সরকারি একটা চাকুরির জন্য যে দেশে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে লড়াই করে, লিখিত, মৌখিক সব উত্তীর্ণ হয়েও পদ কম বলে চাকুরি না পেয়ে অাহাজারি করে, সেইদেশেই আবার প্রার্থী থাকে না বলে কোটার অসংখ্য পদ সংরক্ষিত থাকে। সেখানে কোন মেধাবীকেও নিয়োগ দেওয়া যায় না। সম্প্রতি একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নিয়োগে এই ঘটনা ঘটেছে। একটা রাষ্ট্রে এর চেয়ে বড় প্রহসণ অার কী হতে পারে!
বাংলাদেশের অনেক কিছুই অাসলেই বিস্ময়ের। এখানে সরকারি চাকুরিতে ৫৬ শতাংশ নিয়োগ হচ্ছে কোটার ভিত্তিতে। অার ৪৪ শতাংশ মেধায়! অামি চাই এই কোটা পদ্ধতি সংস্কার হোক। অাশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পোষ্যর ৩০ শতাংশ অার অাদিবাসীর ৫ শতাংশ কোটায় অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার্থী পাওয়া যায় না, তারপরেও বহাল তবিয়তে বছরের পর বছর এসব কোটা থাকে।
কোটার কারণে মেধাবীরা কীভাবে বঞ্চিত হবে শুনবেন? প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অংশ নেন সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থী (চলতি বছরের হিসাবে)। কোটাপদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬তম হন, তাহলে তিনি চাকরি না-ও পেতে পারেন। কারণ ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জনকে দেওয়া যাবে। কাজেই ২২৬তম হয়ে তিনি চাকরি পাবেন না। আবার কোটা থাকলে কেউ সাত হাজারতম হয়েও চাকরি পেতে পারেন।

অার সবচেয়ে বড় সংকট কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে ওই পদগুলো শুণ্য রাখতে হয়। পরিসংখ্যান দেই। কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ২৮ থেকে ৩৫ তম বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে পাঁচ হাজার পদ খালি থেকে গেছে। অবস্থাটা ভাবুন। মেধাবীরা উত্তীর্ণ হয়েও একদিকে চাকরি পাননি, আর অন্যদিকে শত শত পদ শূন্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কৃষি কর্মকর্তাদের মতো কারিগরি ক্যাডারের প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন।
অারও শুনবেন। শুধুমাত্র কোটার শূন্য পদগুলো পূরণ করতে মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী ও মহিলাদের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। অথচ ওই বিসিএসেও মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৮১৭টি, মহিলা ১০টি ও উপজাতির ২৯৮টিসহ মোট এক হাজার ১২৫টি পদ শূন্য রাখতে হয়।
একবার ভাবুন। কোটা থাকুক। অাজ থেকে যদি এই নিয়ম করা হয়, কোটার পদগুলোয় প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে তাহলেই পাঁচ হাজার ছেলেমেয়ে বেশি চাকুরি পেতো। কেন রাষ্ট্র তাহলে ৫ হাজার ছেলেমেয়েকে বঞ্চিত করলো?
শুধু কী বিসিএস? গত বছর ৯ হাজার ৬০৯ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ করা হয়। এসব পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮২টি পদ মুক্তিযোদ্ধার কোটাভুক্ত ছিল। কিন্তু এর জন্য প্রার্থী পাওয়া গেছে মাত্র ১০১ জন। এসব পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮২টি পদ মুক্তিযোদ্ধার কোটাভুক্ত ছিল। কিন্তু এর জন্য প্রার্থী পাওয়া গেছে মাত্র ১০১ জন।
রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংকগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। একদিকে সেখানে লাখ লাখ প্রার্থী অারেকদিকে কোটার প্রার্থী নেই বলে শত শত পদ শুণ্য। কী পরিহাস তারুণ্যের সঙ্গে। অথচ তারা চাইলে সরকারি কর্মকমিশনের মতো কোটার পদগুলো সংরক্ষণ না করে কোটা শিথিল করতে পারতো। তাহলে কোটা সংস্কারের অাগে এখুনি হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বেশি চাকুরি পেতো।
কোটা শিথিল মানে কী? চলমান কোটা পদ্ধতি অনুযায়ী, কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। ধরেন ১০০ টা পদের মধ্যে মক্তিযোদ্ধার ৩০ অার অাদিবাসীর ৫ টাসহ মোট ৩৫ টা পদের মধ্যে ৭ জন পাওয়া গেল। এখন বাকি ২৮ টা পদ শুন্য মানে সংরক্ষিত রাখতে হবে। কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে উত্তীর্ণ হলেও সেখানে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। অার কোটা শিথিল মানে কোটার ৩৫ টা পদই থাকবে। কোন কারণে কোটার প্রার্থী না থাকলে মেধা দিয়ে পূরণ করা হবে। এর ফলে কোন পক্ষই বঞ্চিত হচ্ছে না। অাপাতাত ছেলেমেয়েরা বেশি চাকুরি পাচ্ছে।

অামি দীর্ঘদিন ধরে কোটা সংস্কারের অাগে কোটা শিথিলের দাবি করে অাসছি এবং সরকারের অনুমোদনের পর পিএসসি গত কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে পিএসসি কাজটা করছে। পিএসসির মাননীয় চেয়ারম্যান সাদিক স্যারকে এজন্য বিশেষ ধন্যবাদ। ধন্যবাদ সরকারকেও।
জনপ্রশাসন ও পিএসসি সূত্রে জানতে পেরেছি, ৩৬তম বিসিএসের ৩৬৬টি শুন্য ক্যাডার পদ ৩৭তম বিসিএসের মেধাতালিকা থেকে এবং ৩৭তম বিসিএসের বিভিন্ন কোটার পদ খালি থাকলে তা মেধাতালিকা থেকে পূরণের সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় নন-ক্যাডার পদের জন্য অপেক্ষমাণ থাকা তিন হাজার ৩০৮ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা এককালীন শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর ৩৬তম বিসিএসের ফল প্রকাশ করেছে পিএসসি। দুই হাজার ৩২৩ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করার পরও ৩৬৬টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে কৃষি ক্যাডারের ১৬৮টি পদ শূন্য রয়েছে। কৃষি ক্যাডারের পদগুলোর মধ্যে ১৪৬টি মুক্তিযোদ্ধা কোটার, চারটি মহিলা কোটার ও ১৮টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার পদ। একইভাবে গণপূর্ত ক্যাডারের মুক্তিযোদ্ধা কোটার চারটি পদ শূন্য রয়েছে।
এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের জন্য সরকারি কলেজগুলোতে প্রভাষকের (বাংলা) ১৬টি পদ শূন্য রয়েছে। একইভাবে দর্শনের ২৩টি, ইতিহাসের ৯টি, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ৩৪টি, উদ্ভিদবিদ্যার আটটি, কৃষিবিজ্ঞানের চারটি, হিসাববিজ্ঞানের ১২টি, সংস্কৃতের একটি এবং গণিতের ২৫টি পদ খালি রয়েছে। মহিলা কোটার কারণে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাষকের ১১টি পদ, কৃষিবিজ্ঞানের একটি এবং গণিতের আটটি পদ খালি রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার কারণে ১১টি প্রভাষকের পদ খালি রয়েছে। এসব পদ ৩৭ থেকে পূরণ করা হবে।
৩৭তম বিসিএসের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছিল এক হাজার ২২৬টি শূন্য পদ পূরণের জন্য। এর সঙ্গে ৩৬তম বিসিএসের শূন্য ৩৬৬টি পদ যোগ করে মোট এক হাজার ৫৯২টি পদ হবে।
এছাড়া ৩৭তম বিসিএসের চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল, মৎস্য, পশুপালন ও শিক্ষকদের কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের শূন্য পদ ৭৬১টি। যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে পদ সংরক্ষণের সরকারি সিদ্ধান্তের বাধ্যবাধকতার কারণে বিগত অন্যান্য বিসিএসের মতো ৩৭তম বিসিএসের কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের মুক্তিযোদ্ধা কোটার ২২৮টি, মহিলা কোটার ৭৬টি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার ৩৮টি পদের বেশির ভাগই শূন্য থাকতে পারে। এ কারণে এসব পদ সংরক্ষিত না রেখে মেধাবীদের মাধ্যমে পূরণ করার সুপারিশ করেছে পিএসসি।

অামার মনে হয় পিএসসির এ উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এখন একইভাবে যদি রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংকগুলোতে কোটার পদে প্রার্থী না পেলে মেধা থেকে নিয়োগ দেয় তাহলে অসংখ্য সাধারণ মেধাবী ছেলেমেয়ে চাকুরি পেতে পারে। কাজটা শুরু করা দরকার এখুনি।
অাগেই বলেছি অামি চলমান কোটার সংস্কার চাই। অামি মনে করি সবমিলিয়ে ২০ শতাংশ কোটা অার ৮০ শতাংশ মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়া হোক। বিশেষ করে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা অনেক বেশি। ১৬ কোটি জনগনের দেশে মাত্র ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কেন ৩০ শতাংশ কোটা?
কোন সন্দেহ নেই, যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তারা জাতির বীর সন্তান। তাদের মধ্যে যারা সনদধারী তারা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকুরি পাবেন বাংলাদেশে সেটা অামি সানন্দে মেনে নিতে রাজি। কিন্তু তাদের সন্তানও না হয় বাধ্য হয়ে মেনে নিলাম। কিন্তু তাদের নাতি পুতিরা কী এমন করলো যে তাদেরও কোটা দিতে হবে? একইভাবে অাদিবাসী কোটাও কমিয়ে অানা দরকার। নারী ও জেলা কোটারও অার প্রয়োজন অাছে কী না ভাবা উচিত।
অাপনারা যারা কোটার পক্ষে তারা কী জানেন, ১৯৭৭ সালে এক বৈঠকে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের প্রায় সব সদস্য সরকারি নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র এম এম জামান ছিলেন কোটার পক্ষে। তবে কোটার পক্ষে সেদিন জামানের অবস্থান থাকলেও তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবস্থাটি চালু রাখার পক্ষে ছিলেন। তবে ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে কোটার হার ধীরে ধীরে কমিয়ে দশম বছরে তা বিলুপ্ত করার কথা বলেছিলেন তিনি। ওই সুপারিশ অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর দেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোটা থাকার কথা নয়। কিন্তু ২১ বছর পরেও তা মানা হচ্ছে না।

চলমান কোটা পদ্ধতিকে মেধাবী তরুণরা অভিশাপ মনে করেন। অন্যদিকে মেধানির্ভর জনপ্রশাসন গড়তেও এই কোটা পদ্ধতির সংস্কার দরকার। তবে প্রশ্ন হলো কবে সেটি হবে?
অতীতে যতোবার অান্দোলন হয়েছে প্রতিবার জামায়াত শিবিরসহ নানা অাখ্যা দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অাবারও অান্দোলন শুরু হয়েছে। শুনছি ছাত্রলীগসহ প্রগতিশীল সবাই এতে যুক্ত হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে সারাদেশ জেগে উঠেছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি রোববার সারাদেশে কর্মসূচি ডেকেছে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’।
অামি জানি না নির্বাচনের অাগে সরকার কোটা সংস্কারের উদ্যোগ নেবে কী না। তবে এই মুহুর্তে সরকার একটি কাজ করতে পারে যাতে সরকার ও অান্দোলনকারী দুই পক্ষই জিতকে। সেটা হলো কোটা শিথিলের ঘোষণা।
সরকারের কাছে অনুরোধ, বড় ধরনের সংস্কার কালই না করেন কিন্তু এই ঘোষণা অন্তত দিন অাজ থেকে কোটাপ্রথা শিথীল। অর্থাৎ কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেই পদগুলো শুন্য না রেখে মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে অাজ হোক কাল হোক কোটাও সংস্কার করতে হবে। কারণ এটা যৌক্তিক দাবি। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, একজন মানুষও যদি ন্যায়ের কথা বলে অামি অাছি। অার সে কারণেই অামিও মনে করে কোটা সংস্কার করা জরুরী।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








