির এই দাবিগুলোর অধিকাংশই ড. কামাল হোসেনের সংক্ষিপ্ত বক্তৃতাগুলো নিয়মিতভাবে উঠে আসছে। ওগুলো ভুলছেন না, কিন্তু তার ‘ভুলে যাওয়া’ কেবল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানানোতে। বক্তৃতার শেষাংশে অন্যরা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলছেন মুক্তির কথা; আবার এও বলছেন ‘বলার কী আছে, অন্যরা তো বলছে’। 
এটা তিনিসহ সকলেরই জানা যে অন্যদের বক্তব্যে কোনো প্রসঙ্গ আসা আর তার বক্তব্যে আসার মধ্যে পার্থক্য অনেক। তিনি যা বলছেন সেটা ঐক্যফ্রন্টের সর্বশেষ বক্তব্য কিংবা মূল দাবি এবং এটাই আনুষ্ঠানিক। অনেকের হয়তো মনে হতে পারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যেহেতু তাদের আনুষ্ঠানিক দাবি প্রকাশের সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়েছে সেক্ষেত্রে সেটাই সরকারবিরোধী এই জোটের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকার দাবি জানানো মানেই কিন্তু সেই দাবি কিংবা দাবিসমূহে অনড় থাকা নয়।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যে সাত দাবি উত্থাপিত হয়েছে সেগুলোর অনেকগুলো নিয়েই আলোচনা হয় না, হবেও না। সেগুলোকে হাইলাইট করারও কথা নয়। এই বিষয়সমূহের মধ্যে কি পড়ে গেল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি? অন্তত প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা কিন্তু সেটাই বলছে।
যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। ঐক্যফ্রন্টের আগে যে দুই জোট গঠিত হয়েছিল সেখানে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ছিল না; থাকার কথাও নয়, কারণ তখন পর্যন্ত বিএনপি এই ঐক্যে যুক্ত ছিল না। বিএনপিকে সঙ্গে নিতে ড. কামাল-মাহমুদুর রহমান মান্না-আ স ম আব্দুর রবেরা বিএনপির প্রধান দাবিকে যুক্ত করেছেন। খালেদার মুক্তি অন্যদের সর্বকালীন দাবি না হলেও বিএনপির ছিল মুখ্য দাবি। এখন বিএনপি কামাল-মান্নাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তাদের দাবিকেও যুক্ত করতে হয়েছে। এ কারণেই কি প্রধান সমন্বয়কের বক্তব্যে আসছে না খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ? একারণেই কি বারবার ‘ভুলে যাচ্ছেন’ তিনি? তার এই ভুলে যাওয়াটা বয়সের দোষ, কাকতালীয়, নাকি ইচ্ছেকৃত এ নিয়ে প্রশ্ন!
এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের পেশাগত এক বৈঠকের বিষয়, যেখানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানালে তিনি সেটা গ্রহণ করেননি। গত ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর আইনজীবী হিসেবে আপিল শুনানিতে তাকে থাকার অনুরোধ জানান মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। ওই সময়ে ফৌজদারি মামলায় তার ‘পারদর্শিতা নেই’ জানিয়ে বিএনপির এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি ড. কামাল। তবে খালেদা জিয়ার প্রতি তার শুভকামনা রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
বিএনপির মধ্যে দক্ষ আইনজীবীর একটা বিশাল অংশ রয়েছে, তারা নিজেরা খালেদা জিয়ার হয়ে আইনি লড়াই চালাতে সক্ষম। তবে ড. কামাল হোসেনের মতো অভিজ্ঞ আইনজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছিল তারা; কিন্তু তিনি ফৌজদারি মামলা ‘বুঝেন না’ এবং এই ধরনের মামলায় তার ‘পারদর্শিতা নেই’ এমনটা শুনেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল সেদিন। এটা কি স্রেফ অজুহাত, নাকি এর সঙ্গে সত্যতা কিছুটা জড়িয়ে তা কৌতূহলেরও। ড. কামাল হোসেন ফৌজদারি মামলা করেন না, কিংবা এ ধরনের মামলায় তার দক্ষতা নেই জেনেও ত বিএনপির প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার কথা নয়। বিএনপির অভিজ্ঞ ও দক্ষ আইনজীবী আর নেতারা নিশ্চয়ই এমন কারও কাছে এমন কোন প্রস্তাব দেবেন না যা তার আওতার বাইরে!
বিএনপিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামের একটা সরকারবিরোধী জোট গঠনের পর একাধিক সমাবেশে বারবার খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ড. কামাল হোসেনের ‘ভুলে যাওয়ার’ সঙ্গে সেদিনের সেই ঘটনার সূত্র উল্লেখ তাই প্রাসঙ্গিক মনে হয়। বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জোট গঠনের পর খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গে কথা বলা ড. কামালের জন্যে স্বাভাবিক ঘটনা হওয়ার কথা, কিন্তু সেটা তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। এই এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে বিএনপি এখনও কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি ঠিক, কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবে তাদের জন্যেও দুর্ভাবনার কারণ হয়ে ওঠছে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়ার পর বিএনপির দলীয় কর্মসূচি আলাদা ভাবে দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা কমে এসেছে। এই কিছুদিনের ভেতরেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটি নবগঠিত এই জোটে পুরোপুরি ভাবে নিজেদের জড়িত করে ফেলেছে। সিলেটের সমাবেশে উপস্থিত সকলেই বিএনপির, এবং দলটিই এমন উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে তাদের সাংগঠনিক ভূমিকায়। গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য নামের দলগুলোর জনসম্পৃক্তি একেবারেই নেই। পুরো সিলেটেই তাদের কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা শ’ থেকে হাজারে পৌঁছাবে কিনা সন্দেহ। তবু বিশাল সমাবেশ করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, এবং সেটা এককভাবে বিএনপির কারণেই।
সমাবেশের এমন উপস্থিতি নিশ্চিত করা সত্ত্বেও বিএনপিকে এখন ড. কামাল হোসেনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মনসুর, জাফরুল্লাহ চৌধুরীরা বিএনপির সুরে কথা বললেও কামাল হোসেন এখনও ও পথে যাননি। তিনি কথায়-কথায় খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন না, এটা কেউ বলতে অনুরোধ করলে ‘অন্যেরা তো বলছে’ বলে এড়িয়েও যেতে চাইছেন।
ড. কামাল হোসেনের এই ‘ভুলে যাওয়াকে’ বিএনপি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি এখনও; অন্তত এনিয়ে তাদের কোন বক্তব্য আসেনি। তবে এমন চলতে থাকলে এই জোটের ভবিষ্যৎ কোনো একটা সময়ে হয়তো অনিশ্চয়তার মুখেও পড়তে পারে। এটা এখনই দৃশ্যমান হবে না হয়তো, হবে তখন যখন নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা শেষে নির্বাচনও চলে আসবে সন্নিকটে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দাবি উত্থাপনের পর সরকারের একাধিক মন্ত্রীর মুখে এই দাবিগুলোর সমালোচনাসহ নবগঠিত এই জোটনেতাদের সমালোচনা চলমান। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দাবির একটাও মেনে নেওয়া হবে না।
২৬ অক্টোবর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তাদের সব দাবি অযৌক্তিক। সাত দফার এক দফাও মেনে নেওয়া হবে না। তাই নিরপেক্ষ সরকারের দাবি উঠতে পারে না। নির্বাচনের সময় সরকার তার এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়ন করবে।’ বিশ্বের অন্য দেশে যেভাবে থাকে আমাদের দেশেও একইভাবে সরকার থাকবে বলে মন্তব্য ওবায়দুল কাদেরের। কেবল ওবায়দুল কাদেরই নন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে ধারণাই করা যায়, সরকার দাবিগুলো মানছে না। 
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের কথা বলছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু এই আন্দোলন কী প্রক্রিয়ায় হবে আর কতখানি সফল হবে- এ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। নির্বাচনের বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। ওই নির্বাচন ঠেকাতে ভয়াবহ অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়েছিল দলটি। সেটাও প্রতিহত করে নির্বাচন হয়েছিল এবং আওয়ামী সরকার ঠিক পাঁচ বছর দেশ শাসনও করেছে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি পূরণ না হলে তারা যে আন্দোলনের কথা বলছেন সেটা কীভাবে হবে কারণ আগেও আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করে বিএনপির সঙ্গে আরও কিছু ব্যক্তি বা দল যোগ হয়েছে ঠিক শক্তির যোগ হয়নি। তার ওপর গত পাঁচ বছরে মাঠের রাজনীতির অনুপস্থিতিতে শক্তিক্ষয় হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের। ফলে আন্দোলনে দাবি আদায়ের মত শক্তি নাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কিংবা বিএনপির।
সেক্ষেত্রে নির্বাচনে কি যাবে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট? খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির কথা বক্তৃতায় ‘ভুলে গিয়ে’ যে সন্দেহের বীজ রোপণ করছেন ড. কামাল হোসেন সেটা চলতে থাকলে তাদের মধ্যে দূরত্ব দৃশ্যমান হবে, এবং নির্বাচনের ঠিক আগে এটা বড় আকারে দৃশ্যমান হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না বর্জন এমন দোটানায় পড়ে যেতে পারে বিএনপি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ একাধিক নেতা ড. কামাল হোসেনের রাজনৈতিক পিছুটানের ইঙ্গিত সম্প্রতি দিয়েছেন। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তিনি পূর্বের মতো এমন পিছুটান দিলে কোথায় দাঁড়াবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কিংবা বিএনপির আগামী নির্বাচন বিষয়ক প্রস্তুতি আর সিদ্ধান্ত- সেটাই এখন দেখার!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








