কাশ্মীরে যাও সুন্দরীদের বিয়ে করো, জমি কিনো; কর্মীদের প্রতি এমন কথা বলল বিজেপি নেতা৷ বিজেপির অবিবাহিত কর্মীদের প্রতি সুন্দরী কাশ্মীরী কন্যাদের বিয়ে করা ও সেখানে জমি কেনার আহ্বান জানালেন বিজেপি নেতা বিক্রম সাইনি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সম্বলিত ধারা ৩৭০ বাতিল করার পরদিনই কাশ্মীরের মুজাফফরনগরে এমন মন্তব্য করলেন তিনি।
তিনি বলেন, বিজেপিতে যত অবিবাহিত কর্মী আছে তাদের এখন কাশ্মীরে যেয়ে সেখানে জমি ক্রয় করাসহ সেখানকার সুন্দরী কন্যাদের বিবাহ করার জন্য স্বাগতম। আর এই স্বপ্ন পূরণ করার জন্য মোদীকে ধন্যবাদও জানান ওই বিজেপি নেতা। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি একজন নেতাকে যে কতোটা অশ্লীল, অসভ্য ও ইতর করে তুলতে পারে তা বুঝতে বিক্রম সাইনীর এই বক্তব্যই যথেষ্ট নয় কি?
এর আগেও বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছিলেন এই বিজেপি নেতা। নিউ ইয়ার উদযাপন নিয়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করে বলেছিলেন ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন বন্ধ করা উচিত কারণ এটি কোন হিন্দু উৎসব নয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বলেছেন, যারা ভারতে থেকে অনিরাপদবোধ করে তারা অবশ্যই ভারতবিরোধী। তাদেরকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়া উচিত, এরপরই ফেব্রুয়ারিতে এই নেতা বলেন, পারমানবিক বোমা দিয়ে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দেয়ার কথাও বলেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেন, আমি আমার স্ত্রীকে আরও সন্তান জন্ম দেয়ার কথা বলেছি যাতে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়৷ এমন কথা কি কোন সভ্য লোকের হতে পারে?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যসভায় ৩৭০ ধারা বিলোপের প্রস্তাব পেশ করতেই ক্ষেপে যান পিডিপি নেতা ও এমপি মীর মহম্মদ ফৈয়াজ। সংবিধানের প্রতিলিপি ছিঁড়ে ফেলেন রাজ্যসভায় জম্মু কাশ্মীরের প্রতিনিধিত্ব করা এই নেতা। এরপরেই তাঁকে সংসদ থেকে বের করে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে রাগে নিজের জামাও ছিঁড়ে ফেলেন ফৈয়াজ। প্রতিবাদী অপর সাংসদ নাজির আহমেদকেও বের করে দেয়া হয়।
সংসদে অমিত শাহের বক্তব্য রাখার পর থেকেই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে জম্মু ও কাশ্মীর৷ বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে।
মোদি সরকার সাম্প্রদায়িক জিগির তুলে কি নিজের ও দলের ক্ষমতার ভিতকেই কেবল পোক্ত করতে চাচ্ছেনা? তারা কি ঠান্ডা মাথায় গণতন্ত্রকে হত্যার নেশায় মেতে উঠলোনা? তারা কি জম্মু কাশ্মীরের মানুষের মতামতের কোন গুরুত্ব দিল? ভারতের উচিত ছিল না কি গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা স্থায়ী শান্তিচুক্তি করা? তখন পাকিস্তান ও ভারত সামরিক খাতে ব্যয় না করে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যয় করতে পারত। এতে কি দুই দেশের জনগণই তখন উপকৃত হতনা? ভারত যদি নিজেদের গণতন্ত্রের পূজারী মনে করে তখন কাশ্মীরের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে এত কেন আপত্তি?
কাশ্মীর সম্পর্কিত গৃহীত ব্যবস্থার পর কাশ্মীর কার্যত অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। কাশ্মীরের নেতৃবৃন্দকে করা হচ্ছে অন্তরীণ অথবা কারারুদ্ধ। চলছে আটক ও দমনপীড়ন৷ আজ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডি. রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ কাশ্মীরের বিধায়ক ইউসুফের খোঁজ নিতে শ্রীনগর বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাদেরকে আটক করা হয়৷
এসব কি গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি নয়? কাশ্মীরের নিরীহ জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কি আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে পারেনা? ঘটতে পারে না আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রশমন?
কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে আরও দু’টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে৷ এছাড়াও আঞ্চলিক শান্তিপূর্নতার আরও একটি হুমকি হল পাকিস্তানের সহায়তায় কাশ্মীরে জিহাদী ও জঙ্গিবাদী কার্যক্রম পরিচালনা ও সেই সাথে ভারতের কর্তৃত্ববাদ৷ জঙ্গীবাদে বাড়ছে কর্তৃত্ববাদ ও কর্তৃত্ববাদে জঙ্গীবাদ৷ আর এসব স্বার্থান্বেষী দ্বন্দ্বে হারাচ্ছে কাশ্মীরীদের জীবনের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার?

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ৩৭০ ধারা বাতিলে কি কাশ্মীরীদের মতামত নেয়াটা যৌক্তিক ছিলনা? উগ্র সাম্প্রদায়িক ও কর্তৃত্ববাদী বিজেপি সরকার কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্যায়ন করছেনা৷ দলটি তার কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলছে কাশ্মীরে যাও সুন্দরীদের বিয়ে করো৷ এমন একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার জন্য নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দনও জানাচ্ছে তারা৷ এমন অসুস্থ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা কি জঙ্গীবাদ সৃষ্টির সহায়ক হতে চলছেনা?
শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা কর্তৃত্ববাদ ও জঙ্গিবাদ দুটোই পরিত্যাজ্য হোক৷ কাশ্মীরের জনগণকে অবরুদ্ধ করা, কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে কথা বললে আটক করা এসব চরম অনৈতিক নয় কি?
ভারত কাশ্মীর ইস্যুতে উস্কে দিচ্ছে বিক্রম সাইনীর মত অশ্লীল সাম্প্রদায়িক হিন্দু জঙ্গীদের আর পাকিস্তান উস্কে দিচ্ছে মুসলিম জঙ্গীদের৷ হিন্দু জঙ্গীর অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামবে মুসলিম জঙ্গী আর পাকিস্তান ও এ উপমহাদেশের মুসলিমরা বাহবা দেবে তাদেরকে৷ আর মুসলিম জঙ্গীদের অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখবে হিন্দু জঙ্গী৷ ভারতে সব হিন্দুরা তখন মুসলিম জঙ্গীবাদ বিরোধী বীর হিসাবে স্যালুট দেবে নরেন্দ্র মোদিকে৷ আর পাকিস্তান কাশ্মীরের মুসলমানদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে মুসলমানদের পক্ষে প্রতিবাদী বীর হিসাবে তুলে ধরবে৷ ভারত ও পাকিস্তান কেউই কিন্তু কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন দিচ্ছেনা৷
কারফিউ জারি হল শ্রীনগরে আর সরকার ও রাজ্য পুলিশ বলছে, জম্মু ও কাশ্মীরের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ। পুলিশ গাড়িতে করে ঘুরে এলাকায় লাউড স্পিকারে ঘোষণা করেছে, সব মানুষ যেন বাড়ি ফিরে যান।
দোকানদারদের বলা হয় শাটার নামিয়ে দিতে। অথচ রাজ্যের পুলিশ বলে, পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ। কোনও হিংসাত্মক ঘটনা সেখানে ঘটছে না। সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে শান্তিপূর্ণ তাহলে কারফিউ কেন? এর আগে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি দিল্লিতে সংবাদমাধ্যমকে জানান, জম্মু ও কাশ্মীরের পরিস্থিতি ভাল নয়। দেশের নতুন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। রাহুলের এহেন দাবির কিছুক্ষণের মধ্যেই জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশের পক্ষে টুইট করে জানিয়ে দেওয়া হয় পরিস্থিতি একেবারেই শান্তিপূর্ণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরে গুলি চলাকে গুজব বলেও অভিহিত করছে। তারা এমন কথাও বলছে ঈদের কেনাকাটার জন্য রাস্তাঘাটে ভালই ভিড় হয়েছিল।
প্রসঙ্গত ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত-পাকিস্তান উভয়ই কাশ্মীরের দখল নিয়ে নেয়। কাশ্মীরের সঙ্গে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা একটি অস্থায়ী সংস্থান (টেম্পোরারি প্রভিশন)। এ অনুচ্ছেদ বলে জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা ও বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়। সংবিধানের অন্যান্য ধারা অন্য সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হতো না? কাশ্মীরের জনগণের কি আত্মনিয়ন্ত্রন, স্বাধীকার ও স্বাধীনতার অধিকার নেই?
কাশ্মীরীদের প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মত নেতৃত্ব৷ যে কাশ্মীরীদেরকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে৷ তারা রুখে দাঁড়াবে সাম্প্রদায়িক হিন্দু ও মুসলিম জঙ্গী উভয়কেই৷ স্বাধীন সার্বভৌম আলাদা রাষ্ট প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই হতে হবে মূলমন্ত্র৷ ভারত পাকিস্তানের খেলার পুতুল হওয়ার অবস্থান থেকে তাদের অবশ্যই ফেরত আসতে হবে৷
সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করেই বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান? কাশ্মীরী মেয়েদের সম্পর্কে এমন কথা এমন একটি রাজনৈতিক দলের নেতার পক্ষেই মানানসই৷ কাশ্মীরী সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করে জমি কেনার কথা বলল বিজেপি নেতা বিক্রম সাইনী৷ এটা মূলত হিন্দু যুবকদেরকে তাদের পক্ষে আনার কৌশল নয় কি? কাশ্মীরীরা মুসলিম তাই মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও এমন আহ্বানও শোনা যাচ্ছে৷ তবে কি কাশ্মীরী জনগণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বাহন হতে চলেছে? সাম্প্রদায়িকতার বদলে সাম্প্রদায়িকতার চর্চা শান্তিপূর্ণ অবস্থানের জন্য চরম হুমকি৷ তাই আমাদের প্রত্যাশা কাশ্মীরী জনগণ যেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বাহন না হয়৷








