‘কোনো পুরনো দিনের/গান শুনে, দোয়েল-শালিক দেখে/আমি খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি;/ফিরে যাই আমার সবুজ গ্রামে,/এখনো টিনের চালে কখনো/বৃষ্টির শব্দ শুনে উত্তরবঙ্গের/সেই দুঃখিনী গ্রামটি মনে পড়ে’– মহাদেব সাহা।
ছুটির অবসরে রাজধানীতে বসে খুব মনে পড়ছে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কুড়ুলিয়া নামের গ্রামটির কথা। আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত গ্রামটির কথা। এই গ্রামে অল্প কয়েকজন সম্পন্ন মানুষ বাস করত। আর বেশির ভাগই ছিল মজুর, বর্গাচাষী। এই গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অভাব-দারিদ্র্য ছিল, ছিল দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু সুখ, সহমর্মিতা, আনন্দ কি ছিল না? ছিল। গোলা ভরা ধান হয়তো সবার ছিল না, কিন্তু তাদের গলা-ভরা গান ছিল। উৎসব ছিল, আনন্দ ছিল, আন্তরিকতা ছিল। ছিল মধুর সম্প্রীতি। এই দুঃখিনী গ্রামটির কথা খুব মনে পড়ছে।
ক্যালেন্ডারের পাতায় বাংলায় এখন ভাদ্রমাস। আহা সেই কৈশোরের ভাদ্রমাসের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়! এ সময় রোপা-আমন বোনা শেষ হয়ে যেত। দিগন্ত জুড়ে থাকত কেবল সবুজে মোড়ানো ধানক্ষেত। সেই ধানক্ষেত ভরা জল। ভাদ্রের তীব্র রৌদ্রে সেই জলগুলো প্রচন্ড গরম হয়ে যেত। সেই গরমে কোমল মাছগুলো কিছুতেই টিকতে পারতো না। শরীর উল্টে ভেসে থাকতো। আমরা ধানক্ষেতের আল দিয়ে ঘুরতাম আর জলে ভেসে থাকা মাছগুলো ধরতাম। তাতেই আমাদের হাতের আঙ্গুলগুলো কেমন সিদ্ধ-সিদ্ধ হয়ে যেত। দুপুরে যখন সূর্য থেকে গণগণে তাপ বেরোত, তখন মাছগুলো একেবারেই জীবনের হাল ছেড়ে দিত। আমাদের কিছুই করতে হতো না, কেবল মাছগুলো জল থেকে কুড়োতে হতো। আমরা বেছে বেছে মাছ তুলতাম। যেগুলো ছোট কিংবা যেগুলো মরে গেছে, সেগুলো বাদ দিতাম। তারপরও খুব অল্প সময়েই আমাদের ভাণ্ড পূর্ণ হয়ে যেত। আমরা হেঁটে হেঁটে পুঁটি, ডাইরকা (ডানকেনে), মহুকা (মলা) গচি (ছোট বাইম), পয়া (গুতুম), সাটি (টাকি), চিংড়ি, টেংরা, বাইলা প্রভৃতি দেশি মাছ ধরতাম।
সেই সময় মাছের এত প্রাচুর্য ছিল যে আমরা শুঁটকি খেতাম না। ফ্রিজ না থাকাতে মাছ সংরক্ষণেরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। লবণ-হলুদ দিয়ে হালকা ভেজে যা দু-তিনদিন রাখা যেত। তা ছাড়া মাছ কাটা-বাছারও একটা ঝামেলা ছিল। কাজেই দুই-তিন কেজির বেশি মাছ কখনই বাড়িতে আনার সাহস পেতাম না। যা আনতাম তার জন্যই বকা শুনতে হতো। অথচ তখন যে কেউ চাইলেই মণকে মণ মাছ বিনে আয়াসেই ধরতে পারতেন। এর জন্য কারও কোনো ক্ষতি করতে হতো না, জাল কিংবা মাছ ধরার কোনো উপকরণই লাগত না। এমনকি নিজস্ব কোনো পুকুর, জমি বা ধানক্ষেতও থাকতে হতো না! যে কোনো ক্ষেতের আলে হেঁটে হেঁটে এই মাছ সংগ্রহ করা যেত!
মাছ ধরে আনার পর বকুনি থেকে বাঁচতে অনেক সময় দাদী-নানী-মায়ের সঙ্গে ছোট মাছ কাটায় আমরাও হাত লাগাতাম। পুঁটি, ডাইরকা, মহুকা ইত্যাদি মাছের পেট টিপে নাড়িভুড়ি বের করতাম। তারপর সেগুলো সিমেন্টের বেদিতে ভালো করে ঘষে ধুয়ে আঁশ ছাড়িয়ে রান্নার উপযোগী করা হতো। কাজটা সময় সাপেক্ষ ছিল।
মাশকলাইয়ের ডালের সঙ্গে এসব ছোট মাছের চচ্চরি কিংবা বেশি করে পেঁয়াজ-কাচামরিচ দিয়ে ভাজি-অসাধারণ স্বাদের ছিল।
জাল-বড়শি কিংবা কোনো রকম উপকরণ ছাড়া ডাঙ্গায় শুধু হাত দিয়ে মাছ ধরা বর্তমান জমানায় রূপকথার মতো মনে হবে। অথচ আমরা যারা আশির দশকে গ্রামে কাটিয়েছি, তাদের কাছে এটা ছিল খুব সাধারণ একটা ব্যাপার।
এখানে বলে রাখা ভালো যে, কৈশোরে আমাদের বাড়িটি ছিল একেবারে গ্রামের মধ্যে। চারদিকে বাঁশঝাড় আর জঙ্গল। মাঝে মাঝে কিছু বাড়িঘর। দিগন্ত বিস্তৃত খেত-খামার। জনবসতি খুবই কম। টেলিভিশন, রেডিও, বিদ্যুৎ কিছুই নেই। বিনোদন বলতে কয়েকজন ভাইবোন মিলে খেয়োখেয়ি, দৌড়-ঝাঁপ। সারাদিন হৈ-হুল্লোড়। সন্ধ্যায় অভিভাবকদের দেখিয়ে চিৎকার করে কিছু সময় ‘পড়ার অভিনয়’। তারপর পেটপুরে খেয়ে ঘুম। তখন রাত ৮টার মধ্যে গ্রামগুলোতে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা নেমে আসত। যেহেতু রাত আটটার মধ্যে আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম তাই ভোরবেলায় আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যেত। আর ঘুম থেকে উঠেই শুরু হতো আমাদের নানামুখী অভিযান। বর্ষাকালে মাছ ধরা। আম-লিচুর মৌসুমে ফল সংগ্রহ। কখনও কখনও বরই গাছের তলায় গিয়ে বরই কুড়ানো। বকুল ফুল কুড়ানোও ছিল আমাদের কৈশোরের ভোরের অন্যতম কাজ!
এখনও মনে পড়ে টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। মুষলধারে বৃষ্টি। অন্ধকারে বৃষ্টি দেখা। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। বর্ষায় গ্রাম জলে থৈ থৈ করছে। সমস্ত গ্রাম জলে ভাসছে। আবার বর্ষার তোড়ে গ্রামের সড়ক ভাঙতে শুরু করেছে। বাড়ির পাশেই একটি রাস্তা কেটে দেয়া হল পানি চলাচলের জন্য। মুহূর্তেই জাল নিয়ে মাছ ধরার জন্য অনেক মানুষের ভিড় জমে গেল।
বর্ষা শেষে নিচু জায়গা, গর্ত-খালের জল কমে যেত। শুরু হতো সেই কাদা-জলে মাছ ধরার উৎসব। আমরা মহা উৎসাহে ওই কাদাজলে মাছ ধরতে নেমে যেতাম। সারা গায়ে লেপ্টে আছে কাদা। মাথার ওপর ভাদ্র মাসের তালপাকা রোদ্দুর। সেদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ নেই কারোরই। সব মনোযোগ ওই খালের কাদাজলে। ছোট মাছেরা গা ঢাকা দিয়ে আছে সেখানে। হাত দিয়ে ধরাটাই আসল কাজ। একটা খালে জল সেচে সব মাছ কুড়িয়ে নেয়ার পরদিন দেখা যেত আরও কিছু মাছ রয়ে গেছে। আবার সেগুলো ধরা।
তখন বৃষ্টি আর জল মানেই ছিল মাছ। বৃষ্টি নামলেই মাছের সমারোহ দেখা যেত। আর যেখানেই জল ছিল, সেখানে কিছু মাছও থাকত। মাঝে মাঝে অতিবৃষ্টিতে উঠোনে জল জমে যেত। সেই উঠোন থেকেও আমরা মাছ ধরতাম। হয়তো সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। সকালে বৃষ্টি থেমে গেছে। উঁচু ক্ষেত থেকে জল গড়িয়ে নিচু ক্ষেতে পড়ছে। মাছখানে হয়তো ঘাসের একটুখানি রাস্তা। সেই রাস্তায় ঘাসের মধ্যে আটকে আছে চকচকে রূপসী সব মাছ। আমাদের কেবল কুড়ানোর পালা। পুঁটি, টেংরা, কই, টাকি, শোল। কখনও কখনও শিং-মাগুরও জুটতো। সেইসব মাছের যে রূপ-রং ছিল তা আজ আর কোথাও দেখি না!
তাছাড়া বৃষ্টির দিনে বাড়ির আশপাশের ডোবা-খাল থেকে বড় বড় কৈ মাছগুলো উপরে ডাঙায় উঠে আসতো। এর বাইরে ডোবা-খালে কচুরিপানার বা শ্যাওলার যে বড় বড় দাড়ি (শেকড় আর কি) হয়, সেগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে মাছেরা। আমরা ডোবা ও খাল থেকে কচুরিপানা ডাঙ্গায় তুলে ঝাকি দিতাম। আর তার থেকে বের হতো শিং, মাগুর, কই, শোল, টাকি, গজার, গুতুম, বাইম, টেংড়া, পুঁটি, চান্দা, খইলস্যা, বৈছাসহ আরো কত নাম না জানা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। সেই মাছ ধরায় কি যে আনন্দ ছিল !
আমি যে সময়ের গল্প বলছি তা ছিল ১৯৮০-৮১ সাল। তখন আমাদের এলাকায় সাধারণত জমিতে একটি মাত্র ফসল হতো-সেটি আমন ধান। বর্ষার বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রোপন করা হতো এই আমন। তখন আমনের মৌসুম ছাড়া সারা বছর ক্ষেতে গরু-ছাগল চড়ে বেড়াত। গরু-ছাগলের মল-মূত্র থেকে ক্ষেতের সার হতো। কৃষককে কখনও বাড়তি সার দিতে দেখিনি। তখন কখনও কখনও ফসলে পোকার আক্রমণও ঘটত। কিন্তু এই নিয়ে কৃষকেরা কিছুটা হা-হুতাশ করলেও কীট-নাশক ব্যবহার করতেন না। কীটনাশক তখন জনপ্রিয়ও ছিল না।
এদিকে ক্রমে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ব্যবহার। নিত্যনতুন ফসলের জাত আসে বিপুল ফলনের সম্ভাবনা নিয়ে। কৃষকরা ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়েন এই সব নতুন জাতের ফসলের দিকে। বিদ্যুতের প্রসার হয়। স্যালো মেশিন আসে। সেচ-ব্যবস্থা চালু হয়। আসে বিভিন্ন রাসায়নিক সার আর কীটনাশক। এসবের প্রভাবে দ্রুত বিলীন হতে থাকে স্বাদু জলের মাছ। আমাদের শৈশব-কৈশোরের রূপকথার রূপসী মাছগুলো! আমাদের সেই বিনে পয়সায় পাওয়া প্রোটিন খাওয়ার দিনগুলো!
ধানক্ষেত সেচে মাছ ধরা, কাদায় মাখামাখি, হৈ হুল্লোর, কলার ভেলা বানিয়ে রাস্তার ধারের খালের মধ্যে সাঁতার কাটা, দাপাদাপি, শাপলা-শালুক কুড়ানো, পুকুরে পদ্মপাতার মাঝখানে চিৎ হয়ে মাথা তুলে ধরা, ডুবোডুবি করে চোখ লাল করা, সে কি আর হবে? তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা, হাঁটু কাদা পেরিয়ে পথচলা, কাদায় ভরপুর তুমুল বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা। সে জীবন খুব দ্রুত অতীত হয়ে গেলো! নগরায়ণ, আধুনিকতা, মোবাইল, ইন্টারনেট, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে দিয়েছে গতি, স্বাচ্ছন্দ্য, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে অনেক ‘রূপকথা’র উপকরণ!
কোথায় গেল আমার সেই দুঃখিনী গ্রামটি, আর কোথায় গেল সেইসব স্বাদু মাছ, আর সেই সোনালী ফ্রেমে আটা দিনগুলি? খুব, খুবই ফিরে পেতে ইচ্ছে হয় সেই দিনগুলি!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







